কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনীতি ও উন্নয়ন দর্শন

মিন্টু হক [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনীতি ও উন্নয়ন দর্শন

জাতির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন নেতৃত্ব কেবল প্রয়োজন নয়, অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে গোটা রাষ্ট্র কাঠামো চরম সংকটে পড়ে। আদর্শের পতন, প্রশাসনিক অব্যবস্থা এবং পরপর সামরিক পালাবদলে দেশ ও জাতি দিকহারা হয়ে পড়ে। এই জটিল ও অস্থির সময়েই আবির্ভাব ঘটে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের। জাতি তখন নেতৃত্বশূন্য, প্রশাসনে অস্থিরতা রাজনীতি সেনা অভ্যুত্থানে ঘূর্ণায়মান। এর মধ্যেই ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহী-জনতা বিপ্লব’ ঘটে, যা একদিকে সেনাবাহিনীর ভেতরের বিভ্রান্তি প্রশমিত করে, অন্যদিকে জনগণের নতুন আশার প্রতীক হিসেবে জিয়াউর রহমানকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য কেবল ক্ষমতার আসনে বসে থাকা ছিল না-তিনি বুঝেছিলেন, একটি বিপর্যস্ত রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য চাই নতুন দর্শন, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।

 

 
১৯৭৭ সালের এক অনুষ্ঠানে জিয়াউর রহমান তাঁর নেতৃত্বের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘Not just to rule, but to redefine.’- যা তাঁর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দর্শন প্রকাশ করে। তাই তিনি এগিয়ে গেলেন রাষ্ট্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়নের দিকে যেখানে আত্মপরিচয়ের ভিত্তি হবে একতা, অন্তর্ভুক্তি এবং বাস্তবতা। রাজনৈতিক দল গঠনের  আগেই শহীদ জিয়াউর রহমান রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার উপকরণ নয়, বরং একটি দায়িত্ব, একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত গঠনের আগেই জনগণের মানস ও নেতৃত্বকে প্রস্তুত করতে উদ্যোগী হন। এই প্রেক্ষাপটে ২৭, পুরানা পল্টনে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যার প্রিন্সিপাল ছিলেন এ কে এ ফিরোজ নুন।

 


পর্যায়ক্রমে তিন দিন ও সাত দিনব্যাপী এই কেন্দ্রে দলীয় কর্মী, নেতা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হতো। এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পাঠসূচিতে ছিল- বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন, উৎপাদনমুখী রাজনীতি, সামগ্রিক স্বাধীনতা, ন্যায়ভিত্তিক শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দল গঠনের আগেই আদর্শিক কাঠামো নির্মাণে মনোযোগী ছিলেন। এমনকি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সময়, বিদেশ সফরেও তিনি রাজনীতির এই নৈতিক ও আদর্শিক দিকটিকে সামনে রেখেছেন। ‘শহীদ জিয়াউ রহমানের শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা’ (সম্পাদনা: এ কে এ ফিরোজ নুন) গ্রন্থে সংরক্ষিত তাঁর একাধিক বক্তব্যে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয় সফরকালীন ভাষণে তিনি রাজনীতির গুরুত্ব ও রাষ্ট্রদায়িত্বের প্রতি তাঁর একাগ্র মনোযোগ প্রকাশ করেছেন- যা কেবল একজন সামরিক প্রশাসকের নয়, বরং একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় বহন করে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কেবল দেশীয় নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর সহযোগিতা ও ঐক্যের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর  ছিলেন। তাঁর দূরদর্শী দৃষ্টি ও কূটনৈতিক চেতনা থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আনার ভাবনা বাস্তব রূপ পায়। এই অঞ্চলের দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অনগ্রসরতার শেকল ভাঙতে তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতাকে অপরিহার্য মনে করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই ‘দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা’- সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠার বীজ রোপিত হয়। পরে ১৯৮৫ সালে সার্কের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও এর স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

 


১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই দল কেবল একটি রাজনৈতিক কাঠামো নয়, বরং তাঁর চিন্তা ও দর্শনের বাহক। তিনি বলতেন, ‘তোমরা কেবল বাঙালি নও, তোমরা বাংলাদেশি।’ এই উচ্চারণের মাধ্যমে তিনি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বাইরে একটি ভূখন্ডভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রপরিচয় দাঁড় করান। এই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ধারণাটি এমন এক জাতীয় দর্শন, যেখানে ধর্ম, ভাষা বা শ্রেণিভেদ নয়-রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সংযুক্তিই মূল। যেখানে সংখ্যালঘু, নারী, আদিবাসী, সব ধর্মের মানুষ ছিল রাষ্ট্রের সমান অংশীদার।


বিএনপির ঘোষণাপত্রে বহুদলীয় গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় সহনশীলতা ছিল মূল অঙ্গীকার। জিয়াউর রহমান সামরিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এলেও, তাঁর রাজনীতি ছিল জনগণকেন্দ্রিক। তিনি দেশে প্রথম সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দেন এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর চিন্তা এককথায় স্বীকার হয়নি। কেউ কেউ বলেছিলেন, এটি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-কে খাটো করার কৌশল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, জিয়া চেয়েছিলেন একটি বাস্তব ভিত্তির ওপর রাষ্ট্র নির্মাণ করতে যেখানে বিভাজন নয়, ঐক্যই হবে মূল। তিনি বিশ্বাস করতেন রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কেবল আদেশ নয়, প্রয়োজন জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণ। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে ঘুরে ‘রাজনৈতিক আশাবাদের রাজনীতি’ বা politics of hope প্রচার করেন। তিনি আহ্বান জানানÑ “Work harder and produce more”(আরও পরিশ্রম করো এবং আরও উৎপাদন করো)- কারণ তাঁর দৃষ্টিতে “ক্ষুধার্ত জাতি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না।” এই দর্শনের বাস্তব রূপ ছিল তাঁর উন্নয়ন-ভিত্তিক শাসননীতি বিশেষত কৃষিনীতিতে। তিনি চেয়েছিলেন, মানুষ যেন নিজের মাঠে ফসল ফলিয়ে খেতে পারে, নিজের জীবনে আত্মনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। তার শাসনব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি ছিল উৎপাদন, আত্মবিশ্বাস এবং অংশগ্রহণ।

 

 


১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে, যা বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে নগ্নভাবে উদঘাটন করে। এই অভিজ্ঞতা জাতির সামষ্টিক চেতনায় গভীর ছাপ ফেলে এবং পরবর্তী রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানকেও অনুপ্রাণিত করে নতুন উন্নয়নধারার চিন্তায়। রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বাস্তবমুখী ও কর্মসূচিনির্ভর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রবর্তিত হয় ‘খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি কর্মসূচি’, যা ছিল দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম সুসংগঠিত ও কার্যকর পদক্ষেপ। এই কর্মসূচির বাস্তবায়নে তিনি কেবল পরিকল্পনাতেই থেমে থাকেননি- প্রশাসনের সকল স্তরের কর্মকর্তা, সেনাবাহিনীর সদস্য, ছাত্রসমাজ এবং কৃষি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের একত্র করে সরাসরি মাঠপর্যায়ে সক্রিয় করে তোলেন। যার ফলে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়।

 


সরকারের উদ্যোগে ব্যাপকভাবে গভীর নলকূপ বসানো হয়, কৃষকের জন্য সহজলভ্য করে তোলা হয় শ্যালো মেশিন ও পাওয়ার টিলার। যান্ত্রিকীকরণের এ প্রয়াসে কৃষক পায় তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর হাতিয়ার। পাশাপাশি, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (BADC) মাধ্যমে উচ্চফলনশীল জাত (HYV) বীজ, উন্নত বিদেশি সার এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশব্যাপী। নারী কৃষকদের জন্যও খুলে দেওয়া হয় প্রশিক্ষণের দরজা। তাঁর দৃশ্যমান নেতৃত্বে শুরু হয় কৃষিকেন্দ্রিক এক আত্মনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ১৯৮১ সালে এ কৃষিনীতিকে বলেছিল, “a turning point in rural economy”, (গ্রামীণ অর্থনীতির বাঁক পরিবর্তনের সময়)। আর ভারতের সবুজ বিপ্লবের মূল স্থপতি এমএস স্বামীনাথন বলেছিলেন, ‘Bangladesh took the right path under Ziaur Rahman (জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সঠিক পথ বেছে নিয়েছে ।’

 


আজ আমরা বছরে ৪ কোটির বেশি টন ধান উৎপাদন করি, মাছ ও সবজি উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছি। আর এই অর্জনের শিকড়ে রয়েছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতিকে উন্নত করতে হলে প্রথমে তার পেট ভরাতে হয়। তাই কৃষিকে তিনি কেবল পেশা নয়, শিল্পের মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন। সেচ, সমবায়, কৃষিঋণ ও প্রযুক্তির বিস্তারে তিনি যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন, তা ছিল কৃষিবিপ্লবের রূপরেখা। তাঁর সাহসী উদ্যোগের কারণেই গ্রামীণ অর্থনীতি জেগে উঠেছিল, আর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে যায়।

 

 

 

 এই মাটির মানুষের ঘামকে তিনি রূপান্তর করেছিলেন জাতির সমৃদ্ধির ভিত্তিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘যখন একজন কৃষক কাদায় দাঁড়িয়ে ফসল বুনে, তখন সে এই দেশকে রক্ষা করছে। আমি রাষ্ট্রপতি নই, আমি তার সহযাত্রী।’

 

 


জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করা মানে শুধুই অতীতকে ফিরে দেখা নয়, এটা বর্তমান সময়ের প্রয়োজনে বারবার তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কারের ডাক। তাঁর নেতৃত্বের সাহস, আত্মপরিচয়ের সন্ধান এবং জাতিকে জাগিয়ে তোলার দৃষ্টিভঙ্গি আজো আমাদের পথচলার আলোকবর্তিকা। এক অনিশ্চিত সময়ে তিনি যে নতুন জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করেছিলেন, তা আজও আমাদের আত্মবিশ্বাস ও ঐক্যের ভিত্তি হয়ে আছে। তাঁর চিন্তা, দর্শন ও কর্মপদ্ধতি আজও বাংলাদেশের জন্য একটি শক্ত ভিত। তাঁকে স্মরণ করা কেবল ইতিহাস চর্চা নয়, এটা ভবিষ্যতের বিকল্প পথের খোঁজ। আর সেই পথের শুরু হয় কৃষকের কাদামাটির মাঠ থেকে যেখানে আজও শহীদ জিয়ার স্বপ্ন দুলছে সোনালি ধানের শীষ।