কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

সেন্টমার্টিন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বাস্তবতা

মো. ইমরান হোসেন [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫]

সেন্টমার্টিন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। প্রকৃতির অনন্য ছোয়ায় সৃষ্ট দৃষ্টিনন্দন রূপে দ্বীপটিকে আমরা দেখি একখণ্ড স্বর্গ হিসেবে। নীল জল, নীল আকাশ, আর সারি সারি নারিকেল গাছের বেষ্টনী। কিন্তু বাস্তবের সেন্ট মার্টিন ছবির থেকেও সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রকৃত সেন্ট মার্টিনকে জানতে হলে জানতে হবে সেখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবন, তাদের সংগ্রাম, পরিবেশের নীরব ক্ষয় আর টিকে থাকার কঠিন বাস্তবতা।

 

 


সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানের মাঠ পর্যায়ে জরিপের কাজে শিক্ষার্থীরা দ্বীপের প্রত্যন্ত গ্রাম, বাজার, সরকারি-বেসরকারি কার্যালয়, রিসোর্ট মালিক থেকে শুরু করে জেলে, বোট মালিক সমিতি, দোকান মালিক, এনজিও প্রতিনিধি, পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা প্রভৃতি অংশীজনের সঙ্গে কথা বলে। স্থানীয় মানুষের চোখে সেন্ট মার্টিনকে দেখার চেষ্টায় প্রাণান্তকর এই প্রচেষ্টা।

 

 


দ্বীপে প্রবেশ করার পর প্রথম যে বিষয়টি সবচেয়ে তীব্রভাবে চোখে পড়ে তা হলো অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পর্যটকদের চোখে যেসব অংশ পরিষ্কার দেখা যায়, তার বাইরে বাস্তব সেন্ট মার্টিন অনেকটাই ভিন্ন। পাড়া-মহল্লার ভেতর দিয়ে হেঁটে গেলে বাতাসের সাথে নাকে ভেসে আসে পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধ এবং আবর্জনার স্তূপের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। দ্বীপে প্রতিদিন যে পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, তার বড় অংশই খোলা জায়গায় ফেলা বা পোড়ানো হয়, যা সরাসরি পরিবেশ, সমুদ্র ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। 

 

 


সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, স্থানীয়দের একটি বড় অংশ বর্জ্য পোড়ানো, প্লাস্টিক দূষণ, বা প্রবাল-জিনুক সংগ্রহের পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পর্কে জানেই না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে সচেতনতাবোধ এখানে খুব স্পষ্ট। পুরো দ্বীপে মাত্র তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে একটি সরকারি। অধিকাংশ মানুষ প্রাথমিক শিক্ষাও শেষ করতে পারেননি। ফলে পরিবেশ প্রতিবেশ সুরক্ষা সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগ তারা পাই না। পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্বীপে জনগণের বড় অংশ যখন শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত, তখন পরিবেশ সচেতনতা তৈরি হওয়া নিতান্তই অমূলক।

 

 


প্রায় দশ হাজার মানুষের এই দ্বীপে প্রধান জীবিকা মাছ ধরা এবং পর্যটন। কিন্তু মাছ ধরা বছরে প্রায় তিন মাস নিষিদ্ধ থাকে, আর পর্যটন নির্ভরশীলতা খুব সীমিত সময়ের জন্যই সক্রিয় থাকে। ফলে অফ-সিজনে বহু পরিবার কর্মহীন হয়ে পড়ে। অনেক পরিবারকে একেবারেই আয় ছাড়াই দিন কাটাতে হয়। এই সময়টাতেই কিছু মানুষ জীবিকার তাগিদে দ্বীপের পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, জিনুক সংগ্রহ, উপকূলের কেয়াবন কাটা, বা সাগরজীববৈচিত্র্য পাচার, এসব কর্মকাণ্ড বেশিরভাগ সময় টিকে থাকার তাগিদে করেন।

 

 


পর্যটকের সামনে সেন্ট মার্টিনকে স্বর্গের মতো দেখাতে যতটা চেষ্টা করা হয়, স্থানীয় মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সেই সুযোগ এখানে সীমিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় স্বাস্থ্যসেবা। দ্বীপে ইউনিয়ন হাসপাতাল থাকলেও সেখানে ডাক্তার পাওয়া অনেকটাই সোনার হরিণ সমতুল্য। দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার পরিস্থিতিতে সঠিক সেবা পাওয়া কঠিন। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ একটি দ্বীপে যেখানে ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস প্রায়শই দেখা দেয়, সেখানে মাত্র দুটি সাইক্লোন শেল্টার থাকা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। জলবায়ু পরিবর্তন, উচ্চ লবণাক্ততা, উপকূল ক্ষয় এসবের প্রভাব কৃষি ও মৎস্য উভয় খাতেই পড়ছে। অনেক কৃষক জানান, আগে যে ফসল পাওয়া যেত এখন তা পাওয়া যায় না। সুপেয় পানির সংকটও দিন দিন বাড়ছে। দ্বীপে স্বাভাবিক জীব-বৈচিত্র্য বজায় রাখতে যে লেগুনগুলো একসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার অধিকাংশই এখন দূষিত বা তাদের স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ব্যাহত হয়েছে।

 

 


সেন্ট মার্টিনের স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বললে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তারা নিজেদের মতো করে এই দ্বীপকে ভালোবাসেন। তারা চান দ্বীপটি টিকে থাকুক, সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হোক, প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকুক। কিন্তু তাদের মতামত, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে প্রায়ই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কোনো উন্নয়ন বা রক্ষার পরিকল্পনায় তারা অংশ নিতে পারেন না। তাদের চাওয়া-পাওয়া, তাদের ভয়-দুঃখ-আশা- সবকিছুই থেকে যায় অপ্রকাশিত। এই বাস্তবতার মধ্যে সেন্ট মার্টিনকে রক্ষা করার একমাত্র পথ হলো প্রকৃতি ও মানুষের স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। 

 

 


সেন্ট মার্টিন কেবল একটি দ্বীপের নাম নয়, এটি মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম, এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সহাবস্থানের এক নীরব দলিল। প্রবাল-কচ্ছপ-জীববৈচিত্র্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ সেই মানুষগুলো যারা প্রতিদিন এই দ্বীপকে নিজের আশ্রয় হিসেবে ধারণ করে। তাদের জীবনের মান উন্নয়ন, নিরাপত্তা, শিক্ষা, খাদ্য এবং বিকল্প তৈরি করেই কেবল আমরা সেন্ট মার্টিনকে ভবিষ্যতের জন্য টিকিয়ে রাখতে পারব।