কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

সার্কের চেতনা কি আবার জাগবে

ড. মো. শফিকুল ইসলাম [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ৪ জানুয়ারি ২০২৬]

সার্কের চেতনা কি আবার জাগবে

প্রতিবেশীদের সঙ্গে সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করে সহযোগিতা, উন্নয়ন ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে গঠিত সার্কের শুরুর নেপথ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল অসাধারণ। জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা দেন এবং এর ফলস্বরূপ সার্ক (SAARC) গঠিত হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা, সম্পর্ক ও উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে। ১৯৮০ সালে তিনি এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং ১৯৮৫ সালে ঢাকায় সার্কের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যা তার নেতৃত্ব ও দূরদর্শীতার প্রমাণ। 

 

 


বাংলাদেশের উদ্যোগে ১৯৮৫ সালে ঢাকায় সাতটি দেশ নিয়ে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা-সার্কের যাত্রা শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক সংযোগ, দারিদ্র্য বিমোচন এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক বৈরিতা, আস্থাহীনতা ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে সার্ক ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালে কাঠমাণ্ডুতে শেষ শীর্ষ সম্মেলনের পর দীর্ঘদিন সার্ক কার্যত স্থবির। ফলে দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আহ্বানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের ভিডিও কনফারেন্স ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। সেই সময় বাংলাদেশ সরকার বিশেষ করে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা, স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় যৌথ প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব এবং আর্থিক সহায়তার ঘোষণা ইত্যাদি দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের দায়িত্বশীল অবস্থানকে স্পষ্ট করে। অনেকেই তখন এটিকে সার্কের ‘পুনর্জন্ম’-এর সূচনা হিসেবে দেখেছিলেন।

 

 


কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোভিড-পরবর্তী সময়ে সার্ক সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সক্রিয় হতে পারেনি। বরং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিকল্প ও উপআঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের দিকে বেশি ঝুঁকেছে-যেমন বিমসটেক, বিবিআইএন কিংবা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক উদ্যোগ। এর একটি কারণ হলো সার্ক কাঠামোর ভেতরে রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দুর্বলতা। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায়-যেখানে ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য সংকট ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর বড় চ্যালেঞ্জ-দক্ষিণ এশিয়ার জন্য কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। এই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য এখনো অত্যন্ত কম, অবকাঠামো সংযোগ দুর্বল এবং জনস্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় সীমিত। এসব সমস্যার টেকসই সমাধানে একটি সক্রিয় সার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

 


দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক দীর্ঘদিন ধরেই কার্যত অচল। রাজনৈতিক অবিশ্বাস, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান বৈরিতার কারণে এই আঞ্চলিক জোট তার লক্ষ্য ও সম্ভাবনার অনেকটাই হারিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সার্ক কি সত্যিই মৃত, নাকি তার চেতনা এখনো বেঁচে আছে ? সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের উপস্থিতি কেবল একটি কূটনৈতিক সৌজন্য ছিল না; বরং এটি ছিল আঞ্চলিক সংহতির এক নীরব বার্তা। এই প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে সার্কের চেতনা ‘জাগ্রত ও বহাল’ রয়েছে এবং যে কোনো উপায়ে এই সংস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। বৈশ্বিক চিন্তক হিসেবে ড. ইউনূসের এই উপলব্ধি কেবল আবেগনির্ভর নয়, বরং বাস্তবতার নিরিখে গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া আজ বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত-জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সংকট, অভিবাসন সমস্যা এবং ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ। এসব চ্যালেঞ্জ কোনো একক দেশের পক্ষে একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এখানেই সার্কের মতো একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে আসে।

 

 


উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের তালিকা। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ-সার্কভুক্ত প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিরাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক কোনো শীর্ষ সম্মেলন নয়, বরং একটি মানবিক ও সম্মানজনক উপলক্ষেই এই সমবেত হওয়া দেখিয়ে দেয়, রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

 


সার্কের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর জন্মলগ্নে যে স্বপ্ন ছিল-আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও আস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু তার বাস্তবায়ন আজও অসম্পূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের হার এখনো বিশ্বে সর্বনিম্নের মধ্যে। অথচ বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা বলছে, রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা কমানো গেলে এই অঞ্চলের বাণিজ্য কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। এই প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশেই রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে প্রথমেই একে ‘জিম্মি’ করে রাখা দ্বিপক্ষীয় বিরোধের বাইরে নিয়ে আসতে হবে। স্বাস্থ্য, জলবায়ু, শিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জনগণকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো কম-বিতর্কিত খাতে কাজ শুরু করাই হতে পারে আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ।

 

 


বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইতিহাসগতভাবে সার্কের জন্মে বাংলাদেশের নেতৃত্ব ছিল, আর বর্তমান বাস্তবতায়ও বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতার পক্ষে ধারাবাহিক অবস্থান নিয়ে আসছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই ধারাবাহিকতাকেই নতুন কূটনৈতিক ও নৈতিক শক্তি জুগিয়েছে। তবে সার্ককে নতুন করে কার্যকর করতে হলে কিছু বাস্তবমুখী সংস্কার জরুরি। প্রথমত, রাজনৈতিক বিরোধকে অর্থনৈতিক ও মানবিক সহযোগিতা থেকে আলাদা রাখার সদিচ্ছা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সর্বসম্মতির জটিলতা কাটিয়ে কার্যকর মেকানিজম গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য, জলবায়ু অভিযোজন, ডিজিটাল সংযোগ, জ্বালানি ও পর্যটনের মতো কম-বিতর্কিত খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। চতুর্থ, সার্কের নীতি সময়ের সঙ্গে প্রয়োজন হলে সংস্কার করতে হবে। 

 

 


বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে একটি সেতুবন্ধনকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। করোনার সময় বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে আঞ্চলিক সহযোগিতা, শান্তি ও উন্নয়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ যদি সার্ক সংস্কার ও পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করে এবং একইসঙ্গে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার সঙ্গে সার্ককে পরিপূরক হিসেবে এগিয়ে নেয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণ এর সুফল পেতে পারে।

 

 

 


সবশেষে বলা যায়, সার্ক আজ অস্তিত্ব সংকটে থাকলেও তার প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়ে যায়নি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বাস্তববাদী সংস্কার এবং জনগণকেন্দ্রিক সহযোগিতার মাধ্যমে সার্ককে নতুন রূপে সক্রিয় করা সম্ভব। এই দুঃসময়ে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিভাজনের নয়, সহযোগিতার পথই হতে পারে টেকসই উন্নয়নের একমাত্র ভরসা। সার্ক হয়ত এখনো কার্যকর নয়। কিন্তু তার চেতনা যে পুরোপুরি নিভে যায়নি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় আঞ্চলিক নেতাদের উপস্থিতিই তার প্রমাণ। এই চেতনা যদি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বাস্তবমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে লালন করা যায়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের জন্য সার্ক আবারও প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। প্রশ্ন একটাই, আমরা কি সেই সদিচ্ছা দেখাতে পারব ?

 

 


লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ