সার্কে বাণিজ্য বাড়াতে পারছে না বাংলাদেশ
আনোয়ার ইব্রাহীম [প্রকাশ: সমকাল, ০৪ এপ্রিল ২০২৬]

আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে কোনোভাবেই নিজের জোরালো অবস্থান তৈরি করতে পারছে না বাংলাদেশ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও সার্কভুক্ত অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার বাকি সাত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৮৬০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে মোট সাড়ে ১০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানির বিপরীতে রপ্তানি করেছে মাত্র ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।
‘একনজরে সার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা-২০২৪-২৫ অর্থবছর’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ প্রতিবেদনে পাঁচটি প্রধান অর্থনৈতিক সূচকের ভিত্তিতে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো–রপ্তানি আয়, আমদানি ব্যয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক ঋণ।
প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্রমে বাড়ছে। তবে এর সঙ্গে কাঠামোগত নানা চ্যালেঞ্জও দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।
এ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সার্ক অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক শূন্য ২, ৮ দশমিক ৪২, ১২ দশমিক ৬৫ এবং ৭ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। ১০ বছর আগের তুলনায় এ ঘাটতির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ এবং ২০ বছর আগের তুলনায় বেড়ে সোয়া চার গুণ হয়েছে।
আঞ্চলিক আধিপত্য
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ অর্থনীতির দেশ ভারত। প্রতিবেশী এ দেশটির অনুকূলে পুরো সার্ক বাণিজ্য, যা এ অঞ্চলের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলো থেকে যা আমদানি করে, তার ৯১ দশমিক ৪ শতাংশ আসে ভারত থেকে এবং যা রপ্তানি করে, তার ৮৮ দশমিক ৮৩ শতাংশই সেখানে যায়।
ভারতসহ চার দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্ক অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির সিংহভাগই এককভাবে ভারতের সঙ্গে। তবে পাকিস্তান, ভুটান ও আফগানিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য পিছিয়ে আছে। বিপরীতে নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ১৭০ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের পণ্য। বিপরীতে আমদানি করেছে ৯৬২ কোটি ৪১ লাখ ডলারের পণ্য। অর্থাৎ এককভাবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ৭৯১ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। সার্ক অঞ্চলের মোট আমদানির প্রায় সাড়ে ৯১ শতাংশ ভারত থেকে আসায় এই বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ভারতের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে। দেশটিতে বাংলাদেশের সাত কোটি ১৬ লাখ ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমদানি করেছে ৭৫ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের পণ্য। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘাটতির পরিমাণ ৬৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলার।
এ ছাড়া ভুটান, এমনকি আফগানিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ভুটানে এক কোটি ৩৮ লাখ ডলার রপ্তানির বিপরীতে সেখান থেকে চার কোটি ৪১ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে ঘাটতি তিন কোটি তিন লাখ ডলার। আফগানিস্তানে এক কোটি ১৩ লাখ ডলার রপ্তানির বিপরীতে বাংলাদেশে আমদানি করেছে দুই কোটি ১৮ লাখ ডলারের পণ্য। বাণিজ্য ঘাটতি এক কোটি পাঁচ লাখ ডলার।
তিন দেশে রপ্তানি বাংলাদেশের অনুকূলে
সার্কের বাকি তিন দেশ নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশ এগিয়ে। সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে নেপালের সঙ্গে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেপালে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল তিন কোটি ৪২ লাখ ডলার, যেখানে আমদানি ছিল মাত্র ৫৫ লাখ ডলার। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দুই কোটি ৮৭ লাখ ডলার।
এ ছাড়া মালদ্বীপে ৬১ লাখ ডলার রপ্তানির বিপরীতে আমদানি হয়েছে ৩৫ লাখ ডলার। আর শ্রীলঙ্কায় সাত কোটি ৭৪ লাখ ডলার রপ্তানি করে বাংলাদেশ আমদানি করেছে সাত কোটি ৬৬ লাখ ডলারের পণ্য। ফলে দ্বীপদেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল মাত্র আট লাখ ডলারের।
রেমিট্যান্স প্রবাহে মালদ্বীপের চমক
সার্ক দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আহরণের চিত্রটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ অঞ্চল থেকে মোট ১৫ কোটি ৭৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা ভারতের তুলনায়ও ১৪ কোটি ১১ লাখ ডলার বেশি। এটি সার্ক অঞ্চল থেকে আসা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
অন্যদিকে ভারত থেকে এসেছে মাত্র এক কোটি ৩১ লাখ ডলার। পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য (প্রতিটি থেকে ১০ ডলার বা তার কম)। শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রে মালদ্বীপ বাংলাদেশের জন্য এ অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
অবশ্য ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানের বিপুলসংখ্যক মানুষ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে। তবে এ বিষয়ে প্রকৃত ডেটা দেশগুলো প্রকাশ করে না। বাংলাদেশ থেকে ভারতে এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে কতটা রেমিট্যান্স আসে বা যায়, তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক আছে।
সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও সেবা খাত
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ভারতের প্রাধান্য স্পষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে,
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সার্ক অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আসা মোট ১৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলার নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) মধ্যে ১০ কোটি ৫৮ লাখ ডলার এসেছে
ভারত থেকে। শ্রীলঙ্কা থেকে বিনিয়োগ এসেছে চার কোটি ৯১ লাখ ডলার এবং পাকিস্তান থেকে ৯১ লাখ ডলার।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সার্ক দেশগুলোতে সেবা থেকে বাংলাদেশ ৪৫ কোটি ৩২ লাখ ডলারের রপ্তানি আয় করেছে, যার ৩৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলারই এসেছে ভারত থেকে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ এই অঞ্চল থেকে ২৭৯ কোটি ৪২ লাখ ডলারের সেবা আমদানি করেছে। সেবা আমদানির ক্ষেত্রেও ভারতের পরেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে শ্রীলঙ্কার পেছনে (৯ কোটি ১৯ লাখ ডলার)।
বৈদেশিক ঋণ ও স্থিতিশীলতার প্রশ্ন
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ একটি বড় বিষয়। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে, যা গত বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। এই ঋণের একটি অংশ সার্ক দেশগুলো (মূলত ভারত) থেকে নেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৭০ কোটি ডলার।
বৈশ্বিক ঋণের তুলনায় সার্ক অঞ্চলের ঋণের পরিমাণ মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, যা নির্দেশ করে যে বাংলাদেশ ঋণের জন্য মূলত চীন, বিশ্বব্যাংক বা এডিবির মতো বৃহত্তর উৎসের ওপর নির্ভরশীল।
ভবিষ্যৎ পথরেখা
প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, সার্ক অঞ্চলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা গভীর হলেও তা মূলত ভারতকেন্দ্রিক। ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যের বাইরে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়ছে, তবে তা এখনও সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশের রপ্তানির মাত্র ৪ দশমিক ৪ হয় সার্ক দেশগুলোতে। আর আমদানির ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয় সার্ক অঞ্চল থেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বাণিজ্য অসামঞ্জস্য কাটাতে বাংলাদেশকে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে। এর অন্যতম হলো রপ্তানি পণ্য বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।
শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। মালদ্বীপের মতো এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও দক্ষ জনশক্তি পাঠিয়ে রেমিট্যান্স আয় বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান অশুল্ক বাধা দূর করতে হবে।