সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ
শান্তা মারিয়া চীন থেকে [প্রকাশ : আজকের পত্রিকা, ০৫ অক্টোবর ২০২৫]

বিদায় নিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বীর দেবী দুর্গা। এবার দুর্গাপূজা মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিশ্বে কিছুটা হলেও উজ্জ্বল হয়েছে। যদিও এর মধ্যে খাগড়াছড়িতে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা এবং পূজা দেখতে গিয়ে গারো কিশোরী ধর্ষণের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। দেশের কয়েকটি জায়গায় দেবপ্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ব্যথিত করেছে।
তবে এটা ঠিক, বড় পরিসরে কোনো অঘটন ঘটেনি। এমনকি কলকাতায় কোনো কোনো পূজামণ্ডপে মহিষাসুরের প্রতিমার মুখ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আদলে করার মতো ন্যক্কারজনক ও উসকানিমূলক ঘটনার পরও, বাংলাদেশের পূজামণ্ডপে অশান্তি সৃষ্টিকারী কোনো কিছু ঘটেনি, সেটা যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক। ২০২৪ সালে জুলাই গণবিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার ভারতে পলায়নের পর থেকেই, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অনেক রকম পাঁয়তারা করেছে পতিত স্বৈরাচারের দোসররা।
ভারতের কতিপয় মিডিয়ায় মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছে, গুজব ছড়ানো হয়েছে, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এমন প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে জোরেসোরে। এমনকি বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিশাসন কায়েম হয়েই গেছে, বাংলাদেশ আর আফগানিস্তানের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই এমন কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু সব অপপ্রচার ও গুজবের মুখে ছাই দিয়ে, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এখনো অটুট। এ বছর বাংলাদেশের শহরে ও গ্রামে শারদীয় পূজামণ্ডপগুলোতে বরাবরের মতোই সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষের উপস্থিতিও দেখা গেছে। প্রতিমা বিসর্জনেও দেখা গেছে, বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের উপস্থিতি। হাসি, আনন্দ, বন্ধুত্ব আর উৎসবের আবহে কেটেছে এই কটা দিন।
বাংলাদেশে আবহমানকাল থেকেই হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধরা বাস করছেন। পর্তুগিজ ও ইংরেজ মিশনারিদের ডাকে সাড়া দিয়ে অনেক মানুষ খ্রিস্টান হয়েছেন। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষও এদেশে শান্তিতেই বাস করছেন। পাহাড় ও সমতলের ট্রাইবাল মানুষ চিরদিনই বাংলাভাষীদের সঙ্গে শান্তিতে ছিলেন। তবে অতিলোভী কিছু সমাজবিরোধী ও জবরদখলকারীর কারণে পাহাড়ে প্রায়ই অশান্তির আগুন জ¦লে ওঠে। পাহাড়ের অধিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পাহাড় ও সমতলের ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর অধিকার, সম্পদের নিরাপত্তা, তাদের নারীদের নিরাপত্তা এবং শিশুদের শিক্ষাগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরকারি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই। ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সব ধরনের বৈষম্য ও বিরোধের অবসান হোক। আমরা যেন ভুলে না যাই, সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। নাগরিক হিসেবে সবারই সমান অধিকার রয়েছে। এই সম-অধিকার বাস্তবায়িত হোক। কারণ পাহাড়ের কান্না পুরো দেশকেই অশান্ত করে তুলতে পারে। পাহাড়ে যে প্রাণহানি ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, এর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। যেকোনো ঘটনায় জনতা এবং সরকারি বাহিনী উভয়কে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। কোনো অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অযথা শক্তি প্রয়োগ না করে, ধৈর্যের সঙ্গে শান্তি বজায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশে এখন দরকার পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা। তার মানে অন্যের মতো প্রকাশের স্বাধীনতা। আমি আমার স্রষ্টাকে যে নামে ডাকি, যে রীতিতে তার উপাসনা করি সেটা তোমার চেয়ে ভিন্ন হতেই পারে। তুমি হয়তো তাকে ডাকো ভিন্ন ভাষায়, ভিন্ন নামে, ভিন্ন রীতিতে। কিংবা হয়তো তুমি তাকে ডাকো না। আমি একজনকে ডাকি, তুমি হয়তো একজনকেই নানারূপে ডাকো। তাতে কী? তোমার আমার ‘মানুষ’ পরিচয় তো সেজন্য খারিজ হয়ে যাচ্ছে না! অথচ কী ঘটছে? আমি হামলা করছি তোমার ওপর, তুমি হামলা করছ আমার ওপর। কেন? কারণ আমাদের ভাষা ভিন্ন, ঈশ্বরকে ডাকার রীতি ভিন্ন। কিংবা আমার ঈশ্বরকে তুমি মানো না অথবা তোমার ঈশ্বরকে আমি মানি না। সবার ওপরে মানব ধর্মই যে চূড়ান্ত, এ কথা কি আগে আমার পূর্ববর্তী মানুষরা বলে যাননি? বাংলার কবিরাও সব মত, পথ, ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবতাকে স্নান দিয়েছেন। বাংলার কবিরা বলেছেন, ‘নানান বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ, জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত’। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার অসংখ্য লেখায় সব ধর্মের ওপরে মানবতাকে স্থাপন করেছেন।
তিনি তার ‘গোরা’ উপন্যাসে নায়ককে প্রথমে ধর্মীয় গোঁড়ামিতে আকীর্ণ দেখিয়েছেন। পরে নায়ক গোরা উপলব্ধি করে যে, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ- খ্রিস্টান এসব ধর্মীয় বিভেদ সব ভ্রান্ত। ‘মানুষ’ এই পরিচয়ই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের রচনার মূল সুরই ছিল মানবতাবাদ। ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোনজন’ ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব’, ‘হায়রে ভজনালয় তোমার মিনারে চড়িয়া ভ- গাহে স্বার্থের জয়’ নজরুল তার সাম্যবাদীসহ অসংখ্য কবিতায় বাঙালির সাম্প্রদায়িক বিভেদ ঘুচিয়ে মানবধর্মকে বড় বলে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের সরকারপ্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী। আশা করি বাংলাদেশে এখন সব জায়গায় শান্তি ও সম্প্রীতির আবহাওয়া বিরাজ করবে। বাংলাদেশের আবহমানকালের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে যে শান্তি ও সম্প্রীতির বাণী রয়েছে, আমাদের যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য রয়েছে, তাকে আবার পরিপূর্ণভাবে ফিরিয়ে আনা দরকার। বাংলাদেশের পাহাড়ে-সমতলে, মন্দিরে-মসজিদে সর্বত্র যেন শান্তি বিরাজ করে।
অনেক সময় প্রতিবেশী দেশের কোনো ঘটনায় বাংলাদেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। কখনো গুজব রটনাকারীদের অপপ্রচার ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণায় দেশের শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে। এ জন্য দরকার সচেতনতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সময় চিলে কান নিয়ে গেল টাইপের গুজব ছড়ানো হয়। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকেও নজরদারি ও সতর্কতা দরকার। শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে আগে দরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যেন শহরে, গ্রামে, প্রত্যন্ত এলাকায় সব জায়গায় মানুষ নিরাপদে থাকে। নারীরা যেন নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারে। তাহলে পাহাড় বা সমতলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না, ঘটবে না সহিংসতা। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ প্রমাণ করেছে যে, তারা শক্তিশালী স্বৈরাচারকেও হঠাতে সক্ষম। এখন দরকার বিশ্বে শান্তি ও সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ স্থাপন করা। বাংলাদেশে যেন কোনোভাবেই ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির রাজত্ব কায়েম হতে না পারে। যেন ধর্মীয় সন্ত্রাস, অপপ্রচার ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা ও বিভেদের বিষবাষ্প ছড়াতে না পারে। প্রতিবেশী কোনো দেশের ধর্মীয় বিদ্বেষ ও অপপ্রচার যেন বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে।
আমার শৈশব ও কিশোর বেলার কথা মনে আছে। সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনেক সুন্দর পরিবেশ বিরাজ করত। তখন পাড়ায়-মহল্লায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ক্লাব ছিল। গ্রামে গ্রামে কবিগান, পালাগান, মেলা, বাউল গানের আসর বসত। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল। ছোটবেলায় শারদীয় পূজা দেখতে যাওয়ার স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল। সেই সঙ্গে পুরান ঢাকায় পূজার মেলায় মিষ্টি ও খেলনা কেনার স্মৃতিও অম্লান একইভাবে মহররমের মেলা এবং ঈদের মেলায় পাড়ার ছেলেমেয়েরা সবাই কত আনন্দ উল্লাস করতাম। ঈদেও প্রতিবেশী অন্য সম্প্রদায়ের মানুষরা বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। সেমাই খেতেন। আমিও প্রতিবেশীদের পূজার নাড়ুর ভাগ পেতাম।
এ কথা ঠিক যে, মুসলমানরা কখনো প্রতিমার সামনে আরতি করেন না বা অঞ্জলি দেন না, হিন্দুরা কোরবানির গরুর মাংস খান না। এটুকু পার্থক্য তো আছেই। কিন্তু পার্থক্য সত্ত্বেও পারস্পরিক সম্প্রীতির কোনো অভাব ছিল না। উৎসবে অনুষ্ঠানে পরস্পরের বাড়িতে যাতায়াত, শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যে কোনো ঘাটতি ছিল না। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মৌলবাদী শক্তির উত্থান বাংলাদেশের চিরকালীন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবহাওয়াকে অনেকটাই কলুষিত করেছে। এখনো সব শেষ হয়ে যায়নি। এ বছরের শান্তিপূর্ণ দুর্গাপূজা প্রমাণ করেছে বাংলাদেশে এখনো সম্প্রীতির সুবাতাস রয়েছে। শুধু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নয়, দরকার সব রাজনৈতিক দলমতের মানুষের মধ্যে, পাহাড়ি, সমতলবাসী সবার মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা বিধান করা।
সামনে নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে যেন হানাহানি বা অশান্তি না দেখা দেয় সেদিকে সরকারের যেমন কড়া নজরদারি থাকতে হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা থাকতে হবে। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু তাই বলে সেটা যেন হানাহানির পর্যায়ে না যায়। সন্ত্রাসবাদী ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী কোনো শক্তি যেন এই সুযোগে মাথাচাড়া না দিতে পারে। সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়কে শান্তিপূর্ণ রাখতে হবে। অনেক সময় ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করেও, বড় অঘটন ঘটে যেতে পারে। গুজবে কান দেওয়া চলবে না মোটেই। বিদ্বেষমূলক যেকোনো পোস্ট, স্ট্যাটাস বা ভুয়া খবর দেখলে আগে নিশ্চিত হোন খবরটি সত্যি কিনা। চিলে কান নিয়ে গেছে, এই গুজবে চিলের বাড়ি ধ্বংস করতে বনে আগুন লাগানোর আগে দেখুন কান সঠিক জায়গাতে আছে কিনা। ছোট্ট দেশ আমাদের। আমরা কি সন্ত্রাস ও বিরোধমুক্ত দেশ গঠন করতে পারি না? এদেশকে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে পারি না? প্রত্যাশা করি, বাংলাদেশ হোক বিশ্বে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দেশ। মানবতার বাণী ঊর্ধ্বে তুলে ধরার দেশ।
লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক, শিক্ষক ইয়ুননান বিশ্ববিদ্যালয়, কুনমিং