সালমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব
ড. মোহাম্মদ দুলাল মিয়া [আপডেট : কালের কণ্ঠ, ২৩ নভেম্বর ২০২৫]

আঞ্চলিক ভূরাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বলা যায় যে, অস্থির এক সময় পার করছে মধ্যপ্রাচ্য। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, জর্ডানের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানে ইসরায়েলের বোমা হামলা, ইরানের পাল্টা ড্রোন হামলা এবং যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা সব মিলিয়ে বেশ ঘোলাটে এবং অনিশ্চিত অবস্থার তৈরি হয়েছিল। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের মাত্র কিছুদিন আগে মধ্যপ্রাচ্য সফর করে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও অনেকের প্রত্যাশা ছিল যে, তার এ সফর উত্তেজনা কমাতে কিছুটা ভূমিকা রাখবে, কিন্তু সেই প্রত্যাশা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি। চার দিনের এ সফরে ট্রাম্প ভ্রমণ করেন সৌদি আরব, কাতার ও আরব আমিরাত।
ট্রাম্পের এ সফরের মাত্র ছয় মাসের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সফরে গেলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ২০১৮ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যার পর এটাই তার প্রথম সফর। খাসোগি হত্যার পর সৌদি প্রশাসনের ওপর একটি বিরাট নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল বিশ্বজুড়ে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট দেখায় যে, যুবরাজ নিজেই এ হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন, যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কোর্টে তার বিরুদ্ধে একটি মামলাও হয় ২০২২ সালে। ২০১৯ সালের নির্বাচনী প্রচারে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, খাসোগিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে তিনি সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখবেন।
এর ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক শক্তি—যেমন মিশর, ইরাক এবং সিরিয়াকে কেন্দ্র করে তার প্রভাব বলয় বিস্তার করতে চেয়েছিল। কিন্তু আঞ্চলিক শক্তির এই উৎসগুলো নিজেদের সীমাবদ্ধতা এবং অভ্যন্তরীণ বা আঞ্চলিক নানাবিধ অস্থিরতা অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রের টেকসই মিত্র হয়ে উঠতে পারেনি। যদিও জর্ডান, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সবাই প্রভাবশালী, আঞ্চলিক শক্তির মাপকাঠিতে এ দেশগুলো প্রয়োজনের চেয়ে দুর্বল হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক অংশীদার হতে পারেনি। তারপর তুরস্ককে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নীতিমালার প্রতি মনোযোগ দেয়। তাতেও খুব একটা লাভ হয়নি। তুরস্ক যদিও একটি শক্তিশালী ন্যাটো মিত্র, যার এ অঞ্চলে নানাবিধ স্বার্থ রয়েছে, তার সক্ষমতাও সীমিত।
ভূরাজনীতির এ হিসাব-নিকাশ সৌদি আরবকে মার্কিন মুল্লুকের রাজনৈতিক দরবারে বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তার ওপর সৌদি আরবের রয়েছে তেলের বিশাল মজুত। জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ‘ওপেক’ বিশ্বব্যাপী তেলের উৎপাদন ও দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ করে। ওপেকে রয়েছে সৌদি আরবের জোরালো ভূমিকা। তাইতো জো বাইডেন তার নির্বাচন-পূর্ব প্রতিশ্রুতি ভুলে ২০২২ সালের জুলাই মাসে সৌদি আরব সফর করেন। এ সফরকে অনেকেই তার পূর্বপ্রতিশ্রুতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু রাশিয়ার ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে জ্বালানি তেলের উৎপাদন হ্রাস পেলে তার দাম বাড়তে থাকে। বিশ্বজুড়ে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মার্কিন মুল্লুকে জো বাইডেনের জনপ্রিয়তা কমতে থাকলে তিনি যুবরাজ সালমানের দ্বারস্থ হন তেলের উৎপাদন বাড়াতে। এটা ছিল বিশ্বের কাছে একটা বড় ইঙ্গিত যে, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন নীতি এবং প্রভাবের কেন্দ্র হবে সৌদি আরব।
এরই মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে সৌদি আরব মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে কয়েকবার। এটা ইঙ্গিত করে যে, মস্কোর সঙ্গে রিয়াদের একটা ভালো বোঝাপড়া রয়েছে। আর চীন চেষ্টা করছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব খর্ব করে নিজেদের উপস্থিতি জাহির করতে। এ প্রচেষ্টায় রিয়াদ ছিল বেইজিংয়ের সম্ভাব্য মিত্রদের তালিকায় একদম প্রথম। রিয়াদ বেইজিং ও মস্কোঘেঁষা হোক, এটা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির অপছন্দের তালিকায় এক নম্বর। তাই সৌদি যুবরাজকে নিজেদের দিকে টানার অর্থই হলো মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাবকে ক্ষীণ করার একটি উপায়। তবে রিয়াদ-বেইজিং সম্পর্ক কতটুকু শক্ত হতে পারে, এটা অনুমান করা যাবে যুবরাজের যুক্তরাষ্ট্র সফরে কী কী চুক্তি স্বাক্ষর হয় তার ওপর। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি একটি নিরাপত্তা চুক্তি, সৌদি আরবে মার্কিন পরমাণু প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অগ্রগতির ক্ষেত্রে সহযোগিতা—এসব বিষয়ে দুটি দেশের মধ্যে চুক্তি হওয়ার কথা।
তদুপরি, সৌদি আরব তথা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিয়ে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা প্রকাশ করছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল কাতারে হামাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হত্যার চেষ্টা করেছিল। কাতারের মাটিতে ইসরায়েলের হামলা পারস্য উপসাগরে মার্কিন দেশগুলোকে বিচলিত করে তুলেছে। অন্যদিকে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি তেল স্থাপনায় ইরানের আক্রমণের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কার্টার চুক্তি অনুযায়ী, উপসাগরীয় তেলক্ষেত্র ও শক্তিসম্পদ আঞ্চলিক এবং বাহ্যিক হুমকি থেকে রক্ষা করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গত চার দশকে এ প্রতিশ্রুতিগুলো হালে তেমন পানি পায়নি। তাই সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা গ্যারান্টি চাচ্ছে। এ কারণেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি আরবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি করতে আগ্রহী। প্রস্তাবিত এ চুক্তি রিয়াদ-ওয়াশিংটন নিরাপত্তা সম্পর্কের আধুনিকীকরণের জোরালো ইঙ্গিত বহন করে। যদি এ নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর হয়, তবে চীন সৌদির তেল যতই কিনুক না কেন বা চীনা কোম্পানিগুলো সৌদি অবকাঠামো কতটা তৈরি করুক না কেন, রিয়াদ ওয়াশিংটনের বন্ধু এবং অংশীদার হয়েই থাকবে।
পক্ষান্তরে, সৌদি যুবরাজকে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে প্ররোচিত করতে আগ্রহী হবেন ট্রাম্প—এমনটাই অনেকের ধারণা। এর মূলে রয়েছে আব্রাহাম চুক্তি। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তত্ত্বাবধানে হোয়াইট হাউসে ইসরায়েল এবং আরব আমিরাতের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ‘আব্রাহাম চুক্তি’ হিসেবে গণ্য হয়। এ চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মধ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশ এখনো নীরব। ট্রাম্প যদি সৌদি আরবকে এ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, সেটা হবে তার জন্য বিশাল সাফল্য। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে যাবেন ট্রাম্প। তবে তিনি এ বিষয়ে চাপ প্রয়োগের মতো কিছু করবেন না বলেই অভিমত বিশেষজ্ঞদের। কারণ, ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না দিলে সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে এগোবে না, এটা অনেকটাই নিশ্চিত। ইসরায়েলের বর্তমান যে মনোভাব, তাতে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি এখনো অনেক দূরের বিষয়। এ মনোভাব অপরিবর্তিত থাকলে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি বাস্তবে রূপ নেবে না। তবে, অন্য কিছু জায়গায় অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে সৌদি আরবের জন্য। যেমন, ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বা যুদ্ধবিরতি অর্জনের প্রচেষ্টার ওপর ট্রাম্প সালমানকে বোঝাতে পারেন। সৌদি নেতৃত্বাধীন যুদ্ধবিরতি উদ্যোগগুলোকে মার্কিন সমর্থন শক্তিশালী করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য একটি সমাধানের পথ তৈরি করতে পারে। এটি সম্ভব হলেই আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার একটি প্রধান উৎস বন্ধ হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার আলোচনার টেবিলে ইরানের জায়গা অবশ্যই আছে। একটা সময় ছিল যখন সৌদি জোটের সঙ্গে ইরানের দূরত্ব বেশি ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের দূরত্ব কিছুটা কমেছে, যদিও খুব বেশি নয়। ইরানের দুর্বলতা সৌদি জোট কামনা করতেই পারে, কিন্তু ইসরায়েলি উদ্ধততা নিয়ে অবশই তারা চিন্তিত হবে। সৌদি যুবরাজদের ফিলিস্তিনদের প্রতি তেমন আগ্রহ না থাকলেও, সে দেশের সাধারণ মানুষের রয়েছে ভিন্নমত। তাই ইরানকে নিষ্ক্রিয় করার অভিপ্রায়ে ইসরায়েলের মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি সৌদি জোটের মঙ্গল বয়ে আনবে না। ইসরায়েলকে প্রকৃত শান্তি আলোচনায় বসানোর ব্যাপারে ট্রাম্পকে বোঝাতে না পারলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সম্পর্ক উন্নয়ন নিছক একটা কূটনৈতিক বিষয় নয়, বরং ভূরাজনৈতিক স্বার্থ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার এক জটিল সমীকরণ। ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রিয়াদ-ওয়াশিংটন সম্পর্ককে আরও অর্থবহ করে তুলছে। এ সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নয়, বরং আঞ্চলিক ক্ষমতা ভারসাম্য, বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক মানচিত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে। দুই দেশের বোঝাপড়া কতটা গভীর হয় এবং যুবরাজ সালমান কতটা দক্ষতার সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ ও মতবিরোধকে সামলাতে পারেন, তার ওপরই মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, কলেজ অব ব্যাংকিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল স্টাডিজ মাস্কাট, ওমান