কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

রোহিঙ্গা সংকটের আট বছর : সমাধান কতদূর

ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন [সূত্র : যুগান্তর, ২৫ আগস্ট ২০২৫]

রোহিঙ্গা সংকটের আট বছর : সমাধান কতদূর

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ সব সময় আশাবাদী এবং সক্রিয় হওয়ার পরও এ সমস্যা নিরসনে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়নি। রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে আট পেরিয়ে নয় বছরে পদার্পণ করেছে। নানা ধরনের বাধার কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেও এ পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন অঞ্চলে আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ চলছে এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের মিয়ানমার অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আরাকান আর্মির দখলে থাকা রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় রোহিঙ্গাদের ওপর আরাকান আর্মির অত্যাচারের কারণে প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা তাদের ভিটেমাটি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছে। রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্স আশঙ্কা করছ যে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তারা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও পরিকল্পিত সহিংসতায় গত ১৮ মাসে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। নতুন আগত এ রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে, যা বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ সহায়তার ওপর চাপ ফেলছে।

 

 

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর রোহিঙ্গা সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে এর সমাধানের জন্য বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। এ সংকট সমাধানে প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গাবিষয়ক একজন উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। বর্তমানে নিয়োগপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ও তার সহযোগীরা এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এবং চলমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারে একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরির জন্য সব অংশীজনদের নিয়ে একত্রে কাজ করার পদক্ষেপ নিয়েছেন।

 

 

জাতিসংঘ মহাসচিব ১৩ থেকে ১৫ মার্চ বাংলাদেশ সফরের সময় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। জাতিসংঘের মহাসচিবের এ সফর রোহিঙ্গা সমস্যাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি এনে দিয়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তন এবং তাদের অধিকার সম্পূর্ণরূপে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আরাকান আর্মির সঙ্গে সংলাপে বসা জরুরি এবং মিয়ানমারে সংঘাত বন্ধ ও আবার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মিয়ানমারের সব প্রতিবেশী দেশের চাপ বৃদ্ধি করা আবশ্যক বলে জাতিসংঘ মহাসচিব মনে করে।

 

 

রোহিঙ্গা সংকটে সহায়তাকারী রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলো এ সংকট সমাধানে যে অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকে, তা বিশ্বের অন্যান্য মানবিক সংকটে সহায়তা দেওয়ার কারণে কমে যাওয়াতে রোহিঙ্গা সংকটে তহবিল ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তহবিল কমে যাওয়া ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, সেসব সমস্যা মোকাবিলায় একটা কার্যকরী অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে সে অনুসারে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রধানদের রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে ব্রিফ করা হয়েছে এবং তাদের কাছে রোহিঙ্গাদের জন্য আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার আবেদন জানানো হয়।

 

 

বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আসিয়ানের ভূমিকা কাজে লাগানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে মালয়েশিয়া আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানান, মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা ও প্রভাব এ সংকট সমাধানে কাজে লাগতে পারে। আশা করা যায়, মালয়েশিয়া তাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান শীর্ষক আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। মিয়ানমারে শান্তি ফিরে না এলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আরও প্রলম্বিত হবে, তাই মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ বন্ধ হওয়া দরকার।

 

 

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানান, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য মালয়েশিয়া ও কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ মিয়ানমারে একটি যৌথ প্রতিনিধিদল পাঠাবে। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে মিয়ানমারের এ মিশন সমন্বয় করবেন। মিয়ানমারে শান্তি নিশ্চিত করা এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর যে নৃশংসতা চলছে, এর একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা এ মিশনের মূল উদ্দেশ্য।

 

 

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসিয়ান চেয়ারম্যানের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত ওথমান হাশিমের সঙ্গে বৈঠক করেন। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা হ্রাসে ওথমান হাশিম গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। এ আলোচনায় জাতিসংঘের রোহিঙ্গাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ সংকট সমাধানে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি এবং রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আশা প্রকাশ করা হয়।

 

 

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ, কাতার ও বাংলাদেশ তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল নিশ্চিত করতে এবং তাদের রাখাইনে প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বাড়াতে এ সম্মেলনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নেওয়া নতুন বৈশ্বিক উদ্যোগ, যা সমস্যা সমাধানে আশার সৃষ্টি করেছে। এ ধারাবাহিকতায় ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় রোহিঙ্গাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে এবং পরবর্তী সময়ে ৬ ডিসেম্বর রোহিঙ্গাবিষয়ক তৃতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন কাতারে অনুষ্ঠিত হবে। আশা করা যায়, এ সম্মেলন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে সহায়ক হবে এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করবে।

 

মিয়ানমারে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গাদের অধিকার, স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিল নামে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়েছে। মিয়ানমার ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর তৈরি করা এর মূল লক্ষ্য। এ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যথেষ্ট উদ্যোগ না থাকায় এ সংকট আরও গভীর হয়েছে। রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদেরও তাদের দাবি ও অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে রোহিঙ্গাদের তাদের মধ্যেকার বিভক্তি দূর করে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং তাদের মধ্যে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি ও প্রেষণার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য শিক্ষা ও কর্ম দক্ষতা বাড়িয়ে রোহিঙ্গাদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হলে তা সম্ভব হবে না। বিদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো এবং সেখানকার নেতাদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয়পূর্বক সংকট নিরসন ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কাজ করতে হবে। প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় কূটনীতি ও তথ্যভিত্তিক প্রচারণা বাড়ানো দরকার। সচেতনতা বৃদ্ধি, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সম্প্রীতি বাড়াতে আলোচনা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা জরুরি।

 

 

মিয়ানমারে ফিরে গেলে রোহিঙ্গা ও রাখাইনদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নিয়োজিত সব অংশীজনকে মিয়ানমার ও বিদেশে অবস্থানরত আরাকান আর্মির ঊর্ধ্বতন নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে। নতুন করে রোহিঙ্গাদের ওপর আরাকান আর্মির অত্যাচার বন্ধ করতে হবে এবং দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে রাখাইনদের অত্যাচার ও নিপীড়ন সম্পর্কে অবহিত করে অবিলম্বে তা বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। রোহিঙ্গাদের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রাখতে হবে ও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে রোহিঙ্গা তরুণদের দক্ষ জনবল হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। রাখাইনের অশান্ত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে যে কোনো ধরনের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে। রাখাইনের আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোয় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে কাজ করতে হবে।

 

 

রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা হ্রাস পাচ্ছে এবং একই সঙ্গে নতুন আগত রোহিঙ্গা ও নতুন করে জন্ম নেওয়া শিশুদের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চলমান সহায়তার ওপর চাপ পড়ছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ সহায়তা চলমান রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। ভূকৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সবাই তাদের নিজস্ব স্বার্থ নিয়ে কাজ করে, তাই নিজের অধিকার নিজেদেরই সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জন করতে হবে। আঞ্চলিক ও বিশ্বের যেসব দেশে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছে ও নিচ্ছে, এ সংকট সমাধানে তাদেরও সঙ্গে রাখতে হবে। রাখাইনের জনগণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে রোহিঙ্গা ও রাখাইনদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্প্রীতি বাড়বে ও বিদ্বেষ কমবে। ফলে এ অঞ্চলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে ও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তা সহায়ক হবে। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই একটা রোডম্যাপ ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে তা কার্যকর করার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। সবশেষে, দীর্ঘদিন চলমান এ রোহিঙ্গা সমস্যা সব বাধা পেরিয়ে আলোর মুখ দেখুক, এটাই কাম্য।

 


ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন : মিয়ানমার ও রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক