রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভূরাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা, পার্ট ২
ড. মো. মোরশেদুল আলম [সূত্র : জনকণ্ঠ, ১১ অক্টোবর ২০২৫]

(গত সংখ্যার পর)
আবার যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো যে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত নীতি প্রকাশ করেছে, সেখানে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান। তাছাড়া রাখাইনের বিভিন্ন জায়গায় কিছু অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে; যার মালিকানা মূলত চীন ও রাশিয়ার। আবার চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে যে ৬টি অর্থনৈতিক করিডর স্থাপন করা হবে, তার মধ্যে দুটি নৌভিত্তিক। এর মধ্যে ১টি চীন-মিয়ানমার করিডর নামে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের প্রভাববলয় সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
রাশিয়াও এই প্রতিযোগিতায় রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রেখে নিজেদের জাতীয় স্বার্থরক্ষা করছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও সিঙ্গাপুর। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বার্মা অ্যাক্ট প্রবর্তন করেছে। এই আইনের মাধ্যমে মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীকে সহায়তা করতে পারে। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রভাব পড়বে। আবার রাখাইনের সিতওয়েতে ভারতের তৈরি করা গভীর সমুদ্রবন্দর এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলও আক্রমণের মুখে। শিলিগুড়ি করিডরের বিকল্প হিসেবে ভারত যে কালাদান প্রকল্প গ্রহণ করেছিল, তা এখন চীন সমর্থিত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।
এতে করে রাখাইনে ভারত ও চীনের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বও নতুন রূপ পরিগ্রহ করতে পারে।
চীন মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে সরাসরি সমর্থন দিয়ে আসছে, আবার একই সঙ্গে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, আরাকান আর্মি বেশিরভাগ অস্ত্র পাচ্ছে চীন থেকে। ৪৬ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াভিত্তিক একটি সামরিক সূত্র জানায়, চীন আরাকান আর্মিকে ৯৫ শতাংশ অর্থায়ন করছে। মিয়ানমারের বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে প্রচলিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা বা শুধু চীনের মধ্যস্থতা কোনো সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে শুধু দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার প্রচেষ্টা ও চীনের ওপর নির্ভরতা খুব একটা কাজে দিচ্ছে না; তাই কেন্দ্রের দাবিদার ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) ও আরাকান আর্মি তথা তাদের রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। একদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারেও যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তাতে, দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে জটিল এক ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বাংলাদেশ। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়টি কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একদিকে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে চীনবিরোধী জোটের শক্তির মহড়া, অন্যদিকে রাখাইনে পরিবর্তিত ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব প্রভৃতি কারণে রোহিঙ্গারা এখন আন্তর্জাতিক ও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ জান্তাবিরোধীদের রাজনীতির গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ, রাখাইনে নতুন করে সংঘাত এবং বিদ্যমান রোহিঙ্গা সংকট মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য পুরো পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের রাখাইনকে ঘিরে ভূ-রাজনীতি এবং পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকায় মিয়ানমারের সঙ্গে সংকট সমাধান বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবেও সামনে এসেছে।
রাখাইনে চীন, ভারত, রাশিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে; রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটি বাংলাদেশের জন্য সেখানে অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক জটিলতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত। এই সংকট সমাধানে বহুমুখী কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। প্রত্যাবাসন নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তার ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে সৃষ্ট হতাশা এবং এর নানাবিধ নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাখাইনে দ্রুত সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে টেকসই এবং স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের শুরু করা প্রয়োজন।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বাংলাদেশকে সহযোগিতা করা। মিয়ানমারে শান্তি, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য আসিয়ান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক পক্ষকে কাজ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বিশ^ব্যাপী জনমত তৈরি হলেও মিয়ানমারের জান্তা সরকার তা আমলে নিচ্ছে না। ঐতিহাসিকভাবেই মিয়ানমার সরকার তার দেশ থেকে বের করে দেওয়া রোহিঙ্গাদের সে দেশে পুনরায় ঢুকতে না দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলগুলো পরিবর্তন করতে হবে। আবার বিশ^বাসী দেখেছে, জাতিসংঘে রোহিঙ্গা বিষয়ক প্রস্তাবে চীন ও রাশিয়া ভেটো প্রদান করে। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়াসহ সকল বৃহৎ শক্তিকে পাশে নিয়েই রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজে বাংলাদেশকে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ নতুন বৈশি^ক ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকেই সরে যাচ্ছে; যা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে বিলম্বিত করছে। রোহিঙ্গাদের জন্য নাগরিকত্বের পথ সুগম করাসহ রাখাইন রাজ্য বিষয়ক কফি আনান উপদেষ্টা কমিশনের সুপারিশসহ সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে ব্যাপকভিত্তিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটের প্রতি বিশে^র মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আর্জেন্টিনার ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন তথা সর্বজনীন বিচারব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সংঘটিত ব্যাপকভিত্তিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে চলমান বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রেও আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন, জাতিসংঘের ইনডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার (আইআইএমএম)-এর প্রধান নিকোলাস কৌমজিয়ান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইআইএমএমের কাজের পরিধি মিয়ানমারে শুধু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধসংক্রান্ত বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আর্জেন্টিনায় সর্বজনীন বিচারব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়েছিল।
মিয়ানমারে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা কার্যকর হতে পারে। মিয়ানমারে চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘাত, রাখাইন রাজ্য আরাকান আর্মির দখলে নেওয়া এবং বিদ্যমান রোহিঙ্গা সংকট সবমিলিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের প্রতিকূলে। রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবিক সহযোগিতা হ্রাস পাওয়ায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের জন্য আরও বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশে^র অনেক দেশই সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে যে অবস্থান নিয়েছে, তা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ দিতে হবে। আসিয়ানের সীমাবদ্ধতা থাকলেও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সদস্য রাষ্ট্রগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যা এখন আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকেও প্রভাবিত করছে। ২০২৪ সালের ১০ জুলাই জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৫৬তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের ওপর একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল।
গৃহীত প্রস্তাবটিতে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত করা এবং তাদের জোরপূর্বক বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। প্রস্তাবটি মিয়ানমারে যুদ্ধরত সকল পক্ষকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়াসহ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়। উক্ত প্রস্তাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যৌন অপরাধসহ সকল প্রকার নির্যাতন, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থায় আনা ও তদন্ত প্রক্রিয়া জোরদার করার প্রতি গুরুত্বরোপ করা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে চলমান বিচার প্রক্রিয়াকেও সমর্থন জানানো হয়। গত সেপ্টেম্বর মাসে ৭৯তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সপ্তাহব্যাপী উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ইউএনজিএর তৃতীয় কমিটিতে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।
এক বার্তায় বলা হয়, ওআইসি ও ইইউর যৌথভাবে পেশ করা ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রস্তাবটি এইএনজিএর তৃতীয় কমিটিতে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। এ বছর অন্য বিষয়গুলোর মধ্যে প্রস্তাবটি অন্যান্য দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা মুসলিমসহ সকল শরণার্থীর প্রত্যাবর্তনের অধিকার নিশ্চিত করার এবং স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ টেকসই প্রত্যাবর্তন ও পুনর্মিলনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি করতে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। এতে হত্যা, ধ্বংস ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা, শিশুসহ বেসামরিক নাগরিক বিশেষ করে রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্য সংখ্যালঘুদের জোরপূর্বক সশস্ত্র বাহিনী অথবা সশস্ত্র গ্রুপে নিয়োগসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপব্যবহারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। প্রস্তাবটিতে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য সমস্ত দায়বদ্ধতা প্রক্রিয়াকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
প্রস্তাবটি একটি আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর জোর প্রদান করে এবং সম্পূর্ণভাবে পাঁচ দফার ঐকমত্যের উদ্যোগগুলোকে তুলে ধরা হয়। এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন আয়োজন করেছে জাতিসংঘ। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনসহ সংকটের টেকসই সমাধানের জন্য একটি ব্যাপক, উদ্ভাবনী, সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা প্রস্তাব করার জন্য ওই সম্মেলনের লক্ষ্য ছিল সামগ্রিক সংকট পর্যালোচনা করা।
রোহিঙ্গাদের নিজদেশ মিয়ানমারে স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিতকল্পে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। রোহিঙ্গারা যেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করে তাদের নিজ ভূমি রাখাইনে ফেরত যেতে পারে। রোহিঙ্গা সমস্যার উৎপত্তি যেহেতু মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও মিয়ানমারের নিকট রয়েছে। মিয়ানমার জান্তা সরকার বারবার অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। এখন পর্যন্ত মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনে কোনা কার্যকর পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর ধর্মীয় এবং জাতিগত দমন-পীড়ন বন্ধে মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে।
বিশ^বাসী এখন উদ্ভূত নতুন নতুন সংঘাত প্রত্যক্ষ করছে এবং দুর্ভাগ্যবশত রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক সমাধান ও এর ক্রমবর্ধমান মানবিক চাহিদা মেটানো দুটো থেকেই বিশে^র মনোযোগ হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাতসহ বৈশি^ক অন্যান্য সাম্প্রতিক সংঘাতের ডামাডোল এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটি এখন অনেকটা গৌণ হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৭ সালে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তদারকিতে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব প্রদান করেছিল। কিন্তু সে সময় ভারতের অসম্মতির কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল কেবল জনগোষ্ঠীটির অনিশ্চিত, অনিরাপদ, আশাহীন জীবনের অবসান ঘটাবে তা নয়; একই সঙ্গে তা বাংলাদেশের নিজের জন্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও সবচেয়ে বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ বলে মনে করি। তবে নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক শক্তি হলো চীন ও ভারত। এই নিরাপদ অঞ্চলের ধারণাটি পশ্চিমা বিশ^ তথা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিকট স্বীকৃত হতে হবে।
নানা কূটনেতিক জটিলতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আটকে আছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বহুমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা জরুরি। মিয়ানমার ও রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধ বন্ধে এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা দেশগুলোর সহায়তায় রোহিঙ্গাদের রাখাইনে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করতে আরাকান আর্মি, সেখানকার অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় রাখাইনদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এই সংকট সমাধানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাসের দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। সংকট সমাধানে বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে চাপ প্রয়োগ এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে অবিলম্বে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
বিশেষ করে এ ইস্যুতে চীন, রাশিয়া ও ভারতের সমর্থন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংকট সমাধানে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংস্থা আসিয়ানের নিকট তাদের ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুকে এজেন্ডাভুক্ত করার প্রস্তাব করেছে। এটিও নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কারণ আঞ্চলিক চাপ জোরদার ব্যতিরেকে শুধু বৈশ্বিক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাও বাংলাদেশকে অব্যাহত রাখতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়া মানেই আরও দীর্ঘমেয়াদে তা আটকে যাওয়া। প্রত্যাবাসন ইস্যুতে কোনো গোষ্ঠী যাতে পরিস্থিতি জটিল করতে না পারে সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
(সমাপ্ত) লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়