কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভূরাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা

ড. মো. মোরশেদুল আলম প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ১০ অক্টোবর ২০২৫

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভূরাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা

মিয়ানমারের রাখাইনে ভারত, চীন, জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের ভূকৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। একদিকে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে চীনবিরোধী জোটের শক্তির মহড়া, অন্যদিকে রাখাইনে পরিবর্তিত ভূকৌশলগত গুরুত্ব প্রভৃতি কারণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এখন আন্তর্জাতিক এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ জান্তা সরকার বিরোধীদের রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া অপ্রতুল সম্পদ ও নানাবিধ সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব।

 

 

 সীমান্ত এলাকায় চলমান সশস্ত্র সংঘাতের পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মানব পাচার, মাদক চোরাচালান, জঙ্গি কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটে জর্জরিত বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে বিভিন্ন চেষ্টা করেও মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এই জনগোষ্ঠীকে এখনো তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে পারেনি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর মধ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থা নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে বাড়তি প্রায় ৬০ হাজার মানুষের অনুপ্রবেশের ফলে মানবিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এতে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকটরূপে ধরা পড়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অবস্থা বিবর্তনের ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং নতুন করে আরও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ফলে ব্যাপক জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।

 

 

রাখাইনে রোহিঙ্গা সংকটে বিভিন্ন বিশ্লেষক জাতিগত সংঘাত কিংবা ধর্মীয় বিদ্বেষকে দায়ী করলেও সংকটের নেপথ্যে বহুমাত্রিক কারণ খুঁজে পেয়েছেন রুশ বিশ্লেষকরা। এই সংকটের পশ্চাতে অভ্যন্তরীণ ও বহির্দেশীয় দুই ধরনের কারণই রয়েছে বলে তারা মনে করেন। বড় বড় ভূরাজনৈতিক ক্রীড়নকরা এর সঙ্গে জড়িত বলে তারা ধারণা করেন। ওই বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের মাটির নিচে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ সংকটের ভিত্তিমূল। ২৪ রুশ সংবাদমাধ্যম স্পুটনিকের রোহিঙ্গা সংকটসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এইসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ অব দ্য রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এর সেন্টার ফর সাউথ ইস্ট এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং ওশেনিয়াবিষয়ক পরিচালক দিমিত্রি মোসিকায়ভ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘আরটি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, আন্তর্জাতিক ক্রীড়নকরা রোহিঙ্গা পরিস্থিতি আরও উসকে দিচ্ছে। মোসিয়াকভের মতে, রোহিঙ্গা সংকট অন্ততপক্ষে একটি ত্রিমাত্রিক ঘটনা। প্রথমত, এটি চীনবিরোধী একটি খেলা। কারণ আরাকানে (রাখাইন রাজ্য) চীনের বিশাল বিনিয়োগ আছে।

 

দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মুসলিম উগ্রপন্থা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এমনটা করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, আসিয়ানের মধ্যে অনৈক্য (মিয়ানমার ও মুসলিমপ্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মধ্যে অনৈক্য) তৈরি করার প্রচেষ্টা এটি।

 


রোহিঙ্গা ইস্যুটি আঞ্চলিক সংকটের রূপ পরিগ্রহ করেছে। এতে করে এই অঞ্চলের অর্থনীতি, রাজনীতি ও নিরাপত্তায় এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। প্রতিবেশী বড় দুই দেশ ভারত ও চীন মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পর্ক না থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। আর এর সুযোগ নিচ্ছে দেশটি। রোহিঙ্গা সংকটটি বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করেছে। তবে এ সমস্যা এক দিনের নয়। এর বিভিন্ন জটিল দিক রয়েছে। প্রাকৃতিক ও খনিজসম্পদসমৃদ্ধ দেশটির ক্ষমতার প্রধান অংশীদার সেনাবাহিনী।

 

 

আন্তর্জাতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর রয়েছে বহুমুখী প্রতিযোগিতা ও স্বার্থ। এছাড়াও ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও আদর্শগত দ্বন্দ্ব রয়েছে। কর্তৃত্ববাদী শাসন, ধর্মীয় নিধন ও প্রাকৃতিক সম্পদ এ সংকটের বিভিন্ন প্রবণতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘায়িত উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তাদের প্রত্যাবাসনের অনিশ্চিয়তা সর্বস্তরে ব্যাপক হতাশার সৃষ্টি করেছে। মানবপাচার ও মাদক চোরাচালানসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে।  মূলত চীন, ভারত ও রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক স্বার্থে মিয়ানমারে ব্যাপক পরিসরে বিনিয়োগ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে প্রধান অন্তরায়। এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

 

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের প্রতি কোনো দেশের সমর্থন না থাকলেও এশিয়ার অন্যতম দুটি শক্তিধর রাষ্ট্র এবং মিয়ানমারের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত ও চীনের সমর্থন রয়েছে। মিয়ানমারে চীনের যে স্বার্থ অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় ব্যাপক ও বিস্তৃত। ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে চীনের নিকট মিয়ানমার খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। ২০১৩ সালে চীনের বিশ^ব্যাপী নতুন ভূকৌশলগত পরিকল্পনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরের তীর অঞ্চল রাখাইন (পূর্বের আরাকান) বিশে^র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারকে ঘিরে চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ এবং বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি। দেশটির প্রকাশিত এক তথ্যে জানা যায়, এর পরিমাণ আনুমানিক ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; যা সব পশ্চিমা দেশের মোট বিনিয়োগের দ্বিগুণেরও বেশি। যদিও মিয়ানমারে চীনের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ কৌশলগত কারণে খুব গোপন।

 

 

 শুধু গোলযোগপূর্ণ রাখাইনের সিতওয়ে শহরের ‘শয়ে’ গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস সঞ্চালন (শয়ে থেকে কুনমিং হয়ে চীনের গোঞ্জেহ প্রদেশ) পাইপলাইন নির্মাণ ও তার নিরাপত্তার জন্য সেনানিবাস তৈরি ও আধা সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প তৈরিতে বিনিয়োগ করেছে ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার; যার সার্বিক দায়িত্বে রয়েছেন স্বয়ং মিয়ানমারের সেনাপ্রধান। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, চীন শুধু রাখাইনেই সব মিলিয়ে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রকল্প চলমান রয়েছে।

 


আবার ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের স্থল সীমান্ত সংযোগ রয়েছে। রাখাইন রাজ্য ভারতের জন্য ভূ-কৌশলগত স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। মিয়ানমারে ভারতের প্রভাব হ্রাস, ভারতকে কৌশলগতভাবে ঘিরে ফেলা এবং যে কোনো মূল্যে মিয়ানমারকে হাতে রাখা চীনের অন্যতম সামরিক কৌশল। রাখাইনের আকিয়াব সমুদ্রবন্দরে চীনের জ্বালানি তেলের টার্মিনাল তৈরি হচ্ছে; যার প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে তেল আমদানিতে মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে নিজের সামরিক শক্তির আধিপত্যকে জানান দেওয়া।

 

৩৪ এজন্য চীন মিয়ানমারের নিকট থেকে নিজ স্বার্থ উদ্ধারে মরিয়া। ৩৫ চীন অবরোধের চার দশক ধরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিকট সব ধরনের অস্ত্রের প্রায় একক বিক্রেতা। চীনের নির্মিত অস্ত্রই মিয়ানমার প্রতিরক্ষা খাতের প্রধান শক্তি। মিয়ানমারের সামরিক বাজারের ৯০ শতাংশই হচ্ছে চীনের দখলে। অস্ত্র উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয়, অস্ত্র প্রযুক্তি ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সুইডেনভিত্তিক ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ১৯৮৮ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কেবল চীনের নিকট থেকে ১৬৯ কোটি ডলারের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করেছে মিয়ানমার।

 

 

সুতরাং এত বড় অস্ত্রের বাজার চীন কখনোই হাতছাড়া করতে চাইবেনা এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া চীনের বিরুদ্ধে এর সীমান্ত সংলগ্ন মিয়ানমারের কাচিন, সান, কোকাং অঞ্চলসহ কয়েকটি রাজ্য ও এলাকায় স্বাধীনতাকামীদের অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মিয়ানমারকে বশে রাখতেই চীন এমন দ্বিমুখী কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। কাজেই মিয়ানমারের নিরাপত্তার জন্য চীনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যেমন সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি চীনও তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে মিয়ানমারকে কৌশলে সর্বক্ষণ ছায়া দিয়ে চলেছে। ভূরাজনৈতিক স্বার্থের ভারতও মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছে। ভারতের স্বাধীনতাকামীদের আন্দোলন দমন, করিডোর সুবিধা, ট্রান্সশিপমেন্ট প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করা হলেও মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনরত তিনটি রাজ্য মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের বিদ্রোহ দমন করতে মিয়ানমারের সহযোগিতা বিশেষভাবে প্রয়োজন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে সমর্থন না করে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ালে এ তিনটি রাজ্যের আন্দোলন দমন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

 

 

ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের স্বাধীনতা আন্দোলনরত সাতটি রাজ্য ‘সেভেন সিস্টার্স’-এ পণ্য পরিবহন, সামরিক সরঞ্জামাদি প্রেরণ ও সড়ক যোগাযোগের একমাত্র স্থলপথ ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডোর। মাত্র ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই করিডোরটি কৌশলগত কারণে ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চীন-ভারত যুদ্ধ হলেই এই করিডরটি দখল করে নিতে চীন চেষ্টা করবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পণ্য পরিবহন ট্রানজিটও যদি ব্যবহার করতে না পারে তবে ভারতের পক্ষে সেভেন সিস্টার্সের নিয়ন্ত্রণ হারানো অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই বিকল্প হিসেবে ভারত মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে কালাদান নদী ব্যবহার করে রাখাইনের রাজধানী সিতওয়ে থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের মিজোরামের মধ্য দিয়ে লম্বা একটি ‘মাল্টিমোড আল’ বা বহুমাত্রিক যোগাযোগ স্থাপনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে যা কালাদান মাল্টিমোডা ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট নামে পরিচিত। ভারতের সার্বভৌমত্ব হুমকি মোকাবিলায় হাতে নেওয়া এই প্রকল্পে ভারত এরই মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। এই প্রকল্পে কলকাতার হালদিয়া বন্দরের বিভিন্ন পণ্য সরাসরি সিতওয়ে বন্দরের মাধ্যমে ভারতের সেভেন সিস্টার্সে পৌঁছানো সম্ভব। অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হতে সিতওয়ের কাছে স্পেশাল ইকোনমিক জোন গঠনের প্রকল্প নিয়েও ভারত এগিয়ে গেছে।

 

 

 
রোহিঙ্গা অধ্যুষিত ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন উত্তর রাখাইন যেহেতু ভারতের নিকট খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে যে কোনো বিশৃঙ্খলা ভারতের জন্য সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। সুতরাং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় কৌশলগত কারণেই ভারত মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলগত কারণে মিয়ানমারে চীনের আধিপত্য কমাতে ভারত তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ‘অ্যাক্ট ইস্ট প্রকল্প’-এর আওতায় ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড যোগোযোগ স্থাপনের কাজও এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। তাছাড়া ভারত কিছু সমরাস্ত্র তৈরি করেছে। অস্ত্র বিক্রির বাজারের খোঁজে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী, সেনা-নৌবাহিনীর প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার সফর করেছেন। এই দুটি দেশ বেশ কয়েকটি সামরিক সহযোগিতা চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিচার্স ইনস্টিটিউট’-এর এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারত ২০০৫ সালে মিয়ানমারের নিকট প্রথমবারের মতো অস্ত্র বিক্রি করেছিল।

 

 

তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার মুখে মিয়ানমারের নিকট ভারতের অস্ত্র বিক্রির খবর জানাজানি হলে কয়েকটি দেশ ও সংগঠনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক হুমকির মুখে পতিত হয়েছিল। ভারত শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে নেয় যে, অস্ত্র বিক্রি নয় বরং ভারত-মিয়ানমার অভিন্ন সীমান্তে তারা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিরক্ষাবিষয়ক চুক্তিতে আবদ্ধ আছে। রাখাইনে চীন-ভারত ছাড়াও জাপান মিয়ানমারের ৫ম বৃহৎ লগ্নিকারী দেশ। মিয়ানমারে চীনের যে ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব রয়েছে, জাপানও অং সান সু চির সময়ে বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে প্রচুর অর্থ লগ্নি করেছে।

 

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে ভøাদিমির পুতিন রাশিয়ার শাসনভার গ্রহণের পর দেশকে সোভিয়েত যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই রাশিয়া মিয়ানমারমুখী হয়েছে। মিয়ানমারের উচ্চশিক্ষার বাজার ধরতে এবং কৌশলে প্রভাব বিস্তার করার নীতি হিসেবে মিয়ানমারের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে রাশিয়া বিশেষভাবে অবদান রাখছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৪ হাজার ৭০৫ জন শিক্ষার্থী রাশিয়ায় উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করেছেন; যাদের ৭০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছেন কেবল পারমাণবিক বিদ্যায়। তাছাড়া রাশিয়ার সরকার মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। ২০১৫ সালে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক অবরোধ উঠে গেলে রাশিয়া দেশটিতে বিনিয়োগ ও অস্ত্র বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করে। ওই বছরই ৩০ বছর যাবৎ মিয়ানমারের অস্ত্র বাজারে চীনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রাশিয়া ভাগ বসায়। সামরিক বাহিনীর আধুনিকীকরণ, নব প্রযুক্তি ও প্রজন্মের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধকরণ এবং বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্বাধীনতাকামী আন্দোলন দমাতে বিমানবাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া ইত্যাদি বহুবিধ কারণেই মিয়ানমার রাশিয়ার অস্ত্রের প্রতি মনোযোগ দেয়। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর গবেষণা প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, ১৯৮৮ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কেবল রাশিয়ার নিকট থেকে মিয়ানমার কমপক্ষে ৩৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে। অর্থের হিসেবে রাশিয়া মিয়ানমারের দ্বিতীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। এ অবস্থানটি একচেটিয়া করতেই রাশিয়া মরিয়া হয়ে উঠেছে।

 

 

রাশিয়া শুধু মিয়ানমারের অস্ত্রের বাজারের দিকেই নজর দিয়েছে এমন নয়, বরং বিনিয়োগে অর্থ সহায়তা এবং প্রযুক্তি রপ্তানির দিকেও বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। এ লক্ষ্যে রাশিয়া মিয়ানমারের দুটি পারমাণবিক বিদ্যৎকেন্দ্র তৈরির চুক্তি করে ২০১৩ সালে, যার কাজ এরই মধ্যে চলছে। এছাড়া দেশটির বিপুল খনিজ সম্পদ বিশেষ করে তেল ও গ্যাস আহরণে রাশিয়া এরই মধ্যে মিয়ানমারে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। মিয়ানমারের তেল-গ্যাসের ভাণ্ডারের মুনাফায় নিজের আধিপত্য রাখতে রাশিয়ার সরকারি কোম্পানি ‘গাজপ্রম’ রাজধানী ইয়াঙ্গুনে একটি অফিসও খুলেছে। তাই রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করার প্রতিযোগিতায় রাশিয়া কিছুতেই পিছিয়ে পড়তে চাইবেনা।

 

 

মিয়ানমারে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ যুক্ত রয়েছে। রাখাইনে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মিত হয়েছে; যার ৮০ শতাংশ মালিকানা চীনের। এ বন্দর থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত দুটি পাইপলাইন (একটি দিয়ে পেট্রোলিয়াম এবং অন্যটি দিয়ে গ্যাস) নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বর্তমানে চীনের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান প্রণালি মালাক্কা কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে সেটিকে বাইপাস করে রাখাইনের এই গভীর সমুদ্র বন্দর দিয়ে চীন নিয়ে আসতে পারবে। এই সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে চীন বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি দ্বার তৈরি করেছে।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়