রোহিঙ্গা গণহত্যা এবং জেনোসাইড কমিশন
ড. মাহফুজ পারভেজ [সূত্র : যুগান্তর, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

২৫ আগস্ট পালিত হয় রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস। কক্সবাজারে সরকারি আয়োজন ছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ অষ্টম রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস উপলক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনটি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ওয়েলস-এর সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘রোহিঙ্গা সংকট : চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’। সম্মেলনে তিনটি গভীরতর একাডেমিক অধিবেশন এবং একটি বিশেষ রাউন্ড টেবিল আলোচনায় দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা গবেষকরা অংশগ্রহণ করেন।
বর্তমানে কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ এলাকার আশ্রয় শিবিরে ১০ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বসবাস করছেন, যারা মিয়ানমারে জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। ক্যাম্পের ভেতর-বাইরে মিলিয়ে বাংলাদেশে কমপক্ষে ১৫ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে রোহিঙ্গা সমস্যা একটি বড় মানবিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্যে হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে একটি জেনোসাইড বা গণহত্যা কমিশনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। গবেষকরা মনে করছেন, আরাকান রাজ্যে যা ঘটছে, তা স্পষ্টত গণহত্যা। আগে সে দেশের সরকার ও সেনাবাহিনী এবং বর্তমানে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি গোষ্ঠী রোহিঙ্গা নিধনে এক ও অভিন্ন পন্থা অনুসরণ করছে। যে কারণে দফায় দফায় নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছেন।
সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ঢেউ বাংলাদেশে প্রবেশ করে ২০১৭ সালে; আরাকানের অমানবিক ও আগ্রাসী পরিস্থিতির কারণে সাম্প্রতিক অতীতে কমবেশি রোহিঙ্গা প্রতিদিনই বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছেন, যাদের সঠিক হিসাব রাখারও প্রায় অসম্ভব বিষয়। বর্তমানে আশ্রয় শিবির ছাড়া ভাসানচরেও বস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা বসবাস করছেন। অনেকেই দেশের নানা স্থানে, বিশেষত, দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জনপদ ও লোকালয়ের মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে একাধিক্রমে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জোরপূর্বক বস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং হচ্ছেন; সে দেশে জন্ম নিয়েও নাগরিক অধিকারহীনতা এবং জাতিগত নিধনের কারণে। জাতিসত্তাগত ও ধর্মীয় (মুসলিম) সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের সে দেশের প্রতিটি সরকারই নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও গৃহচ্যুতির শিকার হয়েছেন। সরকারি সেনাবাহিনী আরাকান আর্মির কাছে পরাজিত হয়ে রাজধানীর দিকে সরে গেলে দখলদার বিদ্রোহী আরাকান আর্মি নামক গোষ্ঠীটিও একই কায়দায় রোহিঙ্গা নিধন অব্যাহত রাখে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এ ঘটনাগুলোকে সম্ভাব্য গণহত্যা, জাতিগত নির্মূল বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। ফলে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার পেয়ে স্বদেশে নিজের ভূমিতে ফিরে যাওয়ার পাশাপাশি গণহত্যার বিচার পাওয়ারও অধিকার রয়েছে। তাই রোহিঙ্গা সমস্যার প্রেক্ষাপটে গণহত্যা কমিশনের গুরুত্ব অপরিসীম।
রোহিঙ্গা গণহত্যা কমিশন গঠিত হলে সেখানকার নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ইত্যাদি সম্পর্কে প্রকৃত সত্য বিশ্ববাসীর সামনে উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে। কারণ, একটি গণহত্যা কমিশন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের তথ্য, প্রমাণ ও সাক্ষ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ ও যাচাই করতে পারে। এটি একটি আইনগত ও নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে পারে, যার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায়, সেখানে প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় কীরূপ গণহত্যা ঘটেছে এবং এর ভিত্তিতে কীরূপ শাস্তির বিধান করা নিশ্চিত করা উচিত। সত্য প্রকাশের মাধ্যমে এটি অস্বীকার বা বিকৃতি প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
গণহত্যা কমিশন গঠিত হলে অপরাধীদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ করাও সম্ভব হবে এবং গণহত্যায় জড়িত কোনো অপরাধীই দায়মুক্তির সুযোগ নিয়ে অপকর্ম আড়াল করতে পারবে না। অপরাধীদের পদ-পরিচয় যাই হোক, তাদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার পথ সহজ করতে পারবে রোহিঙ্গা গণহত্যা কমিশন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)-এর বিচারিক কার্যক্রমকে সহায়তা করতে পারবে।
সবচেয়ে বড় কথা, গণহত্যা কমিশন ভুক্তভোগীদের স্বীকৃতি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে তাদের নাগরিকতার দাবিটিকেও জোরালো করবে। কমিশনের মাধ্যমে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের গণহত্যার শিকার জনগোষ্ঠী নামে স্বীকৃতি দিলে তাদের সম্মান-পরিচয় ও নাগরিক-অধিকারের দাবিগুলো আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্বীকৃতির পথ প্রশস্ত করবে। এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী-ক্ষতিপূরণ, নাগরিকত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জন্মভূমিতে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের অধিকার, পুনরায় সহিংসতার বিরুদ্ধে সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয় দাবি করতে পারবেন।
দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোহিঙ্গা সমস্যার ন্যায়সংগত সমাধানে গণহত্যা কমিশন গঠন করা খুবই জরুরি। এতে গণহত্যা কমিশন অনেক নীতিগত সুপারিশ দিয়ে সমস্যার সমাধানে সহায়তা দিতে পারবে; যার মধ্যে মিয়ানমারে আইনি সংস্কার, রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদান, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন, স্থায়ী শান্তি ও সহাবস্থানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি করাও সম্ভব।
রোহিঙ্গারা যে বছরের পর বছর মিয়ানমারের অমানবিক ও নিবর্তনমূলক রাষ্ট্রীয় নীতি ও কার্যক্রমের দ্বারা গণহত্যার শিকার হয়ে নাগরিকতা ও বাস্তুহীন হচ্ছে, এরূপ স্মৃতি সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে গণহত্যা কমিশন বিরাট ভূমিকা রাখতে পারবে। তাদের অস্তিত্বের আর্তনাদ, পুনর্মিলনের আর্তি ও প্রতিরোধের স্পৃহা জাগ্রত, লিপিবদ্ধ ও আইনগতভাবে কাঠামোবদ্ধ করার ক্ষেত্রে কমিশন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারবে রোহিঙ্গা গণহত্যার নির্মম চিত্র উন্মোচনের মাধ্যমে।
নিশ্চয় একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাবই যথেষ্ট নয়। উল্লেখ্য, বর্তমানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যা ও নিপীড়নের ক্ষেত্রে বেশকিছু প্রক্রিয়া চলমান আছে। যেমন-১. জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন (২০১৯) রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিপ্রায় চিহ্নিত করেছে; ২. গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলাটি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চলমান; ৩. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইতোমধ্যে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও নিপীড়ন নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। তবে নানাদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলোর কোনোটিই রোহিঙ্গা গণহত্যাবিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বতন্ত্র কমিশনের সমতুল্য নয়। বরং একটি কমিশন গঠিত হলে রোহিঙ্গাবিষয়ক চলমান অপরাপর আন্তর্জাতিক, মানবিক ও আইনগত প্রচেষ্টাগুলো বহুলাংশে শক্তি ও সহযোগিতা পেতে পারবে।
বস্তুত এটি একটি নৈতিক ও মানবিক দায়বদ্ধতাও। এটি সত্য প্রকাশ করবে, বিচারের পথ প্রশস্ত করবে, ভুক্তভোগীদের সম্মান ও স্বীকৃতি দেবে, ন্যায়ভিত্তিক সহাবস্থানের ভিত গড়ে তোলবে, স্মৃতি ও তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করবে এবং পরবর্তী গণহত্যার বিষয়ে আইনি লড়াই ও অধিকার পাওয়ার পথ দেখাবে। এটি গঠিত না হলে গণহত্যা ভুলে যাওয়া, অস্বীকার ও পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যায় এবং বিনা বাধায় একতরফা নিধন ও গণহত্যা অব্যাহত থাকার বিপদ বাড়তেই থাকে, যা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্ভাগ্যের কালোমেঘকে আরও প্রলম্বিত করবে।
বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে থাকতে থাকতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ত্রাণনির্ভরতা যেমন বাড়ছে, তেমনিভাবে নানামুখী অপরাধপ্রবণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের খবর প্রায়ই পত্রপত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। স্থানীয় সম্পদ ও বনাঞ্চলের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের কারণে বাড়তি জনচাপ বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, যা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও খুবই ক্ষতিকর। এসব নতুন সমস্যার পাশাপাশি সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো ত্রাণনির্ভরতার জন্য রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক চেতনা হ্রাস পাওয়ার ঘটনা। এতে নাগরিক অধিকার ফিরে পেয়ে স্বদেশের জন্মভূমিতে প্রত্যাবাসনের দাবি থেকে রোহিঙ্গারা ত্রাণভোগী গোষ্ঠীতে পরিণত হতে পারে, ফলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বোঝা হয়ে থাকতে পারে।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। তা না হলে একটি বিপুল জনগোষ্ঠী ক্রমে আত্মপরিচয়, নাগরিকত্ব হারিয়ে উন্মূল হয়ে যেতে পারে। আমি গবেষণা পরিচালনাকালে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলেছি। এতে ত্রাণনির্ভরতা থেকে বের হওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ তাদের অধিকার, মর্যাদা ও দাবির প্রতি অধিকতর মনোযোগী হওয়ার আবশ্যকতা স্বীকার করেছে। আমি কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতার মুখে ‘আমরা ত্রাণ চাই না, জমি চাই’ স্লোগান শুনেছি।
এ স্লোগানটি উঠে এসেছে গত ১৫ মে আমার উপস্থিতিতে কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে পরিচালিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি ফোকাস গ্রুপ আলোচনার (এফজিডি) সময়। আলোচনায় অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীরা মানবিক সহায়তার ওপর দীর্ঘকালীন নির্ভরশীলতা নিয়ে এক ধরনের হতাশা ও ক্লান্তি প্রকাশ করেন। তারা জানান, শুধু ত্রাণ নয়, তাদের চাওয়া নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়া এবং জন্মভূমি অর্থাৎ মিয়ানমারের আরাকানে (বর্তমান রাখাইন রাজ্য) নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে সসম্মানে ফিরে যাওয়ার অধিকার।
এই প্রেক্ষাপটে উল্লিখিত স্লোগানটি শুধু বসতির দাবি নয়, এটি রাজনৈতিক স্বীকৃতি, পরিচয়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সম্মানজনক ভবিষ্যতের এক সংগ্রামী আকাঙ্ক্ষা; এটি রোহিঙ্গা জনগণের মধ্য থেকে উঠে আসা একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ, যা মানবিক প্রয়োজনের গণ্ডি পেরিয়ে ন্যায়সংগত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি জানায়। এ অবস্থায় গণহত্যা কমিশন রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক ও আইনগত অধিকার প্রাপ্তির লড়াইকে বেগবান করতে পারে।
প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়