রাষ্ট্র হোক মানবিক ও গণতান্ত্রিক
শেখ রফিক [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ০৮ জানুয়ারি ২০২৬]

মানুষ আসলে খুব বেশি কিছু চায় না। মানুষ শুধু নিজের কথা বলতে চায়। ভোটের কথা, ন্যায়ের কথা, ভাতের কথা আর সন্তানের ভবিষ্যতের কথা। কথা বলার অধিকার মানে ভয় ছাড়াই সত্য বলা। অন্যায় দেখলে, প্রশ্ন তোলা এবং যৌক্তিক ভিন্ন মত প্রকাশ করা এবং ক্ষমতার কাছে জবাব চাওয়া। মানুষ কথা বলার অধিকার চায়, কারণ কথা বলাই মানুষের বেঁচে থাকার প্রথম পরিচয়। অর্থাৎ কথা বলার অধিকার বা মতপ্রকাশ ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারি না। যা করতে চাই, যা ভাবি, যা বলি সবকিছুর মাধ্যম ভাষা। এই ভাষা প্রকাশ করেই আমরা কাজ করি, চিনতে পারি, বুঝতে পারি, অনুভব করি। এটি আমাদের অস্তিত্বের মূল উপাদান। তাই মতপ্রকাশই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।
এই অধিকার খর্ব হলে সমাজের সৃষ্টিশীলতা, অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধি ব্যাহত হয়। যেখানে কথা বলার স্বাধীনতা নেই, সেখানে মানুষ নীরব দর্শক হয়ে যায়। তার ভাবনা, প্রতিবাদ, স্বপ্ন আর আশা ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যায়। এই অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে রাষ্ট্র ও সমাজের দার্শনিক ভিত্তির মূল্যবোধ অর্থহীন হয়ে পড়ে। মানুষ কথা বলতে চায়, রাষ্ট্র কেমন হবে তা নিয়ে। তারা চায় এমন রাষ্ট্র, যেখানে সংবিধান জনজীবনের কাজে লাগে। তারা দেখতে চায় যেখানে ক্ষমতার সীমা, জবাবদিহি আছে। যেখানে ধর্ম বিশ^াসে থাকবে, কিন্তু তা রাজনীতির হাতিয়ার হবে না। মানুষ চায় জীবনমানের উন্নয়ন। করের টাকা যেন দুর্নীতি লুটপাটে না গিয়ে হাসপাতাল, স্কুল আর মানুষের কল্যাণে যায়। গ্রাম আর শহরের ফারাক কমুক, নদী, বন, প্রকৃতি বাঁচুক, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হোক। শ্রমিক তার ঘামের ন্যায্য দাম চায়, কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য চায়, নারী চায় নিরাপত্তা ও সম্মান, তরুণ চায় অনিশ্চয়তার ভেতরে ভরসার ভবিষ্যৎ।
মানুষ চায় আইন যেন দুর্বলকে রক্ষা করে। দমন নয় রাষ্ট্র যেন শাসক না হয়ে, সেবক হয়। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার আর মানবিক রাষ্ট্র গড়তে হলে মানুষের কণ্ঠই সবচেয়ে বড় শক্তি। ফলে কথা বলার অধিকার মানুষের মর্যাদা, নাগরিক পরিচয় আর আগামী দিনের নিরাপত্তার প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ চুপ থাকতে চায় না। ভয়, হুমকি আর নিপীড়নের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ সম্মিলিত কণ্ঠে কথা বলতে চায়। হুকুমের ভাষা নয়, সংলাপের ভাষা চায়। দমন নয়, অংশগ্রহণের রাজনীতি চায়। মানুষ দেশ ছাড়তে চায় না, দেশেই মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায়। এসব কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানুষের একটাই স্বপ্ন ন্যায্য, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র। যেখানে মানুষ নিশ্চিন্তে, সাহসের সঙ্গে মানুষ হয়ে যেন কথা বলতে পারে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই, গণতন্ত্রের প্রকৃত স্বরূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জনগণ যখন ভয় ছাড়া নিজস্ব মত প্রকাশ করতে পারে, প্রশ্ন তুলতে পারে এবং শাসকদের জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে তখনই বোঝা যায়, রাষ্ট্রটি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক। মূলত গণতন্ত্র বেঁচে থাকে, মানুষের কণ্ঠে ও সচেতন অংশগ্রহণে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আসল শক্তি হলো, রাজনৈতিক মতের বৈচিত্র্য। কেউ বিএনপির কথা বলবেন, কেউ কমিউনিস্ট রাজনীতিতে বিশ্বাস করবেন, কেউ ইসলামী বা সুফিবাদী ধারায় রাজনীতি করবেন, কেউ জাতীয় পার্টি বা গণসংহতি বা অন্য দলের পক্ষে দাঁড়াবেন। এটাই স্বাভাবিক, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু কোনো বিশেষ দলের কথা বললেই যদি গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হয়, মব তৈরি করা নিপীড়ন করা হয়, তাহলে সমাজে ধীরে ধীরে ভীতির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। তখন মানুষ চুপ করতে শেখে, মত প্রকাশ থেকে সরে আসে। এর ফলে বহুমত আর মতবিনিময়ের জায়গা সংকুচিত হয়, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। তখন সেই রাষ্ট্র আর গণতান্ত্রিক থাকে না সেই রাষ্ট্র পথে পথে হাঁটে।
গণতন্ত্রের প্রাণ হলো স্বাধীন মতপ্রকাশ। জনগণ যখন ভয় ছাড়া নিজের চিন্তা, মতামত বা সমালোচনা প্রকাশ করতে পারে, তখনই রাষ্ট্র ও সরকার সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। গত ৫৪ বছর ধরে রাষ্ট্র ভিন্নমত দমন করেছে, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করেছে, জনগণের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করেছে। ফলে গণতন্ত্রের শেকড় ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়েছে। রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি হারিয়ে গেছে। সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে এবং দেশকে প্রতিনিয়ত অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলার প্রাণবন্ত সংস্কৃতি হলো, পহেলা বৈশাখ, বসন্ত উৎসব, নাট্যোৎসব, ঘুড়ি উৎসব, নবান্ন উৎসব, চারুকলা এ সবই মানুষকে আনন্দ দেয়। কিন্তু সংকীর্ণ মানসিকতার কাছে এ আনন্দ অপরাধ। দেশের জন্ম ইতিহাসকে অনেকে বিকৃতভাবে দেখায়। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমূল্যায়ন করে। যারা ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মতপ্রকাশকে স্বীকার করে না তারা রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির উন্নতি চায় না। বিভিন্ন দার্শনিকের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু ব্যক্তিগত অধিকার নয়, সমগ্র সমাজের নৈতিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য।
জন লক, রুশো ও মিলের মতো লিবারেল দার্শনিকরা দেখান মতপ্রকাশের দমন মানবাধিকারের মৌলিক লঙ্ঘন। কান্টের নৈতিক দর্শন অনুযায়ী, এটি মানুষের মর্যাদা ও মানবতার প্রতি অন্যায়। কথা বলার অধিকার নিঃসন্দেহে ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে পড়ে। ব্যক্তিস্বাধীনতা মানে শুধু চলাফেরা বা পছন্দের স্বাধীনতা নয়, ব্যক্তিস্বাধীনতা মানে নিজের মতো করে ভাবতে পারা, বিশ্বাস করতে পারা এবং সেই ভাবনা ভয় ছাড়া প্রকাশ করতে পারা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ। মানুষ যা ভাবে, যা বিশ্বাস করে তা ভাষা, লেখা, শিল্প বা যে কোনো সৃজনশীল মাধ্যমে প্রকাশ করার অধিকারই তাকে মানুষ হিসেবে পূর্ণতা দেয়। ব্যক্তিস্বাধীনতার কেন্দ্রবিন্দু হলো, কথা বলার অধিকার। কথা বলার অধিকার সুরক্ষিত করা মানেই, ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করা। আর ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করা মানেই, একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা।
বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদবলে বাক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। সংবিধানের ৩৬, ৩৭ ও ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদে যথাক্রমে চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা ও সংগঠনের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য। তবে তা অন্যের অধিকার, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা এবং অপরাধ প্ররোচনার মতো শর্ত ক্ষুণœ না করেই নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে মানুষ নিজের মতপ্রকাশ করতে ভয় পায়, সেখানে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন থেমে যায়।
তরুণরা প্রশ্ন তুলতে বা নতুন ধারণা প্রকাশ করতেও আগ্রহ হারায়। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা মিডিয়া সব জায়গায় এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়। সমাজ ভয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়, যেখানে সত্য প্রকাশের বদলে তোষণ আর ভণ্ডামি টিকে থাকে। সবাই জানে সমস্যার কথা, কিন্তু কেউ মুখ খোলে না। এতে সমস্যাগুলো আরও গভীর হয় এবং রাষ্ট্রের সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের চূড়ান্ত মালিক হলো জনগণ। প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই সফল হয় যখন জনগণ শুধু ভোটার নয়, রাষ্ট্রের চলমান প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার হয়। রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস হলো জনগণ। রাষ্ট্রের সব সিদ্ধান্ত ও শাসনের শেষ মালিকও জনগণ। জনগণের হাতে থাকা এই সর্বোচ্চ ক্ষমতাকেই বলা হয় সার্বভৌম ক্ষমতা।
আমরা বর্তমানে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে রয়েছি, যেখানে জনগণ প্রতিনিধি নির্বাচন করে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেয়। এই স্বাধীন দেশে একজন বাবা বা মা তার সন্তানকে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মস্থলে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন সন্তান ঘরে না ফেরা পর্যন্ত। এই দুশ্চিন্তার মূল কারণ হলো রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং সমাজের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস। তারেক রহমানের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাই সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন একজন মা দেখেন।
অর্থাৎ, একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই। যে বাংলাদেশে একজন নারী, একজন পুরুষ, একজন শিশু যেই হোক না কেন, নিরাপদে ঘর থেকে বের হলে নিরাপদে ইনশাআল্লাহ ঘরে আবার ফিরে আসতে পারে।’ সব ধরনের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই সমৃদ্ধ ও দায়িত্বশীল অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের ভিত্তি। তারেক রহমান ‘সবার বাংলাদেশ’ ধারণার মাধ্যমে তার অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক দর্শন ব্যক্ত করেছেন, যার মূল উদ্দেশ্য হলো কাউকে বাদ না দিয়ে সবাইকে রাষ্ট্রীয় অধিকার, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও উন্নয়নের সমান অংশীদার করা।
বিএনপি তাদের ৩১ দফা রূপরেখা এবং ভিশন-২০৩০ এ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ ও নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিকব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক রূপান্তরের বার্তা বহন করে। সময়ই বলে দেবে, এই রূপান্তরের বার্তা কতটা কার্যকর হবে। একজন নাগরিক হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কথা বলার অধিকার বা মতপ্রকাশ করার অধিকার সব মানুষের সমান। নাগরিক এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো অনধিকার, অবৈধ, অসহিষ্ণু প্রচেষ্টা মোকাবিলা করা এবং নিশ্চিত করা যে প্রতিটি মানুষ নিরাপদে, ভয়হীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবে। প্রকৃত অর্থে, যৌক্তিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকারী মানবতার শত্রু। আমরা একটি সুন্দর ভবিষ্যতের অপেক্ষায়।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক