রাজায় রাজায় লড়াই হয়
[সূত্র : দেশ রূপান্তর, ১৩ আগস্ট ২০২৫]

ইতিহাসের প্রতিটি যুদ্ধ শুধু মানচিত্র নয়, রাজনীতি, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনকে পাল্টে দিয়েছে। যুদ্ধ কখনোই কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে শেষ হয় না। এর ক্ষত রয়ে যায় মানুষের মনে, অর্থনীতির ভেতরে, আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাজনীতির ভেতরে। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
কোরিয়ান যুদ্ধ
যুদ্ধের প্রথম বছরেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে ওঠানামা করে। এক সময় উত্তর কোরিয়ার সেনারা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় পুরো এলাকা দখল করে নেয়, কিন্তু মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের নেতৃত্বে ‘ইঞ্চন ল্যান্ডিং’ নামে পরিচিত এক চমকপ্রদ সামরিক অভিযান দক্ষিণের পক্ষের পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। তবে চীনের সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ আবারও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। ১৯৫৩ সালে প্যানমুনজমে স্বাক্ষরিত অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু কোনো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। ফলে আজও উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া কাগজে-কলমে যুদ্ধাবস্থায় আছে। প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রাণহানি ও অগণিত মানুষের বাস্তুচ্যুতি এই সংঘর্ষের করুণ উত্তরাধিকার হয়ে আছে। কোরিয়ান যুদ্ধ ঠান্ডা যুদ্ধের প্রথম বড় মঞ্চ তৈরি করে দেয়, যেখানে দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি না হলেও প্রক্সি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। ৩৮তম সমান্তরাল রেখা আজও সেই বিভক্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ
ভিয়েতনামের ইতিহাসে ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সাল ছিল অবিরাম সংঘাত ও রক্তক্ষরণের সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভিয়েতনাম ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হলেও দেশটি উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত হয় উত্তরে হো চি মিন-এর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট শাসন, দক্ষিণে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকার। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে সামরিক পরামর্শক ও অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সমর্থন দিলেও ষাটের দশকের মাঝামাঝি সরাসরি সেনা পাঠানো শুরু করে। ১৯৬৮ সালের টেট আক্রমণ ছিল যুদ্ধের এক মোড়-ফেরানো মুহূর্ত উত্তর ভিয়েতনাম ও ভিয়েতকং গেরিলারা একই সঙ্গে শতাধিক স্থানে হামলা চালায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের ‘সহজ জয়’ ধারণাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দেয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে যায় ‘প্রথম টেলিভিশন যুদ্ধ’ হিসেবে। যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য জ্বলন্ত গ্রাম, নাপাম বোমায় দগ্ধ শিশু, রাসায়নিক এজেন্ট অরেঞ্জ-এর কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত বন সরাসরি মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়। আমেরিকার লিভিং রুমে বসা সাধারণ নাগরিকরা প্রথমবার যুদ্ধের নগ্ন, নির্মম চেহারা চোখের সামনে দেখতে পায়। এই দৃশ্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের জন্ম দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ, সংগীতে যুদ্ধবিরোধী বার্তা, নাগরিক সমাজের মিছিল সব মিলিয়ে রাজনৈতিক চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে নীতিনির্ধারকদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়, এবং ১৯৭৫ সালে উত্তর ভিয়েতনাম সাইগন দখল করে দেশকে একীভূত করে। যুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র গভীর আত্মসমালোচনার মুখে পড়ে, আর বিশ্ব শিখে নেয় মিডিয়া ও জনমত আধুনিক রাজনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি।
ফকল্যান্ড যুদ্ধ
১৯৮২ সালে দক্ষিণ আটলান্টিকের একটি ছোট দ্বীপপুঞ্জ ফকল্যান্ড নিয়ে শুরু হয় আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ। ভূখণ্ডটি আকারে ছোট হলেও, এর প্রভাব ছিল বড়।
একদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এই যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বাড়ান। অন্যদিকে এই যুদ্ধ প্রমাণ করে, ছোট আকারের সংঘাতেও আধুনিক প্রযুক্তি মিসাইল, সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান কীভাবে সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।
এটি ছিল এমন এক সময় যখন ঠান্ডা যুদ্ধ চলছিল, এবং প্রতিটি সামরিক প্রযুক্তি পরীক্ষা হচ্ছিল মাঠে। ছোট হলেও ফকল্যান্ড যুদ্ধ দেখিয়ে দেয়, জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক কৌশল একসঙ্গে মিলে যুদ্ধে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরাক যুদ্ধ
২০০৩ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক জোট ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে। আনুষ্ঠানিক কারণ ছিল সাদ্দাম হোসেনের হাতে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ (Weapons of Mass Destruction) রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। কিন্তু পরবর্তী তদন্তে প্রমাণিত হয়, সেই অস্ত্র আদৌ ছিল না। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে গুরুতর ত্রুটি ছিল, এবং অনেকের মতে, এই ত্রুটি হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল।
সামরিক অভিযান মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাদ্দাম হোসেনের সরকার পতন ঘটায়। তবে যুদ্ধ এখানেই শেষ হয়নি। দীর্ঘ দখলদারিত্ব, প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়া, এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত ইরাককে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেয়। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে উত্থান ঘটে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর মতো চরমপন্থি গোষ্ঠীর, যারা ইরাকের পাশাপাশি সিরিয়াতেও ভয়াবহ সন্ত্রাস ও রক্তপাত ঘটায়।
ইরাক যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রই বদলে দেয়নি, বরং তেলের বাজারেও বড় ধাক্কা দেয়। যুদ্ধ চলাকালে ও পরবর্তী অস্থিরতায় তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; মিত্র দেশগুলোর মধ্যে আস্থা নড়ে যায়, আর বিশ্বজুড়ে ‘ন্যায়সংগত যুদ্ধ’ ধারণা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। এই সংঘর্ষ প্রমাণ করে, যুদ্ধের পেছনে অনেক সময় কূটনৈতিক আদর্শের চেয়ে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থই বেশি প্রভাব ফেলে।
আফগানিস্তান যুদ্ধ
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর আল-কায়েদা ও তাদের আশ্রয়দাতা তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আফগানিস্তানে বিমান হামলা ও স্থল অভিযানের মাধ্যমে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। কিন্তু যুদ্ধ এখানেই শেষ হয়নি। তালেবান গ্রামীণ এলাকা ও পাহাড়ি অঞ্চলে পুনর্গঠিত হয়ে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে, আর আফগানিস্তান ধীরে ধীরে বিশ্বের দীর্ঘতম সংঘাতের মঞ্চে পরিণত হয়।
দুই দশক ধরে এই যুদ্ধে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, হাজারো সৈন্য ও অসংখ্য আফগান বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। অবকাঠামো ধ্বংস হয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, এবং সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
২০২১ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নিলে তালেবান দ্রুত রাজধানী কাবুল দখল করে নেয়। এই যুদ্ধ প্রমাণ করে যে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব নয়। বরং এটি রেখে গেছে প্রশ্ন দুই দশকের রক্তপাত ও ব্যয়ের বিনিময়ে কী অর্জিত হলো? আফগানিস্তান আজও অস্থিতিশীল, আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নতুন করে ভাবছে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির প্রকৃত পথ কী হতে পারে।
প্যালেস্টাইন-ইসরায়েল
প্যালেস্টাইন-ইসরায়েল সংঘাত বহু দশক ধরে চলছে, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর সহিংসতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে হামাসের আকস্মিক হামলা এবং তার পর ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক প্রতিক্রিয়া আবারও গাজাকে ভয়াবহ মানবিক সংকটে ফেলেছে। হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে, লক্ষাধিক বাস্তুচ্যুত হয়েছে, এবং গাজার অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে।
এই সংঘাত শুধু প্যালেস্টাইন ও ইসরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও মানবাধিকারের প্রশ্নে বিশ্বকে বিভক্ত করেছে। একদিকে ইসরায়েল তার নিরাপত্তার যুক্তি দেখাচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই অবরোধ, বেসামরিক প্রাণহানি ও মানবিক সংকট নিয়ে তীব্র সমালোচনা করছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এর প্রভাব উপেক্ষা করা যায় না মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা বিশ্ববাজারে তেলের দামের অনিশ্চয়তা বাড়ায়, বাণিজ্যপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত প্রমাণ করছে, মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি এখনো অনেক দূরের লক্ষ্য, এবং এর সমাধান কেবল সামরিক উপায়ে সম্ভব নয়; বরং ন্যায়সংগত রাজনৈতিক সমাধান ও পারস্পরিক স্বীকৃতির ভিত্তিতেই টেকসই শান্তি আসতে পারে।
যুদ্ধের সাধারণ সূত্র
ইতিহাসে যত যুদ্ধই আমরা দেখি না কেন, কিছু সাধারণ সূত্র সব ক্ষেত্রেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, প্রযুক্তি যুদ্ধের চেহারা পাল্টে দেয়। আধুনিক যুদ্ধ আর শুধু সৈন্য-অস্ত্রের কৌশলেই সীমাবদ্ধ নয়; উন্নত মিসাইল, ড্রোন, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং সাইবার হামলা এখন যুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ধারণের অন্যতম বড় উপাদান। কিন্তু প্রযুক্তি যত উন্নত হয়, ধ্বংসযজ্ঞও তত বেশি নিখুঁত ও দ্রুত হয়ে ওঠে যা একদিকে সামরিক দক্ষতা, অন্যদিকে মানবিক বিপর্যয়কে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, জনমত ও গণমাধ্যম আজ যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরের সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী শক্তি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সংঘাত পর্যন্ত দেখা গেছে, সংবাদমাধ্যম যুদ্ধের বাস্তবতা সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে দিলে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়, যা যুদ্ধের গতি থামিয়ে দিতে বা বদলে দিতে সক্ষম। তবে একইসঙ্গে, ভুল তথ্য বা প্রচারণাও গণমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করে এবং জনগণকে বিভক্ত করে দেয়।
তৃতীয়ত, অর্থনীতি ও কূটনীতি প্রায় প্রতিটি সংঘাতের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তেল, প্রাকৃতিক সম্পদ বা বাণিজ্যিক রুট এসব নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে অনেক যুদ্ধ শুরু হয়, আর সেই অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যই প্রায়শই কূটনৈতিক ভাষায় মোড়কবন্দি হয়ে জনসম্মুখে হাজির হয়। ফলে যুদ্ধের কারণ ও উদ্দেশ্য অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়, অথচ তার ধ্বংসাত্মক ফল ভোগ করে সাধারণ মানুষ।