পুতিন-ট্রাম্প বৈঠক ॥ ইউক্রেনের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ
ড. মো. মোরশেদুল আলম [প্রকাশিত : জনকণ্ঠ, ২২ আগস্ট ২০২৫]

ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ করার লক্ষ্যে পুতিনের সঙ্গে আলাস্কায় ট্রাম্প প্রায় ৩ ঘণ্টা বৈঠক করলেও যুদ্ধবিরতি বিষয়ে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা হয়নি। পুতিন বলেন, শান্তি চাইলে প্রথমে সংঘাতের মূল সমস্যা দূর করতে হবে। তাঁর এমন বক্তব্য কিয়েভসহ অন্য জায়গাগুলোর জন্য সতর্কবার্তা বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। পুতিনের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে ছিল ক্রিমিয়া, দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসনকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান, বিদেশি সৈন্যের হস্তক্ষেপ ইউক্রেনে না থাকা এবং দেশটিতে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করা। কিন্তু কিয়েভের নিকট দাবিগুলো অনেকটা আত্মসমর্পণের শামিল। তারা এগুলো মানতে রাজি নয়। তাৎক্ষণিক কোনো সমঝোতা না হলেও আলোচনাকে ফলপ্রসূ বলেছেন দুই রাষ্ট্রপ্রধানই। যুদ্ধবিরতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার জন্য পশ্চিমারা কয়েক মাস ধরে ক্রেমলিনের ওপর চাপ দেওয়ার পরও ট্রাম্প-পুতিন শীর্ষ সম্মেলন কোনো যুদ্ধবিরতি ঘোষণা ছাড়াই শেষ হয়েছে।
এই বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পরই রাশিয়া ভয়াবহ হামলা চালায় ইউক্রেনে। রুশ বাহিনী ইউক্রেনে ৮৫টি ড্রোন হামলা এবং একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। বৈঠকটির পূর্বে ট্রাম্প একাধিক বক্তব্যে বলেছিলেন, রাশিয়া অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে এবং তেলের দামের পতন হওয়ায় দেশটির যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। রাশিয়া কিন্তু বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, শ্রম ঘাটতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়সহ অর্থনৈকিভাবে চাপে রয়েছে। তবে এসব সংকট কিন্তু পুতিনকে তার অবস্থান থেকে পিছু হটাতে পারেনি। ট্রাম্প বলছেন, সরাসরি শান্তিচুক্তিতে যাওয়ার বিষয়ে ইউরোপীয় নেতাদের মত ছিল। তবে ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ এটি তাদের মতামত নয় বলছেন। একটি যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা বলেছেন, ইউরোপের সহায়তায় একটি ত্রিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনে তাঁরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। তবে নিজেদের ভূখন্ডের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণটা ইউক্রেনের ওপরই নির্ভর করবে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত শক্তি প্রয়োগ করে ভৌগোলিক সীমারেখা পরিবর্তন করা যাবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়া কর্তৃক দখলকৃত ইউক্রেনীয় ভূখন্ড রাশিয়াকে প্রদানের প্রস্তাবটি ট্রাম্প সমর্থন করেছেন। আলাস্কায় পুতিনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর ট্রাম্প ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে যে আলোচনা করেছেন তাতে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
পুতিন যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চল দুটি নিয়ে গঠিত দনবাস ইউক্রেনকে ছেড়ে দিতে হবে। এই অঞ্চলটি রাশিয়া ৩ বছর যুদ্ধ করেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। এর বিনিময়ে তিনি যুদ্ধ বন্ধ রাখবেন বলেছেন। পুতিন এ প্রসঙ্গে বলেন, দোনেৎস্ক ও লুহানস্কের বিনিময়ে দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে অগ্রসর হওয়া বন্ধ করবেন এবং লড়াই সম্মুখভাগে বন্ধ রাখবেন। এ ২টি অঞ্চলে রাশিয়ার সেনাবাহিনী উল্লেখযোগ্য এলাকা দখল করে রয়েছেন। লুহানস্ক অনেকটা পুরোপুরি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে দোনেৎস্কের ক্রামাতোর্স্ক ও স্লোভিয়ানস্ক শহরসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইউক্রেন এখনো ধরে রেখেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি এক ধরনের কূটনৈতিক ফাঁদ। যদি জেলেনস্কি এই প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন, তবে পুতিন ট্রাম্পকে চাপ প্রয়োগ করতে বলবেন এবং ইউরোপকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলবেন।
আর আলোচনা ব্যর্থ হলেই জেলেনস্কিকে শান্তির পথে প্রধান বাধা হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। ট্রাম্পও ইউরোপীয় নেতাদের বলেছেন, যদি ইউক্রেন দনবাস অঞ্চলটি ছেড়ে দিতে রাজি হয়, তবে একটি শান্তিচুক্তির বিষয়ে সমঝোতা হতে পারে। আর যুদ্ধবিরতি প্রায়সময় টেকে না বলেও ট্রাম্প মন্তব্য করেন। উল্লেখ্য, দনবাস অঞ্চলটি কয়লা ও লোহার আকরিকসহ খনিজসমৃদ্ধ। জেলেনস্কি চাইলে তাঁর দেশে রাশিয়ার যুদ্ধ থামাতে পারে বলে ট্রাম্প মন্তব্য করেন। তবে এর বিনিময়ে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না। এবং একইসঙ্গে ক্রিমিয়া ফিরে পাওয়ার আশা ইউক্রেনকে ছেড়ে দিতে হবে। উল্লেখ্য, ইউক্রেন থেকে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করেছিল। যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের একটি চুক্তি করা উচিত বলে ট্রাম্প মন্তব্য করেন। রাশিয়াকে খুব বড় একটি শক্তি বলেও তিনি অভিহিত করেন। ট্রাম্প মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসির হুমকি নয়। তাই ইউরোপীয় দেশগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা। ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে জেলেনস্কিকে একটি অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে ফেলেছে। পুতিন ট্রাম্পকে প্রভাবিত করেছেন বলে অনেকেই ধারণা করছেন। জেলেনস্কিকে শান্তির পথে বাধা বলেও ট্রাম্প উল্লেখ করেন। তবে ইউক্রেনের পক্ষে ভূখ- ছেড়ে দেয়া খুবই কঠিন হবে। এ প্রসঙ্গে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে যে কোনো ধরনের চুক্তি করার ক্ষেত্রে ভূখ- ছেড়ে না দেওয়ার বিষয়ে কিয়েভের অবস্থান অনড়। ক্রিমিয়া ইউক্রেনের বলে তিনি দাবি করেন।
ইউক্রেনসহ ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ মনে করেন, যুদ্ধবিরতি বাদ দিয়ে সরাসরি শান্তিচুক্তিতে গেলে রাশিয়া বাড়তি সুবিধা পাবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি টেকসই শান্তি অর্জনসহ বেশ কয়েকটি শর্ত প্রদান করেন। প্রথমে যুদ্ধবিরতি ছাড়া সরাসরি শান্তিচুক্তিতে গেলে বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। যুদ্ধ বন্ধ করার একটি মূল উপাদান হত্যা বন্ধ করা। দনবাস অঞ্চলকে রাশিয়াকে প্রদানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ইউরোপীয় মিত্র ও ইউক্রেনের সঙ্গে কথার বরখেলাপ হয়েছে বলে এমন চুক্তির বিরোধিতা করছেন ইউরোপীয় নেতারা। কোনো কোনো বিশ্লেষক এই সফরকে পুতিনের ব্যক্তিগত জয় বলে মন্তব্য করছেন। এটি একটি অর্থহীন বৈঠক বলছেন ইউক্রেনীয়রা। কারণ তারা মনে করেন, ইউক্রেন সম্পর্কিত সমস্যা ইউক্রেনকে নিয়েই সমাধান করা উচিত বলে তারা মনে করেন। গত ৮০ বছরের মধ্যে ইউরোপে সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের ১০ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সত্যিকার অর্থে ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকটি যুদ্ধের গতিপথে কোনোপ্রকার পরিবর্তন আনতে পারেনি।
বরং রাশিয়া তাদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। আর ট্রাম্পের কূটনৈতিক অদক্ষতা ইউক্রেন ও ইউরোপের আস্থা আরও ক্ষুণœ করেছে। ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক প্রসঙ্গে জেলেনস্কি বলেন, এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি পর্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপীয়রাও যুক্ত রয়েছে। ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ইতিবাচক সংকেত নিয়ে আলোচনা করার কথা বলেছেন জেলেনস্কি। ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ একটি যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যকার বৈঠক বিষয়ে বলেন, আমরা পরিষ্কার যে, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখ-তা কার্যকরভাবে রক্ষা করার জন্য ইউক্রেনের অবশ্যই লৌহদৃঢ় নিরাপত্তা গ্যারান্টি থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চচয়তা দিতে প্রস্তুত। ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী বা তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে তাদের সহযোগিতার ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করা উচিত হবে না বলে তারা উল্লেখ করেন। ইইউ ও ন্যাটোতে যোগদানের ক্ষেত্রে রাশিয়ার কোনো ভেটো থাকবে না এটা তারা প্রত্যাশা করেন। ইউক্রেনের ভূখ-ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার তাদেরই থাকবে। বল প্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমানা পরিবর্তন করা যাবে না। যুদ্ধ শেষ করতে এবং একটি ন্যায্য ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জন করতে ইউক্রেনকে শক্তিশালী রাখার ক্ষেত্রে আরও কিছু করার জন্য ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানান। রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে নিষেধাজ্ঞা শক্তিশালী করা এবং বিস্তৃত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রাখার কথা বলেন। তারা একটি শান্তি জন্য কাজ করছেন; যা ইউক্রেন ও ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের সুরক্ষা প্রদান করবে। যুদ্ধ থামাতে না পারলেও পুতিনের সঙ্গে এই বৈঠক ট্রাম্পের জন্য একটি সুযোগ। নিজের দরকষাকষির ক্ষমতা দিয়ে তিনি একদিন শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন এবং এর মধ্য দিয়ে তিনি হয়তো কাক্সিক্ষত নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করতে পারবেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়ে ট্রাম্প জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের মধ্যে বৈঠকের আয়োজন করবেন। ওই বৈঠকটির পর একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের কথাও ট্রাম্প বলেন। প্রায় ৪ বছর ধরে চলমান যুদ্ধ বন্ধের জন্য এটি খুব ভালো ও প্রাথমিক পদক্ষেপ বলে ট্রাম্প মন্তব্য করেন। বৈঠক শেষে জেলেনস্কি ট্রাম্পকে যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র দেখিয়ে কে কোন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন তা দেখিয়েছেন। পুতিনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের জন্য তিনি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রদানই আলোচনার মূল বিষয় ছিল বলে তিনি জানান। যুদ্ধ বন্ধের জন্য এটা প্রয়োজনীয় সূচনাবিন্দু হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ইউক্রেনকে যেসব দেশ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে কিয়েভের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বিষয়ে অগ্রগতি হবে বলে জেলেনস্কি বলেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, গত কয়েক বছর শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি আমরা। আমাদের চাওয়া হচ্ছে জোরালো ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি। ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের ধারণা এজন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সমাধানের একমাত্র পথ হচ্ছে এটিই। ভবিষ্যতে ইউক্রেনে ইউরোপীয় সামরিক বাহিনীর উচিত হবে শান্তিরক্ষায় অংশগ্রহণ করা। তিনি আরও বলেন, আমাদের একটি শক্তিশালী ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী পেতে হবে এবং সেখানে সৈন্য পাঠিয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা করার প্রয়োজন হবে। আামদের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম প্রয়োজন হবে, ইউক্রেনের মিত্ররা যা প্রদানে রাজি রয়েছে। রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে এগিয়ে না এলে রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করা রাষ্ট্রগুলোর ওপরও শুল্কারোপ ও নিষেধাজ্ঞার দিকে ট্রাম্প যাবেন বলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস বৈঠক পরবর্তী বলেন, পরবর্তী বৈঠক যুদ্ধবিরতি ছাড়া হবে এটি আমি কল্পনাও করতে পারছি না। তাই এটি নিয়ে কাজ করার তিনি আহ্বান জানান এবং রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করার বিষয়ে বলেন।
ন্যাটার মহাসচিব মার্ক রুটে বৈঠকটিকে খুবই সফল বলে উল্লেখ করে ট্রাম্পকে একজন বাস্তববাদী শান্তিপ্রতিষ্ঠাকারী বলে অভিহিত করেন। রুট বলেন, ট্রাম্প চাপ প্রয়োগ করছেন এবং একইসঙ্গে তিনি এর সমাধানের পথগুলোও খুঁজছেন। ইউক্রেনে অবকাঠামো ধ্বংসও বন্ধ করতে হবে আমাদের। এটি একটি ভয়াবহ যুদ্ধ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে অচলাবস্থা ভাঙার জন্য তিনি ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। ইটালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার প্রসঙ্গে বলেন, আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলব। নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হলো এর প্রথমটি। এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন যুদ্ধ আবার না ঘটে। এটাই হচ্ছে সব ধরনের শান্তির পূর্বশর্ত। বৈঠকটিতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট ভন ডার লেন বলেন, ইউক্রেনের জন্য একটি ন্যায্য ও স্থায়ী প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা এখানে এসেছি। হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার লক্ষ্যে আমরা একসঙ্গে কাজ করব। ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব বলেন, প্রকৃত বিষয় হচ্ছে, আমা যে আজ টেবিলে বসেছি এটা খুবই প্রতীকী। এর অর্থ টিম ইউরোপ ও টিম যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করছে ইউক্রেনকে। আর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, আমরা বলছি নিরাপত্তার কথা। এটা শুধু ইউক্রেন নয়, সমগ্র ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তার কথাও বলছি। যে কারণে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
ট্রাম্পের সঙ্গে ইউরোপীয় নেতাদের বৈঠকের পর পুতিন ও জেলেনস্কি প্রথমবারের মতো একান্ত শান্তি সম্মেলনে বসার পথে অগ্রসর হচ্ছেন। ট্রাম্প সমালোচকদের উদ্দেশে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে তিনি সম্ভাব্য সকল কিছুই করবেন এবং এর সমাধান করেই তবে ছাড়বেন। ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকটির পূর্বে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর আরবান বলেছিলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধে রাশিয়া জয়ী হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুতিনকে নিয়ে দ্বিধার বড় যে কারণ সেটি হচ্ছে শান্তি তাঁর নিকট কোনো অগ্রাধিকারের বিষয় নয়। একমাত্র বিজয়ই হচ্ছে তাঁর অগ্রাধিকার। যুদ্ধ নিয়ে যে সকল অস্থিরতা একমাত্র বিজয়ের মধ্য দিয়েই কেবল তা অবসান হতে পারে। কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক ইগার টাইশকেভিচ বলেন, রাশিয়া অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করছে। তারা ট্রাম্পকে তাৎক্ষণিকভাবে সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব দিচ্ছে এবং চীনকে নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও দর-কষাকষি করছে। এর ভিত্তিতে রাশিয়া এমন রাজনৈতিক সুবিধা পেতে চাইছে, যা ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে তাদের অবস্থানকে নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করবে। আর ইউক্রেন হচ্ছে এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি অংশ।
গুরুত্বপূর্ণ হলেও এক্ষেত্রে ইউক্রেনের ভূমিকা হচ্ছে অনেকটা পাশ্বচরিত্রের মতো। যুক্তরাষ্ট্র চায় না রাশিয়া ও চীনের স্বার্থ এক হোক। রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা ও রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনাকে ট্রাম্প লাভজনক মনে করছেন। তাই রাশিয়াকে সংকটে ফেলতে আগ্রহী নয় যুক্তরাষ্ট্র। এটাও ঠিক যে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন-এদের কেউই রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভূমিকাকে তৃতীয় বিশ^শক্তির সমমর্যাদা দিতে আগ্রহী নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি রাশিয়ার আক্রমণকে বৈধভাবে সীমান্ত পরিবর্তনের উপায় হিসেবে ধরা হয়, তাহলে সমগ্র বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। রাশিয়াকে যদি অন্য দেশের বৈদেশিক নীতি ঠিক করার অধিকার দেওয়া হয়, তাহলে সেটা রাশিয়াকে আরও আগ্রাসী করে তুলবে। আর যুদ্ধাপরাধের জন্য স্বাভাবিক যে শাস্তি বা প্রতিকার পাওয়ার কথা, তা যদি না করা হয়, তাহলে কিন্তু সমগ্র বিশ্বে যুদ্ধ করাটা বৈধ হয়ে যাবে। রাশিয়া ট্রাম্পের মধ্যে এমন একটা ধারণা তৈরি করেছেন যে, যুদ্ধ বন্ধ চুক্তি করার দায়িত্ব জেলেনস্কির। রাশিয়া জানে জেলেনস্কি ভূখন্ড ছেড়ে দিতে রাজি হবেন না। এই টানাপোড়েনের কারণে আলোচনার টেবিল থেকে ট্রাম্প যদি চূড়ান্তভাবে সরে আসেন, তাহলে রাশিয়ার জন্য তা কিন্তু বিজয় হিসেবে বিবেচিত হবে।
লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়