কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

পুতিন-জেলেনস্কি বৈঠক কি সম্ভব

ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২৬ আগস্ট ২০২৫]

পুতিন-জেলেনস্কি বৈঠক কি সম্ভব

এবার পুতিন ও জেলেনস্কিকে নিয়ে একটি বৈঠক আয়োজনের জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই বৈঠক আয়োজন সম্ভব কি না, রুশ প্রেসিডেন্ট এ ধরনের বৈঠকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে বসতে সম্মত হবেন কি না—এসব নিয়ে চলছে নানা ধরনের বিশ্লেষণ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেশ কয়েকবার জেলেনস্কির পক্ষ থেকে রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করতে চাওয়া হয়েছে। প্রতিবারই এ ধরনের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন ভ্লাদিমির পুতিন।

 


সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ নিয়ে পুতিনের অবস্থান আগের চেয়ে কিছুটা কঠোর। তাঁর পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে প্রেসিডেন্ট পদের মেয়াদ শেষ হলেও জরুরি অবস্থা জারি করে নির্বাচন স্থগিত রেখেছেন জেলেনস্কি। এই বিবেচনায় রাশিয়া জেলেনস্কিকে আর ইউক্রেনের বৈধ প্রেসিডেন্ট বলে মনে করে না। ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যকার আলাস্কা বৈঠক, এর তিন দিনের মাথায় জেলেনস্কিসহ চারটি ইউরোপীয় দেশের নেতারা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ পান, যেখানে ট্রাম্প-পুতিন আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত করার পাশাপাশি এই আলোচনার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে কিভাবে একটি শান্তিচুক্তিতে উপনীত হওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

 

 

এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে আলাস্কা আলোচনায় পুতিনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়ায়, তা হচ্ছে পুতিন যা চান তাঁকে তা-ই দিতে হবে, নইলে এই যুদ্ধ থামানো যাবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বৈঠকে যোগদানের আগে থেকেই আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। তখন থেকেই এই যুদ্ধ থামাতে ইউক্রেনের দিক থেকে ছাড় দেওয়ার বিকল্প নেই এমন ধারণাই দিয়েছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট।

 

পুতিন-জেলেনস্কি বৈঠক কি সম্ভব২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি অর্থ এবং অস্ত্রের জোগান দিয়ে এলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টাও ইউক্রেনের জন্য খুব একটা সহায়ক হয়নি।

 


এমন অবস্থায় এই যুদ্ধ সময় থাকতে বন্ধ করার চেষ্টার মধ্যে এক ধরনের কূটনৈতিক গুরুত্ব থাকবে। এই যুদ্ধে জয়-পরাজয় এরই মধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে। ইউক্রেনই যে কেবল পরাজিত হয়েছে তা নয়, পরাজিত গোটা পশ্চিমা জোট। তবে একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা জোট ইউক্রেনের জন্য তথা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে একটি কৌশলগত নিরাপত্তাবলয় তৈরির বিষয়ে রাশিয়াকে সম্মত করানোর মাধ্যমে এক ধরনের প্রতীকী বিজয় পেতে পারে। ট্রাম্পের প্রচেষ্টার মধ্যে মূলত এই বিষয়টিই নিহিত।

 

 

এখন দেখা যাক, রুশ প্রেসিডেন্টের শর্ত মেনে নেওয়ার বিষয়ে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো আসলে কী ভাবছে। আমরা যদি সাম্প্রতিক হোয়াইট হাউসের বৈঠকের দিকে খেয়াল করি, তাহলে দেখব কোনো পক্ষই কিন্তু আগের মতো রুশ শর্তগুলো নিয়ে কঠোরতা দেখায়নি। এত দিন ধরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি শান্তিচুক্তির বিনিময়ে এক ইঞ্চি ভূমিও না ছাড়ার যে সংকল্পের কথা বলেছিলেন, সেসব নিয়েও কোনো কথা বলেননি, বরং সব পক্ষই এই সংকট সমাধানে একটি ত্রিপক্ষীয় (ট্রাম্প-পুতিন-জেলেনস্কি) বৈঠকের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। বৈঠকের মাঝখানেই পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের টেলিফোন আলোচনায় এ ধরনের বৈঠকের প্রস্তাব করা হলে সেখানেও নেতিবাচক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি। অর্থাৎ আমরা ধরেই নিতে পারি যে সব পক্ষই মোটামুটিভাবে এই বিষয়ে একমত যে পুতিনের শর্ত মেনে না নিয়ে এই যুদ্ধ অবসানের কোনো পথ নেই। এটিই যদি বাস্তবতা হয়, তাহলে এই আলোচনাপ্রক্রিয়া চালিয়ে একটি শান্তিচুক্তি না হওয়া পর্যন্ত সময় ধরে যুদ্ধবিরতির কোনো প্রয়োজন আছে বলেও মনে করছেন না ট্রাম্প। কেননা পরবর্তী বৈঠকেই এ ধরনের একটি চুক্তি হয়ে যাওয়া সম্ভব।

 

 

তবে বিষয়গুলো এমন নয় যে পুতিন যেভাবে চাইছেন সেভাবেই এই যুদ্ধের অবসান হতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে জেলেনস্কিকে আশ্বস্ত করেছেন যে যুদ্ধপরবর্তী ইউক্রেনের পুনর্গঠন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে ইউক্রেনের পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র এবং এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে শিগগিরই ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, যার আওতায় থাকবে আকাশ প্রতিরক্ষা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের মতো ব্যবস্থাও। ন্যাটো সদস্য দেশগুলো ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য না করেও কিভাবে ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা দিয়ে যাবে এবং নিজেদের নিরাপত্তাকে আরো সুসংহত করবে—এমন বিষয়ও রয়েছে। ইউক্রেনের কাছে রাশিয়ার দখলকৃত ভূমির বাইরেও তার বেসামরিকীকরণ, সেনাবাহিনীর আকার ছোট করা, ইউক্রেনে রুশভাষীদের অধিকার রক্ষা করাসহ আরো কয়েকটি দাবি রয়েছে। এর সব কটি প্রতিপালন করতে গেলে পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে ইউক্রেনের ভেতর শান্তিরক্ষী মোতায়েন বা অস্ত্র বিক্রির মতো বিষয়গুলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সুতরাং এই জায়গায় রাশিয়ার সঙ্গে দর-কষাকষির অবকাশ রয়েছে। এসব বিবেচনায় একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর সম্ভব হলেও কিছুটা সময় লেগে যেতে পারে।

 

 

এরই মধ্যে রাশিয়ার বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রশ্ন তুলেছে যে এর জন্য জেলেনস্কির সঙ্গে পুতিনের কোনো বৈঠকের প্রয়োজন আছে কি না। কেউ কেউ এমনটাও বলছেন যে পুতিন মনে করছেন জেলেনস্কি বর্তমানে ইউক্রেনের বৈধ প্রেসিডেন্ট নন বিধায় তাঁর সঙ্গে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ভবিষ্যতে দেশটির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এটি নিয়ে আপত্তি করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে হয়তো রাশিয়ার তরফ থেকে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ইউক্রেনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দাবি করা হতে পারে আর এই সময়টা ধরে দুই দেশের মধ্যে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদিত হতে পারে। এটিতে পশ্চিমারা সম্মত হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেননা সাম্প্রতিক সময়ে জেলেনস্কির জনপ্রিয়তায় অনেকটা ভাটা পড়েছে এবং নির্বাচন হলে রুশপন্থী কারো বিজয়ের সম্ভাবনা থাকতে পারে অথবা রাশিয়া এই নির্বাচনকে প্রভাবিত করে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনতে পারে। এসব বিষয় আমলে নিতে গেলে বলতে হয়, পুতিনের সঙ্গে জেলেনস্কির সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা ট্রাম্পের জন্য একটি কঠিন কাজ। পুতিন সম্ভবত জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাতে একদম আগ্রহী নন। এমন পরিস্থিতিতে শান্তিচুক্তির আগে একটি যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাই বেশি থাকবে।

 

 

যেভাবেই হোক না কেন, এই যুদ্ধটি আর খুব বেশিদিন স্থায়ী হবে বলে মনে হয় না। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রকেও ব্যাপকভাবে পাল্টে দেবে। প্রচলিত নিরাপত্তা ধারণার ক্ষেত্রে এই যুদ্ধ সজোরে আঘাত করেছে। ন্যাটোর মতো সংগঠন তার অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারবে কি না এমন সংশয়ের পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশগুলোকে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে নিজস্ব নিরাপত্তাবলয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার বিষয়ে নতুন করে তাগিদ দিচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতিতেও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে, যা রাজনীতিকে বদলে দিতে পারে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি নতুন নতুন ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছে। তবে এই সবকিছুর মধ্যে একটি প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ, আর সেটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রও কি তাহলে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে এখন থেকে একলা চল নীতিতে চলবে, নাকি অন্য কিছু ভাববে। আপাতত বিকল্প খুব বেশি হাতে নেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের। শুরুটা হয়েছিল ইউক্রেনকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ন্যাটোর বিস্তৃতির পরিকল্পনার মাধ্যমে, পুতিন সুযোগ লুফে নিয়েছেন। রাজনীতি এখন তাঁর নিয়ন্ত্রণে।

 

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়