পশতুন কাফেলায় বাংলাদেশি: টিটিপি কি নতুন আঞ্চলিক টানাপোড়েন তৈরি করছে
পাকিস্তানে টিটিপির হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় অনেকে মনে করছেন, তালেবদের এ আন্দোলন ইতিমধ্যে আঞ্চলিক চেহারা নিচ্ছে। শত্রু-মিত্রের ধরনও পাল্টাচ্ছে তাদের। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে টিটিপির কর্মকাণ্ড নিয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ [সূত্র : প্রথম আলো, ০৩ অক্টোবর ২০২৫]

তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে বলা হয় টিটিপি। ‘তেহরিক’ মানে সক্রিয়তা বা আন্দোলন। তালেবান অর্থ শিক্ষার্থীরা। বাংলায় টিটিপির অর্থ দাঁড়ায় পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন।
আফগানিস্তানে বহু সংগ্রাম শেষে পশতু তালেবান এখন ক্ষমতায়। পাকিস্তানের পশতু এলাকার টিটিপি তাদেরই উপশাখা। তবে আফগান বা পাকিস্তান কোনো দেশের তেহরিক-ই-তালেবান আগের মতো ‘ছাত্রদের আন্দোলনে’ নেই; একটা বিশেষ আদর্শের সব বয়সীর উদ্যোগে পরিণত হয়েছে এবং এটা কেবল পশতু এলাকাতেও সীমিত নেই।
পাকিস্তানে টিটিপির হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে একাধিক বাংলাদেশির নিহত হওয়ার খবর বের হওয়ার পর এত দিনকার অনিচ্ছুক অনেকে মানছেন, তালেবদের এ আন্দোলন ইতিমধ্যে আঞ্চলিক চেহারা নিচ্ছে। শত্রু-মিত্রের ধরনও পাল্টাচ্ছে তাদের।
টিটিপি ‘পশতুনিস্তান’কে নতুন অবয়ব দিয়েছে
পশতুভাষীরা আফগানিস্তানের প্রধান জাতি। প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ সেখানে তারা। পাকিস্তানে পশতুনরা সংখ্যায় দ্বিতীয় প্রধান জাতি। খাইবার পাখতুনখাওয়া (সাবেক উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) এবং বেলুচিস্তানে তাদের বড় বসতি হলেও করাচি, লাহোর, ইসলামাবাদ শহরেও সংখ্যায় অনেক আছে। সব মিলে সংখ্যায় প্রায় সাত কোটির মতো হবে পশতুভাষীরা। এ জাতির পুরোনো সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ইরান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে। ওই সব অঞ্চলেও অল্পবিস্তর আছে তারা।
বিভিন্ন রাষ্ট্রের সীমান্তে বিভক্ত হয়ে পড়লেও পশতুনদের মধ্যে পশতুনিস্তান বলে এক হারিয়ে ফেলা জনপদের কল্পনা আছে। যে জনপদ ভাগ করে গেছেন স্যার মার্টিমার ডুরান্ট ১৮৯৩ সালে। তাঁর কলমের দাগই আজকের ‘ডুরান্ট লাইন’।
পশতুনরা মনে করে, কৃত্রিম ওই রেখা তাদের জাতিসত্তাকে বিভক্ত করেছে। সেই ক্ষোভের দানা বাঁধা ঠেকাতে আড়াই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এ সীমান্তে পাকিস্তান এখন কাঁটাতার বসাচ্ছে। কিন্তু কৃত্রিম সীমান্তের মতোই কাঁটাতার পশতুনদের যে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত রাখতে পারছে না, তার এখনকার প্রমাণ কল্পনার পশতুনিস্তানজুড়ে তালেবান আদর্শবাদের উত্থান।
‘সীমান্ত গান্ধী’ নামে পরিচিত গাফফার খানের (১৮৯০-১৯৮৮) নেতৃত্বের আমলে এবং তার পরে বহুকাল পশতুনদের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ধারাই ছিল প্রবল। এখন ডুরান্ট লাইনের দুই দিকে প্রাধান্য চলছে ইসলামপন্থী দাবিদার ‘তালেব’দের। আফগানিস্তানে তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। পাকিস্তান সরকার ও সশস্ত্র বাহিনী সেই রাজনৈতিক সুনামি থেকে পাঞ্জাব ও সিন্ধুকে বাঁচাতে চাইছে। এর মধ্যে কল্পনার পুরোনো পশতুনিস্তান অনেকটাই ধর্মতান্ত্রিক সামাজিক চেহারা নিয়ে ফেলেছে।
যেভাবে তালেবান আন্দোলনের বিস্তার
তালেবান আন্দোলনের জন্ম প্রায় ৩০ বছর আগে ডুরান্ট লাইনের উভয় দিক মিলে। সীমান্তের দুই দিকের মাদ্রাসগুলোয় পশতুভাষী শিক্ষার্থীদের যোদ্ধা-জনবল বানাতে পাকিস্তানের বিভিন্ন সংস্থা অনেক পরিশ্রম করেছে। ১৯৯৬ সালে এসে তারা প্রথম কাবুলে ক্ষমতা দখলে সক্ষম হয়। চার-পাঁচ বছর পর ক্ষমতা থেকে তারা উৎখাত হয় এবং পাকিস্তানের পশতু এলাকায় আশ্রয় নেয়।
নতুন করে সংগঠিত হয়ে প্রায় দুই দশক পর ন্যাটো বাহিনীকে তাড়িয়ে আবার কাবুলে ক্ষমতায় আসে ২০২১ সালের আগস্টে। এরপর ডুরান্ট লাইনের পাকিস্তান অংশে শুরু তালেবান সশস্ত্রতার তৃতীয় তরঙ্গ। তেহরিক–ই–তালেবান এখানে ২০০৭ থেকেই ছিল। কাবুল জয় শেষে তারা ‘পাকিস্তান জয়’ করতে নেমেছে কেবল।
আফগান টিটিএর মতো পাকিস্তানের টিটিপিও দেশটির অনেকগুলো সশস্ত্র সংগঠনের একটি জোট বা নেটওয়ার্ক। অন্তত ১৫টি গ্রুপ আছে এই নেটওয়ার্কে। দুটি গ্রুপ চীনের উইঘুর এলাকা ও উজবেকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করছে। সর্বশেষ বাংলাদেশিদের যুক্ত থাকারও খবর এল। সমগ্র জোটের সমন্বয় কীভাবে হচ্ছে, সেটা বলা মুশকিল। তবে আফগান পাখতিয়ারে আত্মগোপনে থাকা নুর ওয়ালি মেহসুদকে টিটিপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা মনে করে খুঁজছে পাকিস্তান।
পাকিস্তানে টিটিপির পরিসর
পাকিস্তানের টিটিপিবিরোধী যুদ্ধের ভরকেন্দ্র খাইবার পাখতুনখাওয়া (কেপি)। বলা বাহুল্য, এখানকার সবাই টিটিপির সমর্থক বা সদস্য নয়। তবে সংখ্যায় তারা অনেক, সর্বত্র আছে অল্পবিস্তর এবং বাড়ছেও।
পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য এখানকার যুদ্ধক্ষেত্রটা বিশাল ও জটিল। তাদের এখানে লড়তে হচ্ছে নিজ জনগণের বিরুদ্ধে। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর অন্তত ১৫ শতাংশ সদস্য পশতুভাষী। ফলে পশতুভাষী সেনা ও গেরিলারা পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে পড়ছেন।
টিটিপি দমন করতে যখনই হঠাৎ কোনো অভিযান চালানো হয়, তখন বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তারা সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে খেপে ওঠে। আবার সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পূর্বে অবহিত করে অভিযান চালালে সেটা সফল হয় না। এ মুহূর্তে কেপিতে চলছে ‘অপারেশন সর্বাকফ’। সর্বাকফ ফারসি শব্দ। যার অর্থ, জান দিতে প্রস্তুত যারা।
নাম থেকেই স্পষ্ট রাষ্ট্রীয় সৈনিকেরা মৃত্যুপণ করে টিটিপি দমনে নেমেছেন। গত বছর জুনে ‘আজম-ই-ইসতেখাম’ (স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে সমাধান) নামে আরেকটা অভিযান চালিয়েছিলেন তাঁরা। তবে এসব অভিযানে টিটিপি দুর্বল হয়েছে বলে সাক্ষ্য মেলে না।
পাকিস্তানের তালেবান কেবল নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে না, পশতু এলাকার পুরোনো রাজনেতিক দল আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির কর্মীদেরও আক্রমণ করছে। ইসলামাবাদের নির্বাহী শক্তির বিপরীতে এ এলাকায় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তারা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাখতে চায় না। এএনপি পশতু এলাকায় বামপন্থী আদর্শের পরম্পরা লালন করছে, যা তালেবান দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত।
টিটিপির সব উপদল একই আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে লড়ছে এমন নয়। কেউ কেউ কেপি এলাকায় শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করতে পারলেই খুশি। অনেকে পাকিস্তান সরকারকে ‘তাগুদ’ হিসেবে অভিহিত করে উৎখাত করতে চায়। কেউ কেউ চায় পশতুনিস্তানকে এক করতে। আবার বিদেশি যোদ্ধারা ‘হিজরত’ করছে সুন্নি হানাফি মাজহাবের ধর্মীয় একটা মুক্তাঞ্চলের স্বপ্ন নিয়ে।
পশতুনিস্তানের রাজনীতিতে বাঙালিরা
পশতুনদের সঙ্গে বাংলাভাষীদের রাজনৈতিক সম্পর্কের বহু অধ্যায় রয়েছে ইতিহাসে। পশতুনদের পুরোনো দল এএনপির প্রতিষ্ঠাতা ওয়ালি খানের রাজনৈতিক জীবনের শুরু বাংলাদেশের মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপে। পাকিস্তানের উভয় অংশজুড়ে এটাই সবচেয়ে বড় দল ছিল।
আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রচারকৌশল নিয়ে এবং আন্তর্জাতিকভাবে মস্কো-পিকিং আদর্শিক টানাপোড়েনে ১৯৬৫ সাল থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে এবং ১৯৬৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাপ ভেঙ্গে গেলে গাফফার খান ও ওয়ালি খানের অনুসারীরা পরবর্তীতে এএনপি নাম নিয়ে কেপি ও বেলুচিস্তানে কাজ করতে থাকে।
ভাসানীর পাশাপাশি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সূত্রেও পশতুন জাতীয়তাবাদীরা বাংলাভাষীদের খুব ভক্ত ছিল। ভারত ভাগের পরপর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের প্রতিনিধি মুখ্যমন্ত্রী কাইয়ুম খান যখন পশতুন খুদাই খিদমতগার আন্দোলন কর্মীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করেন, তখন তাদের পক্ষে আইনি লড়াই চালাতে ছুটে গিয়েছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পশতুন জাতীয়তাবাদীদের অতীতে মৈত্রীর সঙ্গে এখনকার কেপিতে বাংলাদেশিরা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে আলোচনায় এলেন। অনেক দিন থেকে টিটিপিকে অনুসরণকারী পাকিস্তানের নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকেরা সেখানে বাংলাদেশি যোদ্ধাদের উপস্থিতি ও মাঝেমধ্যে নিহত হওয়ার উল্লেখ করলেও ঢাকায় সেসব তথ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়নি কেবল ফেরত আসা কয়েকজনকে আটক করা ছাড়া।
সম্প্রতি ‘দ্য ডিসেন্ট’ নামে একটা মিডিয়ার সূত্রে মাদারীপুরের ফয়সালের মৃত্য বেশ প্রচার পেয়ে গেলে বিষয়টা আর আড়ালে রাখার উপায় থাকেনি। ফয়সাল মারা যায় কেপির করক জেলায়। কেপি থেকে বহুদূরে বাংলাদেশের একটা জেলায় ফয়সালের রিক্রুটমেন্ট—এ রকম খবরের প্রতিও অনেকের বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করছে। কেউ কেউ বলছেন, টিটিপিতে অনেক বাংলাদেশি মুজাহিদ রয়েছেন। অনেকে আফগানিস্তানেও আছেন।
টিটিপি ও আঞ্চলিক টানাপোড়েন
পাকিস্তান-আফগানিস্তান প্রতিবেশী হলেও সম্পর্ক কখনো স্থায়ীভাবে ভালো ছিল না। ১৯৪৭ সালে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান জাতিসংঘভুক্ত হতে গেলে একটি মাত্র দেশ বিরোধিতা করে, সেটা আফগানিস্তান। আফগানরা মনে করে, তাদের অনেক এলাকা নিয়ে পাকিস্তান গড়ে উঠেছে।
আবার এই আফগান পশতুনদের সংগঠন টিটিএ–কে (তেহরিক-ই-তালেবান আফগানিস্তান) এবং তারও আগে আফগান মুজাহিদদের পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীই আরও দুটি দেশের সঙ্গে মিলে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে কাবুলে ক্ষমতা দখলে সহায়তা করেছে। তখন উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের দিকে সাম্যবাদী রাজনীতির আগমন ঠেকানো। এটাও প্রত্যাশা ছিল, কাবুলে ক্ষমতা পেয়ে তালেবান অগ্রযাত্রা সেখানেই থিতু থাকবে এবং পাকিস্তানে এ মতাদর্শের বিস্তার রোধ ইসলামাবাদকে সাহায্য করবে।
কিন্তু ইতিহাসের কৌতুক বলতে হয়, নিজেদের ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়া টিটিপির রাজনীতির জন্য ইসলামাবাদের সরকার কাবুলের পশতুন শাসকদেরই দায়ী করছে এখন। আফগান শাসকেরা প্রতিনিয়ত বলছেন, টিটিপি একান্তই পাকিস্তানভিত্তিক, এতে কাবুলের হাত নেই। পারস্পরিক এ ঝগড়া কেবল মুখে সীমাবদ্ধ নেই। উভয় দেশ কয়েকবার গোলাবারুদও ছোড়াছুড়ি করেছে।
নিষিদ্ধ সংগঠন পাকিস্তান তেহরিক–ই–তালেবানের হয়ে অস্ত্র হাতে মাদারীপুরের তরুণ ফয়সাল হোসেন। তাঁর নিহত হওয়ার খবর শুনে মায়ের আহাজারি
নিষিদ্ধ সংগঠন পাকিস্তান তেহরিক–ই–তালেবানের হয়ে অস্ত্র হাতে মাদারীপুরের তরুণ ফয়সাল হোসেন। তাঁর নিহত হওয়ার খবর শুনে মায়ের আহাজারিছবি: পরিবার সূত্রে পাওয়া এবং প্রথম আলো
টিটিপি নিয়ে আফগান সরকারকে চাপ দিতে পাকিস্তান তার এলাকায় থাকা লাখ লাখ পশতুন শরণার্থীকে অমানবিকভাবে তাড়িয়েছে সম্প্রতি। কাবুলের কাছে পাকিস্তানের চাওয়া একটাই, ‘হয় পাকিস্তান, না হয় টিটিপি’—যেকোনো একটা বেছে নাও। কিন্তু যেসব পাকিস্তানি মুজাহিদ প্রথমে রাশিয়া এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জীবন বাজি রেখে আফগানদের সঙ্গে লড়েছে, তাদের কীভাবে ‘ইসলামিক আমিরাত’ ছেড়ে চলে যেতে বলবে তালেবান সরকার?
টিটিপি আফগানিস্তানের মতো নিজ দেশেও যদি ‘ইসলামি শাসন’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে আফগান তালেবান কোন যুক্তিতে এর বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখবে?কেবল ভাবাদর্শ নয়, টিটিপির জনবল, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অস্ত্রপাতি যে আফগানিস্তান হয়ে আসছে, সে বিষয়ে পাকিস্তান নিশ্চিত। এটা বন্ধ করার তেমন উপায় নেই তাদের হাতে। প্রথমত এই আদর্শবাদী শক্তিকে কাঠামোগতভাবে তাদেরই বিভিন্ন সংস্থা তৈরি করেছিল। আবার টিটিপিকে নির্মূলে আফগান সরকারের ওপর জবরদস্তি করলে সম্পর্ক খারাপের ঝুঁকি নিতে হবে।
ভূরাজনীতিতে আফগানিস্তানকে খুব প্রয়োজন পাকিস্তানের। পশতুন আফগানরা যাতে ডুরান্ট লাইন নিয়ে পুরোনো দাবিতে সোচ্চার না হয়, সে জন্যও নমনীয় এক আফগান সরকার প্রয়োজন ইসলামাবাদের। কিন্তু টিটিপির দিক থেকে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিপক্ষরাও চায় দেশটির সশস্ত্র বাহিনী অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক। কেপি যদি বিদেশি যোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে, সেটাও আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়াবে। টিটিপির উত্থান দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগেও একধরনের বাধা হিসেবে আছে।
সরকারের জন্য আরেক চ্যালেঞ্জ ইমরান খান। কেপিতে তাঁর দলের জনপ্রিয়তা ব্যাপক এবং এই দল সেনা অভিযানের বিপক্ষে। তারা চায় টিটিপিকে নির্মূল না করে সরকার আলোচনায় বসুক। অতীতে এ রকম কৌশল অবশ্য তেমন ইতিবাচক ফল দেয়নি। মূলত রাজনৈতিক স্বার্থে সেনাবাহিনীবিরোধী অবস্থান থেকে ইমরানের দল এ রকম বলছে। জটিল এ পরিবেশে সেনাবাহিনী যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সাধারণ পশতুন ও আফগান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক অতি খারাপ না করে পরিস্থিতি সামলাতে।
সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সম্ভাব্য নতুন সংকট হবে যদি টিটিপি ও বালুচ জাতীয়তাবাদীরা পরস্পরকে সহায়তায় এগিয়ে আসে। ইসলামাবাদ বহুবার অভিযোগ করেছে, বালুচদের ভারত সহযোগিতা দেয়। বালুচ গেরিলারা যদিও আদর্শিকভাবে ধর্মতান্ত্রিক নয়, কিন্তু ‘শত্রুর শত্রু মিত্র’ কৌশলের অংশ হিসেবে কখনো টিটিপির সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্কে যাবে না, এমন বলা যায় না।
বালুচদের সঙ্গে টিটিপির সম্পর্ক বাড়লে সেটা চীনের জন্য বাড়তি উদ্বেগের হবে। বেলুচিস্তানে চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। তখন একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, সেটা বলা মুশকিল। তবে আপাতত ওয়াশিংটন টিটিপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দেখছে এবং এর মোকাবিলায় পাকিস্তান সরকারকে সাহায্য করছে।
সামগ্রিক এসব বিষয় একান্তই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ প্রসঙ্গ মনে হতে পারে। কিন্তু এই কাফেলায় বাংলাদেশিরা ইতোমধ্যে যুক্ত হয়ে গেছেন। ফলে সামনের দিনগুলোতে এ বিষয়ে বাংলাদেশমুখী আরও তথ্য-উপাত্ত আসতে পারে। হয়তো তখন প্রশ্ন উঠবে, বাংলাদেশ সরকার টিটিপিতে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়ে কী ভাবছে এবং ওই জনবল বাংলাদেশ নিয়ে কী ভাবছে?
আলতাফ পারভেজ ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব