কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

পশ্চিমা ও চীনা ঋণের ভিন্নমুখী স্রোত: বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় সুযোগ ও ঝুঁকির ভারসাম্য

ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক [সূত্র : বণিক বার্তা, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

পশ্চিমা ও চীনা ঋণের ভিন্নমুখী স্রোত: বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় সুযোগ ও ঝুঁকির ভারসাম্য

বাংলাদেশ তার উন্নয়ন যাত্রায় এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের এ গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বিশাল অবকাঠামো, জ্বালানিনিরাপত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তরের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন হাজার হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) পূরণ করতে হলে বাংলাদেশকে প্রতি বছর প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হবে। এত বিপুল অর্থের জোগান কেবল দেশীয় সম্পদ দিয়ে সম্ভব নয়, তাই বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে।

এ অপরিহার্য নির্ভরতা বাংলাদেশকে বিশ্ব অর্থনীতির দুটি প্রভাবশালী কিন্তু চরিত্রগতভাবে ভিন্ন ঋণদাতা শিবিরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একদিকে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জোট, যেমন বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দ্বিপক্ষীয় সহযোগীরা। অন্যদিকে রয়েছে গ্লোবাল সাউথের নতুন অর্থনৈতিক শক্তি চীন, যার প্রধান হাতিয়ার হলো বিশাল"‘‌বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ"(বিআরআই)’। এ দুই ধারার ঋণ প্রদানের দর্শন, শর্ত ও কৌশলে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নীতিনির্ধারণের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

পশ্চিমা ঋণের মডেল: সংস্কার ও শর্তের সমন্বয়

 

পশ্চিমা ঋণদাতাদের মডেল মূলত প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার, সুশাসন ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ঋণ ও অনুদান প্রায়ই কঠোর শর্তের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যার লক্ষ্য অর্থনৈতিক নীতি সংশোধন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংস্কার, ভর্তুকি হ্রাস এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ। এক অর্থে এটি পশ্চিমা দেশগুলোর ‘‌নরম ক্ষমতা’ প্রয়োগ।

 

 

 

এ মডেলের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে জবাবদিহি বাড়ানো, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা উন্নত করা এবং ঋণের অর্থ অপচয় রোধে এটি সহায়ক। বাংলাদেশের মেট্রোরেল প্রকল্প কিংবা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে জাইকা ও এডিবির অবদান তার দৃষ্টান্ত। পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষার কঠোর নীতিমালা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায়ও সহায়তা করেছে।

 

 

তবে সমালোচনা এড়ানো যায় না। পশ্চিমা ঋণের শর্তগুলো প্রায়ই স্থানীয় বাস্তবতা উপেক্ষা করে ‘‌একই মাপের পোশাক’ চাপিয়ে দেয়। শ্রীলংকা, ঘানা কিংবা জাম্বিয়ার মতো দেশে দেখা গেছে, ঋণ চুক্তির শর্ত পূরণ করতে গিয়ে সাধারণ জনগণকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। বাংলাদেশেও সম্প্রতি আইএমএফের ঋণের শর্ত হিসেবে জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার ও ব্যাংক খাত সংস্কারের দাবি নতুন চাপ তৈরি করেছে। এতে বোঝা যায়, পশ্চিমা ঋণ কেবল অর্থ নয়, নীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে।

 

 

চীনের ঋণ মডেল: দ্রুততা ও ঝুঁকির দ্বৈধতা

 

 

চীনের ঋণদানের মডেল সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বেইজিং কনসেনসাস" নামে পরিচিত এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল সুর হলো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণগ্রহীতা দেশের সুশাসন, মানবাধিকার বা অর্থনৈতিক নীতির বিষয়ে শর্ত আরোপ করে না।

 

 

এই মডেলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো দ্রুততা ও নমনীয়তা। পশ্চিমা ঋণদাতারা যেখানে প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘ সময় নেন, চীনের অর্থায়ন সেখানে তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ বা কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণে চীনা অর্থায়ন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে দ্রুত ভূমিকা রেখেছে।

 

 

কিন্তু এ মডেলও ঝুঁকিমুক্ত নয়। চীনা ঋণ সাধারণত এমন শর্তে দেয়া হয় যেখানে প্রকল্পের পরিকল্পনা, ঠিকাদারি এবং উপকরণ সরবরাহে চীনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক থাকে। ফলে ঋণের অর্থের একটি বড় অংশ আবার চীনের কাছেই ফিরে যায়। এছাড়া চীনা ঋণচুক্তিগুলো অনেক সময় গোপনীয় থাকে, যা স্বচ্ছতার প্রশ্ন তোলে।

 

 

শ্রীলংকার হাম্বানটোটা বন্দরের ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচিত। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে দেশটিকে ৯৯ বছরের জন্য বন্দরটি চীনের কাছে ইজারা দিতে হয়েছিল। আফ্রিকার জাম্বিয়ায়ও একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এসব উদাহরণ বাংলাদেশকে সতর্ক করে দিয়েছে, যদিও সরকার বারবার আশ্বস্ত করছে যে তারা ‘‌ঋণফাঁদে’ পড়বে না। তবু বৈদেশিক ঋণের চাপ বাড়তে থাকলে এবং রফতানি আয়ে সেই অনুপাতে বৃদ্ধি না ঘটলে ঝুঁকি এড়ানো কঠিন হবে।

 

 

বাংলাদেশের বাস্তববাদী কৌশল

বাংলাদেশ বাস্তববাদী কূটনীতির মাধ্যমে উভয় উৎস থেকেই ঋণ ও সহায়তা গ্রহণের কৌশল নিয়েছে। ঢাকার মেট্রোরেল, কর্ণফুলী নদীর সেতু বা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর—এসব জায়গায় পশ্চিমা অর্থায়নের অবদান রয়েছে। একই সঙ্গে চীনা অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র, টানেল ও রেল সংযোগ। এ দ্বৈত কৌশল বাংলাদেশকে বহুমাত্রিক সুবিধা দিয়েছে এবং ঝুঁকিও এনেছে। পশ্চিমা ঋণের শর্তযুক্ত চাপ যেমন অর্থনীতিতে টানাপড়েন সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি চীনা ঋণের অস্বচ্ছতা ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি নির্ভরতা ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

 

বাংলাদেশের করণীয়

 

 

বাংলাদেশের জন্য করণীয় স্পষ্ট হলেও তা বাস্তবায়ন সহজ নয়। প্রথমত, ঋণের উৎস বৈচিত্র্যকরণ অপরিহার্য। কেবল পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান বা চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ভারতের মতো প্রতিবেশী, মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো কিংবা বহুপক্ষীয় নতুন উদ্যোগগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেলকে শক্তিশালী করে দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। এতে বৈদেশিক ঋণের চাপও কিছুটা হ্রাস পাবে।

 

 

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ঋণচুক্তি স্বচ্ছতার আলোকে জনগণ ও সংসদের সামনে উন্মুক্ত করতে হবে। বর্তমানে অনেক চীনা প্রকল্পে চুক্তি গোপন থাকে, যা জনআস্থা দুর্বল করে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে দুর্নীতি কমবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের আস্থা ফিরে আসবে।

 

 

তৃতীয়ত, বিদেশী ঋণনির্ভর প্রকল্পে স্থানীয় শ্রমিক, ঠিকাদার ও উপকরণের অংশগ্রহণ বাড়ানো দরকার। এতে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, দক্ষতা হস্তান্তর ঘটবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় সক্ষমতা তৈরি হবে। না হলে বৈদেশিক ঋণের অর্থ আবার বিদেশেই ফিরে যাবে, যা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

 

 

চতুর্থত, বৈদেশিক ঋণের চাপ মোকাবেলায় সবচেয়ে টেকসই পথ হলো রফতানি আয়ের বৃদ্ধি। বর্তমানে বাংলাদেশের রফতানি মূলত পোশাক শিল্পকেন্দ্রিক, যা মোট রফতানির প্রায় ৮৫ শতাংশ। এ নির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ কিংবা চামড়া শিল্পের মতো খাতে বহুমুখীকরণ ঘটাতে হবে। যদি রফতানি আয়ের উৎস বাড়ানো যায়, তাহলে ঋণ পরিশোধও সহজ হবে ও অর্থনীতি আরো টেকসই ভিত্তি পাবে।

 

 

সব শেষে, সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। প্রতিটি ঋণচুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব—অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। কেবল স্বল্পমেয়াদি সুবিধা দেখে সিদ্ধান্ত নিলে তা ভবিষ্যতে অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই অর্থনৈতিক কূটনীতি হতে হবে দক্ষ, স্বচ্ছ ও দূরদর্শী।

 

 

বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রা এক কঠিন স্রোতস্বিনী নদীর মতো, যেখানে একদিকে পশ্চিমা ঋণের শর্তযুক্ত ঢেউ, অন্যদিকে চীনা ঋণের দ্রুততার স্রোত। এ দুই স্রোতকে কাজে লাগিয়ে এগোতে হলে বাংলাদেশের তরির হাল হতে হবে দৃঢ়-স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দূরদর্শী অর্থনৈতিক নীতি।

 

 

পশ্চিমা ঋণ থেকে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণের দিকটি এবং চীনা ঋণ থেকে দ্রুত অবকাঠামো গঠনের দিকটি—উভয়ই বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। তবে ঋণ যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বোঝা না হয়ে ওঠে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এই সন্ধিক্ষণে অন্ধ আকর্ষণ কিংবা অযাচিত সংশয় নয়, প্রয়োজন একটি হিসেবি, সার্বভৌমত্ব সচেতন উন্নয়ন কৌশল। সেটিই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য।

 

 

ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি