পর্যটনের টেকসই রূপান্তরে যা করা প্রয়োজন
ড. কামরুল হাসান [প্রকাশ : যুগান্তর, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

প্রতিবছরের মতো আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে। এ বছরের মূল প্রতিপাদ্য ‘Tourism and Sustainable Transformation’, তথা ‘পর্যটন ও টেকসই রূপান্তর’। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এই প্রতিপাদ্য বিষয়কে অনুবাদ করেছে এভাবে : টেকসই উন্নয়নে পর্যটন। এ প্রতিপাদ্যের আলোকে প্রশ্ন উঠছে, পর্যটন কি একটি ন্যায়সংগত, পরিবেশবান্ধব ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গঠনের হাতিয়ার হতে পারে? পরিসংখ্যান বলছে, অবশ্যই পারে। কারণ ২০২৪ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান ছিল প্রায় ১০.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্বজুড়ে মোট চাকরির প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ সৃষ্টি করেছে। এ বিপুল অবদানই পর্যটন খাতকে টেকসই রূপান্তরের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার দায়বদ্ধতা দিয়েছে।
কোভিড-১৯-পরবর্তী বিশ্ব আন্তর্জাতিক ভ্রমণ দ্রুত পুনরুদ্ধার করেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে পর্যটক আগমনের সংখ্যা ও ব্যয় প্রাক-মহামারি স্তর অতিক্রম করেছে। তবে এ দ্রুত পুনরুদ্ধার একইসঙ্গে নানা চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে-কোথাও অতিরিক্ত পর্যটন, কোথাও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও নিরাপত্তা, আবার কোথাও পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ। তাই এ বছরের প্রতিপাদ্য গতানুগতিক কোনো স্লোগান নয়, বরং পর্যটন খাত পুনর্গঠনের এক দিকনির্দেশনা।
পর্যটন বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এ খাতে কর্মরত। দারিদ্র্য হ্রাস ও স্থানীয় উন্নয়নে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুযোগ অনেক, তবে এখনো সেসব পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সালে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে এসেছেন। একই বছরে এ খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ছিল প্রায় ৪৫৩ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে সামান্য হ্রাস পেয়ে প্রায় ৪৪০ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। এটি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কম। সঠিক নীতি, দক্ষ জনশক্তি, উন্নত অবকাঠামো ও কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে এ খাতের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।
পর্যটন প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। সৈকত, বন, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যই এর মূল আকর্ষণ। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন পরিবেশের ক্ষতি করে-কোথাও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা, কোথাও পানির চাপ, আবার কোথাও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে ফেলে। বাংলাদেশের জন্য সুন্দরবন, কক্সবাজার উপকূল ও পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। টেকসই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব হোটেল ও রিসোর্ট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো।
পর্যটন কেবল অর্থনীতিকে নয়, সংস্কৃতি ও সমাজকেও প্রভাবিত করে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, গ্রামীণ জীবনধারা কিংবা আঞ্চলিক খাবার-সবই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। তবে বাণিজ্যিকীকরণের ফলে এসব ঐতিহ্য হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে। তাই দরকার কমিউনিটির অংশগ্রহণ, ন্যায্য আয়ের বণ্টন এবং স্থানীয় দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ। এভাবে পর্যটন খাত হয়ে উঠবে সংস্কৃতিবান্ধব ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান দেশ, যেখানে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে সামাজিক কাঠামো পর্যন্ত ইসলামি মূল্যবোধ গভীরভাবে প্রোথিত। তাই পর্যটনশিল্পের নৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইসলামে মানুষকে আল্লাহর প্রতিনিধি বা খলিফা হিসাবে পৃথিবীর দায়িত্বশীল অভিভাবক বিবেচনা করা হয়। এর অর্থ হলো, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি যত্নশীল থাকা, অপচয় এড়িয়ে চলা এবং ভারসাম্য রক্ষা করা। টেকসই পর্যটনের মূল দর্শনের সঙ্গে এটি গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সংযম ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি, যা আমাদের শেখায় অতিরিক্ত ভোগবিলাস না করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে। পর্যটন খাতে এ নীতির প্রয়োগে অপচয় কমবে, পরিবেশ সুরক্ষিত হবে এবং স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত হবে। একইভাবে ন্যায্য বাণিজ্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের শিক্ষা পর্যটন ব্যবসাকে আরও স্বচ্ছ ও টেকসই করতে সাহায্য করবে। স্থানীয় মানুষ ও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, লাভের সঠিক বণ্টন এবং পর্যটন সুবিধা থেকে সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উপকার নিশ্চিত করা ইসলামি নীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশে ইসলামি মূল্যবোধকে পর্যটনের সঙ্গে একীভূত করার বাস্তব দিকও অনেক। হালাল খাদ্যের নিশ্চয়তা, নামাজের সুবিধা, শালীন ও পরিবারকেন্দ্রিক বিনোদনের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মুসলিম পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। বর্তমানে মুসলিম পর্যটন বাজার বিশ্বব্যাপী দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এ বাজার ধরতে পারলে বাংলাদেশ বৈদেশিক আয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারবে।
অতিথিপরায়ণতা ইসলামি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভ্রমণকারীদের আন্তরিকভাবে সম্মান দিয়ে বরণ করা শুধু নৈতিক কর্তব্য নয়, বরং এটি পর্যটনের মানোন্নয়নের অন্যতম শর্ত। অতিথির প্রতি আন্তরিকতা, সেবা প্রদানে সততা এবং আচার-আচরণে মর্যাদা প্রদর্শন-সবকিছুই ইসলামি মূল্যবোধের প্রতিফলন, যা বাংলাদেশকে পর্যটনের দুনিয়ায় একটি ব্যতিক্রমী ব্র্যান্ড পরিচিতি দিতে পারে।
কর্মীদের ন্যায্য মজুরি, সঠিক মূল্য নির্ধারণ, পরিবেশবান্ধব সেবা এবং সম্পদের অপচয় রোধ-এসবই ইসলামি নীতির বাস্তব প্রয়োগ। তাই ইসলামি মূল্যবোধ শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ নয়, বরং টেকসই পর্যটনের ভিত্তি স্থাপনেও একটি কার্যকর উপায়। যদি বাংলাদেশ পর্যটন খাতে ইসলামি নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারে, তবে এটি বিশ্ববাজারে এক নতুন আস্থা ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। বাংলাদেশে পর্যটন খাতে টেকসই রূপান্তর নিশ্চিত করার জন্য ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষা করে হালাল পর্যটনের প্রসার ঘটানো অপরিহার্য।
বাংলাদেশ যদি পর্যটনে টেকসই রূপান্তর চায়, তবে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি-ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, ডিজিটাল বিপণন এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পর্যটনশিল্পের প্রসারে সবুজ অবকাঠামো নির্মাণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। তৃতীয়ত, কমিউনিটির অংশগ্রহণ-স্থানীয় জনগণকে অংশীদার করে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পর্যটন সুবিধার বণ্টনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থত, কেবল সৈকতকেন্দ্রিক পর্যটন নয়, গ্রামীণ পর্যটন, কৃষি পর্যটন, নদী পর্যটন, হালাল পর্যটন, কুলিনারি ট্যুরিজম ও ইকো-ট্যুরিজমের প্রসারের মাধ্যমে বাজার বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়, প্রতিযোগী দেশের পর্যটন বাজার দখল রোধে, ভ্রমণকারীদের আসল ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা প্রদানের লক্ষ্যে টেকসই রূপান্তর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব পর্যটন দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পর্যটনকে শুধু অর্থনৈতিক খাত নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ার হিসাবে ভাবতে হবে। বাংলাদেশ যদি এ বিষয়ে এখনই যথাযথ নীতি গ্রহণ করে, তবে পর্যটন হবে কর্মসংস্থানের উৎস, বৈদেশিক আয়ের খাত, পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যম এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার শক্তিশালী হাতিয়ার।
অতএব, সময় এসেছে পর্যটন খাতকে শুধু বড় নয়, বরং ভালো করার। টেকসই ও মূল্যবোধভিত্তিক পর্যটনই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সত্যিকারের রূপান্তরের পথ।
ড. কামরুল হাসান : অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়