কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

প্রতিবেশী বাংলাদেশের পরিবর্তন বুঝতে অক্ষম ভারত

এম হুমায়ুন কবির [প্রকাশ: সমকাল, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫]

প্রতিবেশী বাংলাদেশের পরিবর্তন বুঝতে অক্ষম ভারত

গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। ভারত সম্ভবত সেটি ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। এই অক্ষমতার কারণে তারা এসব বিষয় গ্রহণ না করে বরং প্রত্যাখ্যান করার অবস্থানে রয়েছে। ভারতের গণমাধ্যমসহ ক্ষমতার বিভিন্ন অংশ বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরতে একটা ক্যাম্পেইন শুরু করে। তাদের ভাষায়, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নেই; সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নেই ইত্যাদি। 

 

 

 

 

দেশটি জুলাই অভ্যুত্থানকে না বোঝা এবং নেতিবাচক অবস্থান গ্রহণ করার কারণে প্রাথমিকভাবে একটা ধাক্কা খেয়েছে। প্রথম ধাপে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কেবল সরকারি বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ ছিল। শেখ হাসিনা সেখান থেকে আওয়ামী লীগের কর্মীদের উস্কানি দিয়েছেন। সেই সূত্রে মব সহিংসতার শুরু। দ্বিতীয় ধাপে আমরা দেখেছি, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত শেখ হাসিনার ব্যাপারে রায় দিলে তিনি ভারতের গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের উস্কানিমূলক মন্তব্য করেন। ফলে পরিস্থিতি দুটি সরকারের বিবৃতি দেওয়ার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা অন্যদিকে মোড় নেয়। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ভারতের ভূমিকা ইতিবাচকভাবে নেয়নি। তারাও শেখ হাসিনার বিচার চায়। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব আরও জোরালো হয়েছে। 

 
 
 
 
 
 

এখানে একটা ব্যাপার হলো আইনি বাধ্যবাধকতা। চুক্তি অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধী যারা আছেন, বাংলাদেশের আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার একটা বিধান রয়েছে। এ ছাড়া এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শর্ত। যেমন– কোনো কোনো ব্যাপারে এ নিয়মের বাইরে ব্যতিক্রমী শর্তও যুক্ত। এই ব্যতিক্রমের মধ্যে একটা হলো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তারপর আদালতের রায় এবং সেই আদালতের বৈধতা কতটুকু– সেগুলোও বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ব্যাপারেও স্বস্তি না থাকলে ভারত এ ধরনের অপরাধীকে ফেরত নাও পাঠাতে পারে। 

 
 

আরেকটি হলো রাজনৈতিক বিবেচনা। শেখ হাসিনা সাধারণ ব্যক্তি নন; তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তাঁর একটা অবস্থান এবং দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। এ ব্যাপারটা আমরা জানি। কাজেই এখানে ভারতের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় রয়েছে– তারা শেখ হাসিনাকে পাঠাবে কিনা কিংবা পাঠানোটা নিরাপদ মনে করে কিনা। এসব বিষয় তারা বিবেচনায় রাখতে পারে। তা ছাড়া কৌশলগত বিষয়ও আছে। ভারত নিজেদের শক্তিশালী দেশ হিসেবে মনে করে। কাজেই তারা মনে করে, সকল দেশ তাদের সঙ্গে থাকবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো যোগাযোগ বজায় রাখবে। ভারতবিরোধী কোনো ধরনের তৎপরতায় যুক্ত হবে না এবং তাদের স্বার্থে কাজ করবে। এসব পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনাকে ফেরত দিলে অন্যান্য দেশ কী ভাববে এবং অন্যান্য দেশের কাছে ভারতের ভাবমূর্তি কোনোভাবে ক্ষুণ্ন হবে কিনা– এসব বিষয় তাদের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

শেখ হাসিনা ভারতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং তিনি যথেষ্ট ভারতের স্বার্থে কাজ করেছেন। এটা তারাও জানেন এবং শেখ হাসিনা নিজেও কিছুটা জনসমক্ষে তা তুলে ধরেছেন। সুতরাং এগুলোর আলোকে ভারতকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশে ইতোমধ্যে একটি রায় এসেছে তাই সরকারও শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে চায়। আমার ধারণা, বাংলাদেশের সাধারণ জনগণও চায়, তিনি যে অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন সেটি যেন বাস্তবায়ন হয়।

 

 

সাম্প্রতিক হাদি হত্যাকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কে সংকট আরও তীব্র করে তুলেছে। এটি সত্য যে, হাদি একজন শক্তিশালী ভারতের আধিপত্যবিরোধী কণ্ঠস্বর ছিলেন। তার এই জোরালো অবস্থান নিঃসন্দেহে ভারতকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছিল এবং আওয়ামী লীগও একটু বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। কারণ হাদি বেশ জোরালো ও উচ্চকণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন। সেই কথাগুলো সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে বেশ প্রভাব ফেলছিল। পুলিশ ইতোমধ্যে জানিয়েছে, আততায়ীরা ভারতে আছে। 

 

 

আরেকটি বিষয় এখানে বলে রাখা জরুরি। ১৯৭১ সালে আমরা নিজেদের স্বাধীন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি। ভারত যুদ্ধ করেছে পাকিস্তানকে হারিয়ে দেওয়ার জন্য। ফলে এখানে দুই দেশের লক্ষ্যের মধ্যে সাযুজ্য থাকলেও কিছু সূক্ষ্ম ব্যাপার রয়েছে। ভারত ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের বিজয় হিসেবে উদযাপর করে। অন্যদিকে আমরা এটি আমাদের বিজয় হিসেবে উদযাপন করি। এখানে বড় রকমের ফারাকও দেখা দেয়, যা স্বাভাবিকভাবেই একটা বড় বিতর্কের সৃষ্টি করে। তবে আমি মনে করি, আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েছি এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের বিজয় উদযাপন করা উচিত। 

 

 

এই সংকটের মধ্যেও আমরা আশা ছাড়তে পারি না। কারণ সম্পর্কের উন্নয়ন জরুরি। নিকট প্রতিবেশী, ঐতিহাসিক ও ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক, পারস্পরিক নির্ভরশীলতাসহ বিভিন্ন কারণে দুই দেশের সম্পর্ক এ রকম থাকাটা কাম্য নয়। দুই দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য কিছু নিয়ম রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দুই দেশের দায় আছে। কাজেই সেই কথাটা মাথায় রেখে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য দুই পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, দ্বিপক্ষীয় সংকটে দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হতে ভারত অন্তত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে, তাহলেও দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে ভারত ভেবে দেখার একটা কথা বলেছিল। শেখ হাসিনার ফেরত পাঠানো কিংবা ওসমান হাদির হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে তাদের দেশে পাঠানোর জন্য যদি ভারত সহায়তা করে, তাহলেও একটা সম্পর্কোন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে। 

এম হুমায়ুন কবির: সাবেক রাষ্ট্রদূত