কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

প্রসঙ্গ এলডিসি উত্তরণ

ড. মিহির কুমার রায় [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

প্রসঙ্গ এলডিসি উত্তরণ

‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন : চ্যালেঞ্জেস অ্যাহেড’ শীর্ষক সম্মেলনের আয়োজন করে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশ, যার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে এফবিসিসিআই, ডিসিসিআই, এমসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএসহ দেশের প্রধান বাণিজ্য সংগঠনগুলো। তারা এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের সময়সীমা ৩-৫ বছর পিছিয়ে দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারানো, ওষুধ ও তৈরি পোশাক শিল্পের সংকট মোকাবিলা এবং বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠার প্রস্তুতির জন্য এই অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন।

 


জাতিসংঘের তিনটি মানদণ্ড- মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক- দুই দফা পর্যালোচনায় পূরণ করায় বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এই অর্জন জাতির জন্য গর্বের হলেও সঠিকভাবে মোকাবিলা না করলে তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বয়ে আনতে পারে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের মতো প্রধান বাজারগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল হতে পারে, যার ফলে রপ্তানি ৬-১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) অধীনে প্রাপ্ত বিশেষ সুবিধা, যেমন রপ্তানিতে ভর্তুকি এবং মেধাস্বত্ব আইনের [ট্রিপস] ছাড়, বন্ধ হয়ে যাবে।

 

 

 

এছাড়া সহজ শর্তের বদলে বাংলাদেশকে বাজারভিত্তিক হারে ঋণ নিতে হবে, যা ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়াবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের ওষুধ ও তৈরি পোশাক শিল্প। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বর্তমানে স্থানীয় চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ করে এবং ১৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করে। মেধাস্বত্ব চুক্তিতে ছাড় পাওয়ার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। কিন্তু উত্তরণের পর এই সুরক্ষা উঠে গেলে ক্যান্সার ও এইচআইভির মতো জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ ‘ইমাটিনিব’-এর মাসিক খরচ ৩০-৪০ ডলার থেকে বেড়ে ২-৩ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮১ শতাংশের বেশি জোগান দেওয়া তৈরি পোশাক খাতকেও (আরএমজি) কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং কঠোর কমপ্লায়েন্স আইন এই খাতকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। 

 

 


স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৮ সালে। চূড়ান্তভাবে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতির সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালে। কিন্তু কভিডের কারণে অতিরিক্ত সময় পাওয়া যায় দুই বছর। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা বাংলাদেশের। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন সময় এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছে দেশের ব্যবসায়ী মহল। গত ২৪ আগস্ট দেশের শীর্ষ ১৬টি বাণিজ্য সংগঠনের নেতারা উত্তরণ তিন থেকে পাঁচ বছর পিছিয়ে দিতে বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এ মুহূর্তে এলডিসি উত্তরণ পেছানোর কোনো উদ্যোগ তাদের নেই। চলতি বছর ১৩ মার্চ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে সিদ্ধান্ত হয়, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারিত সময়েই এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হবে। এ প্রক্রিয়া মসৃণ করতে কৌশল বাস্তবায়নে গঠিত হয় স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) কমিটি।  কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন এ মুহূর্তে এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া পেছানোর কোনো উদ্যোগ নেই। যতটুকু সময় হাতে আছে তার মধ্যে চেষ্টা চালিয়ে সময় বাড়ানো যাবে কি না, সেটাও একটা বিষয়।

 

 

আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্যারিফের পরে সারা বিশ্ব অনেক বেশি কম্পিটেটিভ হয়ে গেছে। সেখানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক রূপান্তরের পরও প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ শতাংশের কাছাকাছি, যা কম নয়। রপ্তানি বেড়েছে ৮ শতাংশের বেশি। রেমিট্যান্স বেড়েছে। কাজেই সময় পেছানোর জন্য দৃঢ় যুক্তি দেয়া বাংলাদেশের জন্য হয়তো কঠিন হবে। আমাদের একটা যুক্তিই তুলে ধরা যেতে পারে, সেটা হলো আমাদের ভালো প্রস্তুতি নেই। এই যুক্তিটা যথেষ্ট হবে কিনা তা প্রচেষ্টা চালিয়ে না গেলে বোঝা যাবে না। জাতিসংঘের বিধিবিধানের কারণে এলডিসি উত্তরণে আমাদের নৈতিক বাধ্যবাধকতা আছে। এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। যদি থাকেও তাতে আমাদের দিক থেকে এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়া উচিত হবে না।  এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে দেশের আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বেশি ঋণ নেয়ার সক্ষমতা বাড়তে পারে।

 

 

সেক্ষেত্রে অবশ্য গুনতে হবে বেশি সুদ। এছাড়া অর্থনৈতিক সক্ষমতায় উত্তরণের কারণে আকৃষ্ট হতে পারে বিদেশী বিনিয়োগ। সংশ্লিষ্ট সরকারি একটি সূত্র বলেছেন, এখন পর্যন্ত উত্তরণ পেছানোর আনুষ্ঠানিক কোনো পদক্ষেপ নেই। অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসায়ীরা সরকারকে রাজি করানোর চেষ্টা করছে। একটা ধারণা ছিল এটা পেছানো যাবে না। কিন্তু জানা গেছে দুই-একটি শক্তিশালী যৌক্তিক ভিত্তি দেখাতে পারলে জাতিসংঘ বিবেচনায় নিতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত কর্তাব্যক্তিদের মতামত শুনে বোঝা গেছে পেছানোটা অসম্ভব কিছু না। সরকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে কিনা এটা বলা যাচ্ছে না। যথাযথ পর্যায়ে আলোচনা হলে সেটা বলা যাবে। তবে সে ধরনের কোনো আলোচনার উদ্যোগ রয়েছে বলে এমন কথা নয়। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় মনে করছে সরকারের উচিত পেছানোর জন্য একটা পদক্ষেপ নেয়া, সেই জন্য তারা সরব হয়েছে। এখন সরকারের নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নেবেন।

 

 


এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বিষয়ে মূল সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েশন ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর হবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলাদেশ যদি এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছাতে চায়, তাহলে সিডিপির কাছে আবেদন করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কী কারণে বাংলাদেশ এমনটা চাচ্ছে সেটার যুক্তিসংগত কারণ দাঁড় করাতে হবে। ২০২১ সালে যখন বাংলাদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তখন মাথাপিছু আয় বা মানবসম্পদ সূচক বা অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার সূচক- সব সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান এলডিসি উত্তরণকে সমর্থন করছিল। ফলে উত্তরণের সুপারিশ করা হয়। এখন বাংলাদেশ যদি পেছানোর আবেদন করে, তাহলে তা বিচার করা হবে সেই সূচকগুলোর সাপেক্ষে। বাংলাদেশ বলতে পারে যে আমাদের দেশে বড় পরিবর্তন হয়েছে। আমরা প্রস্তুতি নিতে পারিনি। তাই আরও সময় দরকার। আমরা উত্তরণ হলেও তা টেকসই করতে পারব না। এগুলো নিয়ে যুক্তি দাঁড় করিয়ে বাংলাদেশ সিডিপি বরাবর আবেদন করতেই পারে। সেটা তারা বিবেচনা করবে। তারপর ইকোসক (ইউনাইটেড নেশনস ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিল) হয়ে সাধারণ পরিষদের কাছে যাবে।’

 

 


অনেকে মনে করেন যত দ্রুত আমরা এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েট করব তত বেশি উন্নয়ন সক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারব। নিঃসন্দেহে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা বাড়বে। এর অর্থ হচ্ছে, আমাদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে অর্থনীতি, সমাজনীতি, সৃজনশীলতা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সক্ষমতা বাড়ানো গেলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো একটা অবস্থান তৈরি হবে। আবার যদি গ্র্যাজুয়েশন দুই-তিন বছর পেছানো যায় তখন আমাদের তিন বছর পর সক্ষমতা কিন্তু বাড়াতে হবে।

 

 

 

 কাজেই যেক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, সেক্ষেত্রে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দিয়ে তেমন কোনো লাভ হবে না।একটি গোষ্ঠী বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দেয়ার দাবি তুলেছে। কিন্তু আমাদের মতো বেশ কয়েকটা দেশ গ্র্যাজুয়েশন করে যদি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে, তখন আমরা কেন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারব না? প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। আমাদের যে ধরনের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার, তার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করতে হবে।

 

 

 স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা বর্তমানে পাই এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর সেগুলো না পেলেও আমাদের সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই যদি আমরা উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে চাই। কাজেই এ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যত শীঘ্রই আমরা প্রচেষ্টা নেব, তত তাড়াতাড়ি দেশের অর্থনৈতিক চেহারা পরিবর্তনে সক্ষম হব।

 

 


এসব বিবেচনায় রেখে করণীয়গুলো ঠিক করতে হবে। সে অনুযায়ী কার্যপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা দরকার। দেশি ও বিদেশি সহায়তায় কার্যপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে, যাতে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকতে পারি। এখন আমাদের জন্য একটা সুযোগ আছে। কারণ বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্কের একটি অসম প্রতিযোগিতা ছিল। আমরা সে অবস্থান থেকে অনেকটাই বেরিয়ে আসতে পেরেছি। এ সুযোগে যদি দক্ষতা বৃদ্ধি করা যায় তাহলে অসুবিধা হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং আমরা যত দ্রুত এক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার চেষ্টা করব, তত দ্রুত এর সফলতা লাভ করতে পারব। সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। তাই এসব মাথায় রেখেই কার্যপরিকল্পনা নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দিকে নজর দেয়া উচিত।

 


লেখক : অর্থনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক ও সাবেক ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ
সিটি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা