কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

পররাষ্ট্রনীতিতে আঘাত-প্রতিঘাত নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই কাম্য : মোহাম্মদ আবু নোমান

পররাষ্ট্রনীতিতে আঘাত-প্রতিঘাত নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই কাম্য : মোহাম্মদ আবু নোমান

ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্র জেদের বশবর্তী হয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তা সর্বশেষ আত্মঘাতীই হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক যেমন অত্যন্ত ব্যাপক, বিস্তৃত, বহুমাত্রিক, তেমনি গভীর ও জটিল। ঘনিষ্ঠতম দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বর্তমান সম্পর্ক গুরুতর সংকটে।

 

 

বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্যে টানাপড়েনে, ক্ষতিগ্রস্ত কারা? আর লাভবানই কারা? গত ৮ এপ্রিল হুট করে ভারত সরকার ২০২০ সালে বাংলাদেশকে দেয়া ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়, যার মাধ্যমে ভারতের স্থল শুল্ক স্টেশন, বিমানবন্দর এবং সমুদ্রবন্দর দিয়ে তৃতীয় দেশে রপ্তানি পণ্য পরিবহনের সুযোগ ছিল বাংলাদেশের। ফলে ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানির সুবিধা হারায় বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশের এমন একতরফা পদক্ষেপকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছি আমরা। দিল্লির এ ধরনের সিদ্ধান্তের জবাব বাংলাদেশও দিতে শুরু করেছে।

 

 

দিল্লি যেমন আঘাত করছে, বাংলাদেশও তেমনি ভারতকে চোখে আঙুল দিয়ে তার জবাব দিয়েছে। গত ১৫ এপ্রিল ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করেছে বাংলাদেশ। এতদিন বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা, বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির সুযোগ ছিল। ভারত বাংলাদেশের বর্তমান উত্তেজনা কেবল দ্বিপাক্ষিক, বাণিজ্যিক সম্পর্ককেই হুমকিতে ফেলছে না; বরং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে বলে আমরা মনে করছি।

 

 

ভারতের সঙ্গে আমাদের বড় সমস্যা হলো, দিল্লির সঙ্গে সব রকম বাণিজ্য এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতামূলক চুক্তিগুলো প্রায়ই বাংলাদেশের জন্য ভারসাম্যহীন, একপাক্ষিক এবং অসম চুক্তি বলে তীব্রভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও সমালোচিত। ভারত তার নিজস্ব কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে ইকুয়্যাল লেভেলের চেয়ে নিজের অধিক সুবিধাজনক অবস্থানকে চরম স্বার্থপরতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করে থাকে; অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রাপ্ত দৃশ্যমান সুবিধাগুলো থাকে সামান্যই। যার কারণে আমাদের দেশে ভারতবিরোধী মনোভাব অনেকের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত।

 

 

জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক হিমশীতল অবস্থায় পৌঁছে। এখন নতুন করে সংখ্যালঘু ইস্যু তুলে দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশ দুটির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কেও টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ঘোলাটে হয় চিš§য় দাসকে গ্রেফতারের পর। তাকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ভারতের একাধিক স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। এছাড়া গত ২ ডিসেম্বর ত্রিপুরার আগরতলায় অবস্থিত বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় শক্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ। শুধু প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বাংলাদেশ বসে থাকেনি। ঘটনার একদিন পর ভারতীয় হাইকমিশনারকে ডেকে ক্ষোভ জানিয়েছে ঢাকা।

 

 

আমরা মনে করি, কোনো দেশের সঙ্গেই বাণিজ্যিক সম্পর্কের ব্যাপারে রাজনীতি আনা ঠিক হবে না। যারা প্রতিযোগিতামূলক মূল্য দেবে, দ্রুত দেবে এবং মানসম্মত পণ্য দেবে, তাদের থেকেই আমরা পণ্য আনব। সেটা ভারত, চীন, মিয়ানমার বা ভিন্ন দেশ হতে পারে। আসলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য খাতিরে হয় না; প্রয়োজনে হয়। যার যেখান থেকে ইচ্ছা আমদানি করবে, যেখানে ইচ্ছা রপ্তানি করবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাও তা-ই বলছে।

 

 

সব দেশই নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। সবার সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে কিভাবে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে তারই পরিকল্পনা করা জরুরি।

 

 

স্বাধীনতা পরবর্তী সব সরকারের সাথেই ভারতের একটি স্থিতিশীল, ইতিবাচক, গঠনমূলক ও স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিলো। একথা জোর দিয়েই বলা যায় আগামীতেও নির্বাচনের মধ্যেমে যারা বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসবে তারাও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখবে। মাঝখানে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করার ফল এ দেশের জনগণকেই ভোগ করতে হবে। বাংলাদেশের শান্তি, নিরাপত্তা, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের বিশ্বাস, একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ভারতের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ ভারত বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে দু’দেশের জনগণের অভিন্ন আকাঙ্খা পূরণে বাংলাদেশ ও ভারতকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এ অংশীদারিত্ব উভয় দেশের সাধারণ মানুষের জন্য উপকার বয়ে আনবে। প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং উন্নয়নের পথ একে অপরের সঙ্গে জড়িত এবং একে অপরের সঙ্গে অনেক বেশি নির্ভরশীলতার সাথে একে অপরকে অনেক কিছু দেয়ার আছে; যদি দুটি দেশ একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে, বাস্তবসম্মত ও গঠনমূলকভাবে জড়িত থাকতে পারে। পাশাপাশি দুটি রাষ্ট্র হিসেবে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, সুবিধা, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, পরিবহন ও জ্বালানি সংযোগ এবং জনগণের মধ্যে সম্পৃক্ততা ইতোপূর্বে যে ইতিবাচক গতি বজায় ছিল, তা প্রমাণ করে আমাদের সম্পর্ক সত্যিই বহুমুখী এবং একক কোনো এজেন্ডা, দল [আওয়ামী লীগ] বা ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। কিছু বিরক্তিকর বিষয় থাকলেও দুই দেশকে সহাবস্থানমূলক চিন্তা-ভাবনাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

 

 

যদিও ভারতীয় সরকারি সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে, নিজেদের বিমানবন্দর ও স্থল বন্দরের জট কমাতে বাংলাদেশকে দেয়া ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করেছে ভারত। ট্রান্সশিপমেন্ট হলো- এমন একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া, যেখানে একটি দেশ তার পণ্য সরাসরি গন্তব্য দেশে না পাঠিয়ে মাঝপথে অন্য একটি দেশের বন্দর ব্যবহার করার মাধ্যমে রপ্তানি করে। একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পণ্য আমদানিও করা হয়। ২০২০ সালের ২৯ জুন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি হয়। নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের কোনো প্রভাব পড়বে না বলে ভারত সরকার আশ্বস্ত করেছে। যদিও দেশটির একাধিক সংবাদমাধ্যমে এর আগে বেশ ফলাও করে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ভারতের সেভেন সিস্টার্স নিয়ে মন্তব্য করার পর ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করেছে তাদের সরকার।

 

 

ভারত ও বাংলাদেশ এমন একটি সম্পর্ক মিউচুয়ালি করে, তা যেমন জটিল তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের লড়াইয়ে ভারত রাজনৈতিক, সামরিক এবং মানবিক সহায়তা প্রদান করে। এই সহায়তা শুধুমাত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করেনি, বরং দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটি ভিত্তি তৈরি করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় করে এবং বাণিজ্য, সংযোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করে।

 

 

তবে শেখ হাসিনার সময় ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। যার ফলে ২০২৩-২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা তিনটি বড় ভারতীয় বিমানবন্দর- কলকাতা, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুকে তৃতীয় দেশে রপ্তানির জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করে আসছে, যা পশ্চিমা বাজারে বাংলাদেশের পণ্যগুলোকে ব্যাপক প্রতিযোগিতামূলক করেছে।

 

 

যদিও বিশ্লেষকরাও বলছেন, ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশের তেমন কোনো সমস্যা হবে না। কারণ বাংলাদেশ এই সুবিধা খুব বেশি ব্যবহার করতো না। তাছাড়া, বাংলাদেশ ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানেই বেশি পণ্য রপ্তানি করে। ভারত বলেছে, এই দুই দেশে পণ্য রপ্তানিতে ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিলের প্রভাব পড়বে না। মূলত, ভারতের বিমানবন্দর ব্যবহার করে ইউরোপ-আমেরিকায় তৈরি পোশাকসহ ‘সামান্য কিছু পণ্য’ রপ্তানি করত বাংলাদেশ।

 


এখন সে সুবিধাটুকুই বন্ধ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কারণীয় কী তা এখনই খোঁজা দরকার। বাংলাদেশ যেহেতু আমদানিমুখী, তাই কোনো একটি দেশের ওপর বেশি নির্ভরশীল না হয়ে সময় থাকতেই বিকল্প উৎস খুঁজে দেখতে হবে।

 

 

এছাড়া সম্পর্ক খারাপ হয় এমন সব কার্যক্রম ভারতকে পরিহার করতে হবে। যেমন অভিন্ন নদীতে অবৈধ বাধ নির্মাণ, সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ইত্যাদি। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। বহু বছরের আলোচনা সত্ত্বেও ভারত একটি ন্যায্য ব্যবস্থা চূড়ান্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষি ও পরিবেশগত বিষয়ে চরম পানির সংকট তৈরি করেছে। এই পানি বণ্টনে অসমতার ধারণা জনসাধারণের অসন্তোষকে উসকে সঙ্গে দিয়েছে। ভারতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।

 

নিজের দেশে ঈদের নামাজ পর্যন্ত পড়তে দেয়া হয় না, মুসলিম শহর-রাস্তার নামগুলো পরিবর্তন করে চলছে, বুলডোজার দিয়ে মুসলমানদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, সীমাহীন অত্যাচার চলছে ভরতের মুসলমানদের ওপর। তারা আবার বাংলাদেশের সংখ্যালঘুর মিথ্যা ইস্যু নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে! বর্তমানে আইন করে মুসলমানদের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার পাঁয়তারা চলছে। অথচ বাংলাদেশে সব ধর্ম বর্ণের মানুষ মিলেমিশে আছে। ভারতের উচিত আওয়ামী লীগকে পৃষ্ঠপোষকতা না করে, বাস্তবতার নিরিখে দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে চেষ্টা করা। এখন খুব গণতন্ত্র, ভোটের কথা কথা মনে পড়ছে। অথচ গত ১৫ বছর গণতন্ত্র কবরের সঙ্গে শেখ হাসিনার অবৈধ ক্ষমতার অকুণ্ঠ সমর্থক ছিল ভারত। ভারত ও ভারতীয় মিডিয়াকে অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

 

 

লেখক: সাংবাদিক