কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

প্রকৃতিক সম্পদ : নদীতে লুকানো খনিজ অবহেলায় পড়ে থাকবে?

শেখ আফনান বিরাহীম [প্রকাশ : সমকাল, ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ]

প্রকৃতিক সম্পদ : নদীতে লুকানো খনিজ অবহেলায় পড়ে থাকবে?

বাংলাদেশের নদী কেবল কৃষি ও জীবিকার উৎস নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন এক খনিজ ভান্ডার, যা আমাদের অর্থনীতির নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার চরে মূল্যবান খনিজ ইলমেনাইট, রুটাইল, গারনেট, জিরকন, কায়ানাইট ও ম্যাগনেটাইটের  উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঠ সমীক্ষার ভিত্তিতেই এ তথ্য উঠে এসেছে।

 

 

যে কোনো সভ্যতার জন্য নদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আমরা সবাই জানি। নদী দিয়ে বাণিজ্যপথ তৈরি হয়েছে; নদীর পলি এনেছে জমিতে উর্বরতা। এমনকি শিল্প-সাহিত্যেও এসেছে নতুন দিগন্ত এই নদীর মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান সময়ের আলোচনায় নদী মানেই দখল-দূষণ, জলাবদ্ধতা ও অনিয়ন্ত্রিত ভরাট। সেই শোরগোলের মধ্যে আমরা ভুলে যাই এই স্রোত হিমালয়ের পাদদেশ থেকে নামতে নামতে বিপুল খনিজবহুল পলি বয়ে আনে, যার একটি অংশ ধীরে ধীরে জমা হয় চরের বালুতে বা উপকূলে। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা ও ভারত এ ধরনের বিচ-প্লেসার ডিপোজিটকে বহু আগেই প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানিযোগ্য পণ্যে পরিণত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে তা এখনও মূলত আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে উপকূলের সোনাদিয়া-মহেশখালী অঞ্চলের সাম্প্রতিক গবেষণা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, যেখানে ডিউন স্যান্ড, ফোরশোর ও ব্যাকশোরে ভারী খনিজের উপস্থিতি, দানা-বণ্টন ও সম্ভাব্য মজুতের প্রাথমিক হিসাব নথিবদ্ধ। 

 

 

বাংলাদেশে চিহ্নিত খনিজগুলোর মধ্যে ইলমেনাইট ও রুটাইল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো থেকে উৎপাদিত টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড রং, প্লাস্টিক, কাগজের আবরণ এবং বিশেষ ধাতু মিশ্রণের জন্য অপরিহার্য কাঁচামাল। জিরকন সিরামিক, কাচ ও ঢালাইয়ের কাজে উচ্চ তাপ-সহনীয়তা তৈরি করে এবং উৎপাদিত পণ্যে চকচকে চেহারা এনে দেয়। কেটে পলিশ করলে আধা-মূল্যবান রত্ন হিসেবেও তা মানায়। গারনেট জেট-কাটিং ও পলিশে অসাধারণ অ্যাব্রেসিভ (মসৃণ করার কাজে ব্যবহৃত পদার্থ) হিসেবে এবং গহনা তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। মোনাজাইটে থাকে দুর্লভ উপাদান, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানির টারবাইন থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিকসে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাগনেটাইট লোহা-ইস্পাতশিল্পের কাঁচামাল, আর কায়ানাইট রিফ্র্যাক্টরি ইট ও বিশেষ সিরামিকে দরকারি।

 

 

অবকাঠামো নির্মাণ, পেইন্ট-প্লাস্টিক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারের সঙ্গে এসব খনিজের চাহিদা বাড়ছে। ফলে কাঁচা বালু বিক্রির বদলে খনিজ পৃথক করা, শোধন ও ব্র্যান্ডিংভিত্তিক রপ্তানির সুযোগও বহু গুণ। বাংলাদেশের শিল্পনীতির জন্য এটি এক অনন্য দরজা। শুধু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই দরজায় পা বাড়াতে প্রস্তুত?

 

 

গবেষণায় উপকূল ও নদের বালুতে বহু স্থানে ওজনের হিসাবে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত ভারী খনিজের ঘনত্ব ধরা পড়েছে। এ ধরনের মান অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় প্রেক্ষাপট তৈরি করে; একই সঙ্গে বার-সেডিমেন্টভিত্তিক কাজ, বিশেষ করে বড় নদীগুলোর বালুচরে, বিরল মাটির উপাদানসমৃদ্ধ মোনাজাইট, জিরকন ও অ্যালানাইটে সিই, এলএ, এনডি, থোরিয়ামের ইঙ্গিত তুলে ধরেছে।

 

 

এ ক্ষেত্রে অবশ্য প্রতিবন্ধকতাও বেশ বড়, যা উপেক্ষা করলে বড় ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি আছে। ভূ-আকৃতিগতভাবে আমাদের মজুত ছড়ানো-ছিটানো ও সূক্ষ্ম দানাদার; দ্রুত স্রোত, মৌসুমি বন্যা ও নদীর চরের পরিবর্তনও অনিশ্চিত। তাই স্থায়ী অবকাঠামো গড়া কঠিন, সেই সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকিও তীব্র। নদীতীর ক্ষয়, মোহনা ও বালুময় দ্বীপের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র, উপকূলে লবণাক্ততার অগ্রগতি এসব উপেক্ষা করে কোনো প্রকল্প টেকসই হবে না। প্রযুক্তি ও দক্ষতার ঘাটতিও প্রকট। খনিজ উত্তোলনের জন্য উন্নত গ্র্যাভিটি, চৌম্বক ও ইলেকট্রোস্ট্যাটিক সেপারেশন, ভ্যাকুয়াম-মিনারেল প্রসেসিংয়ের জন্য বিশেষায়িত প্লান্ট ও মানবসম্পদ দরকার।

 

 

 

সব শেষে আছে নীতিগত শূন্যতা: খনিজ খননের অস্পষ্ট নীতিমালা, লাইসেন্সিং, কমিউনিটি কনসেন্ট, পরিবেশ ক্ষতিপূরণ ও ডিকমিশনিং স্ট্যান্ডার্ড ছাড়া ভুল বিনিয়োগ শুধু ক্ষতি বাড়ায়।

 

 

এই প্রেক্ষাপটে দেশীয় শিল্প কৌশল নিয়ে অভিনব কিন্তু বাস্তববাদী পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমে দরকার উচ্চ রেজল্যুশন সেডিমেন্ট ম্যাপিং ও খনিজ ঘনত্বের টাইম সিরিজ ডেটাবেজ, যাতে বর্ষা-শুষ্ক মৌসুমের ওঠানামা ধরা পড়ে। এই কাজ জিওলজিক্যাল সার্ভে ও বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাগারের যৌথ উদ্যোগে হতে পারে। পরবর্তী ধাপে কক্সবাজার-মহেশখালী বা খুলনা-পায়রা অঞ্চলে একটি পাইলট মিনারেল সেপারেশন প্লান্ট স্থাপন করে ইলমেনাইট-রুটাইল-জিরকনের কনসেনট্রেট (ঘনীভূত রূপ) উৎপাদন করা যেতে পারে, যা দেশীয় সিরামিক, কাচ ও পেইন্ট শিল্পে পরীক্ষামূলক ব্যবহার করা হবে এবং সফল হলে ধাপে ধাপে তা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি রেসপন্সিবল মিনারেল ইনিশিয়েটিভ মানদণ্ডে পরিবেশ মূল্যায়ন, তীর রক্ষার ব্যবস্থা, আবাসস্থল পুনর্গঠন ও কমিউনিটি বিনিয়োগকে বাধ্যতামূলক করা উচিত। এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প-সরকারের ত্রিপক্ষীয় অংশীদারিত্বে বাংলাদেশ মিনারেল স্যান্ডস কনসোর্টিয়াম জাতীয় কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা গঠন ও রপ্তানি ব্র্যান্ডিং একসঙ্গে এগোবে।

 

 

এ ধরনের খনিজভিত্তিক মূল্যশৃঙ্খল তৈরি হলে আমদানিতে সাশ্রয় হবে, বৈদেশিক মুদ্রায় আয় বাড়বে এবং আঞ্চলিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

 

 

সিরামিক ও কাচশিল্পের জন্য জিরকন-ফ্লাওয়ার; পেইন্ট শিল্পের জন্য টাইটানিয়াম-ডাই-অক্সাইড-গ্রেড রুটাইল; ওয়াটার-কাটিং ও পলিশ শিল্পের জন্য গারনেট ইত্যাদির দেশীয় উৎপাদন শুরু হলে আমাদের শিল্পনীতি নতুন গতি পাবে। তা ছাড়া বিরল মাটির উপাদান সমৃদ্ধ মোনাজাইটের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতে কৌশলগত সুবিধা এনে দিতে পারে। বিশ্বব্যাপী জোগান সংকটের সময় এটা কূটনৈতিক সম্পদে রূপ নিতে পারে।

 

 

আমাদের উপকূলীয় বেল্ট ও দ্বীপাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই বিচ স্যান্ডে ভারী খনিজের উপস্থিতি নথিভুক্ত করা রয়েছে। এসব খনিজের প্রাথমিক রিজার্ভ অনুমান ও খনিজ ধরনও তালিকাভুক্ত, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি কার্যকর প্রারম্ভিক মানচিত্র হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র-পদ্মা অঞ্চলে সাম্প্রতিক মাঠ সমীক্ষায় নতুন তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে খনিজের ঘনত্ব ও বাছাই পদ্ধতির কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে; এমনকি পদ্মা নদীর বার-সেডিমেন্টে ভারী খনিজের উচ্চ ঘনত্ব নিয়ে নতুন সমীক্ষাও প্রকাশিত।

 

 

এখানে মুক্তার প্রসঙ্গও আনা যায়। কারণ এটি দেখায় জলের ভেতরেও সম্পদের জন্ম হয়। স্বাদুপানির ঝিনুকে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী গোলাপি মুক্তা এক সময় চট্টগ্রাম-কুমিল্লা অঞ্চল ঘিরে ক্ষুদ্র কিন্তু পরিচিত বাজার তৈরি করেছিল। আজও সঠিক সহায়তায় মুক্তা চাষ গ্রামীণ নারীর আয় বাড়াতে পারে এবং জল সংরক্ষণ সংস্কৃতির সঙ্গে শিল্পনীতির সহাবস্থান সম্ভব করে তুলতে পারে। খনিজ শিল্পে যেমন প্রযুক্তিনীতির ভারসাম্য দরকার, মুক্তা চাষেও তেমনি পরিবেশ সহনশীলতা ও শিল্পটির ওপর জ্ঞান রাখা অপরিহার্য।

 

 

শেষ কথায় আসি। আমরা কি নদীর বুকে লুকিয়ে থাকা এই সম্পদকে শুধু ট্রাকে তুলে বন্দরে পাঠিয়ে দেব, নাকি দেশেই প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের পণ্য বানাব? উত্তর নির্ভর করবে সাহসী কিন্তু সতর্ক নীতিনির্ধারণ, গবেষণায় বিনিয়োগ ও জনস্বার্থ রক্ষায় আপসহীনতার ওপর। নদী কেবল জলধারা নয়; এক চলমান তহবিল। এখানে বিনিয়োগ করলে তার সুফল অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে যুক্ত হবে। আমরা কি এই তহবিলের তালা খুলতে প্রস্তুত?

 

 

শেখ আফনান বিরাহীম: গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স অব কম্পিউটিং সায়েন্সে অধ্যয়নরত