কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা প্রয়োজন

বিধান চন্দ্র দাস [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা প্রয়োজন

প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ ভ্রমণপিপাসু। প্রাচীন মিসরে (খ্রি.পূ. ২৭০০—২২০০) পিরামিড, মন্দির, নীলনদের তীর; প্রাচীন গ্রিসে (খ্রি.পূ. ৭৭৬) অলিম্পিক গেমস, ডেলফি মন্দির, এথেন্সের পার্থেনন এবং পরবর্তী  সময়ে মধ্যযুগে (৫ম—১৫শ শতক) বিভিন্ন তীর্থস্থানে মানুষের ভ্রমণের কথা ইতিহাস থেকে জানা যায়। প্রাচীন কালে ভারতীয় উপমহাদেশেও ব্যবসা-বাণিজ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা এবং তীর্থস্থানকেন্দ্রিক ভ্রমণ করার কথা দেশি-বিদেশি লেখকদের লেখায় পাওয়া যায়। পনেরো থেকে সতেরো শতকে ইউরোপে ‘আনন্দ ভ্রমণ’ ধারণার জন্ম হয়।

 

 


সতেরো থেকে উনিশ শতকে ইউরোপে ‘গ্র্যান্ড ট্যুর’ (কয়েক বছরের ট্যুর) বিষয়টি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আঠারো শতকে সংঘটিত শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে ইউরোপে অবকাশ যাপনের সুযোগকে কেন্দ্র করে ‘পর্যটনশিল্প’ গড়ে উঠতে থাকে। বিশ শতকে বিমান আবিষ্কার (১৯০৩) এবং সেই শতকের মাঝামাঝি আন্তর্মহাদেশীয় বিমানযাত্রা ব্যবস্থা নিয়মিত চালু হলে পর্যটনশিল্প অতিদ্রুত বিকাশ লাভ করতে থাকে। সেই সঙ্গে রেল, নৌযান এবং বিলাসবহুল বাসে করেও পর্যটনশিল্পের প্রসার ঘটে।

 

 

বর্তমানে এই একুশ শতকে পর্যটনশিল্প বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছে। জার্মানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘স্ট্যাটিস্টা’ অনুসারে—২০২৩ সালে সারা পৃথিবীর মোট জিডিপির প্রতি দশ ডলারের মধ্যে এক ডলারই এসেছে ভ্রমণ ও পর্যটন খাত থেকে। কর্মসংস্থান, দর্শনীয় স্থানের উন্নয়ন, স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার ইত্যাদি বিষয় পর্যটনকে কেন্দ্র করে বিকশিত হতে দেখা যায়।
এ তো হলো মুদ্রার এক পিঠের ছবি।

 

 


অন্য পিঠের ছবি উদ্বেগের এবং আশঙ্কার! পৃথিবীর বহু জায়গার পর্যটনকেন্দ্র/দর্শনীয় স্থান পর্যটক চাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেসব পুনরুদ্ধারের জন্য পর্যটক প্রবেশ অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। যেমন— থাইল্যান্ডের মায়া বে, ফিলিপিনের বরাকায় দ্বীপ, কম্বোডিয়ার অ্যাংকর মন্দির কমপ্লেক্স, আইসল্যান্ডের ফিয়াড্রারগ্লিউফুর গিরিখাত, কালিফোর্নিয়ার (যুক্তরাষ্ট্য) ওয়াকার গিরিখাত ইত্যাদি অস্থায়ীভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। আবার গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কিছু দ্বীপ ও সমুদ্র এলাকা, ফ্রান্সের ল্যাক্সো গুহার মূল অংশ, চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাভচিত্স্কা ব্রানা (বালু-পাথরের খিলান), আইসল্যান্ডের সার্তসে দ্বীপ ইত্যাদি দর্শনীয় স্থানগুলো পর্যটকদের জন্য স্থায়ীভাবে বন্ধ কিংবা প্রবেশে কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে।

 


পর্যটনকেন্দ্রিক সমস্যাগুলোকে মোকাবেলা এবং পর্যটনের বহুমাত্রিক গুরুত্বের স্বীকৃতি দিতে, বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং সু-স্থায়ী ভবিষ্যতের জন্য দায়িত্বশীল ভ্রমণকে উৎসাহিত করতে ১৯৮০ সাল থেকে  প্রতিবছর ২৭ সেপ্টেম্বর পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা প্রয়োজনবিশ্ব পর্যটন দিবস পালন করা হয়। ১৯৭০ সালের এই দিনে ‘ইউনাইটেড নেশনস ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন (ইউএনডব্লিউটিও)’-এর আইন পাস হওয়ার বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালনের তারিখটি নির্ধারণ করা হয়।

 

 


এ বছর (২০২৫) এই দিবসটির প্রতিপাদ্য করা হয়েছে, ‘ট্যুরিজম অ্যান্ড সাসটেইনেবল ট্রান্সফরমেশন’। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে পর্যটনকে শুধু প্রবৃদ্ধির খাত নয়, বরং শিক্ষা, শান্তি, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ রক্ষার শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার আহবান জানানো হয়েছে— যেখানে সুশাসন, উদ্ভাবন ও সু-স্থায়ী উন্নয়নই হবে মূল চালিকাশক্তি।

 


‘ইউএনডব্লিউটিও’ গঠিত হওয়ার পর অনেক দেশ পর্যটক ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনব্যবস্থা সুদৃঢ় করেছে কিংবা করার চেষ্টা করছে। এ ব্যাপারে একটি অভিজ্ঞতা পাঠকদের উদ্দেশে নিবেদন করতে চাই। কয়েক বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ‘গ্রেট ব্যারিয়র রিফ’ দেখতে গিয়েছিলাম। এটি পৃথিবীর সব থেকে বড় প্রবাল দ্বীপ। এর অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে ‘গ্রিন আইল্যান্ড’। সেটি দেখাকে কেন্দ্র করে একটি স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনাটি ছিল একরকম:  ‘গ্রিন আইল্যান্ড’ দেখে মূল ভূখণ্ডে (কেয়ানর্স) বিকেল ৪টার দিকে ফিরে আসার পর খেয়াল হলো যে আমার হাতব্যাগ দ্বীপে ফেলে এসেছি। এদিকে সন্ধ্যা ৬টায় আমার ব্রিসবেন ফেরার ফ্লাইট। ব্যাগের মধ্যে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস থাকার কারণে আমি বিচলিত হয়ে পড়লাম। দৌড়ে চলে গেলাম যে ট্যুর কম্পানির প্যাকেজে গিয়েছিলাম তাদের অফিসে। আমার ফ্লাইট টাইমসহ বিষয়টি তাদের বলতেই তাঁরা যোগাযোগ করলেন ‘গ্রিন আইল্যান্ড’-এ তাঁদের অফিসে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমার ব্যাগ তাঁরা খুঁজে পেলেন। কিন্তু তখনো আমার টেনশন যাচ্ছে না এই ভেবে যে ব্যাগ না হয় পাওয়া গেল, কিন্তু সেটি আমার ফ্লাইট ছাড়ার আগে কিভাবে হাতে পাব। ট্যুর কর্তৃপক্ষের যিনি যোগাযোগ করছিলেন, তিনি আমাকে আমার ব্রিসবেনের হোটেলের ঠিকানা দিতে বললেন এবং আশ্বস্ত করলেন যে দুদিনের মধ্যে ব্যাগটি সেখানে পৌঁছে যাবে। এ কথা শোনার পর তাঁকে বললাম, ‘ব্যাগের মধ্যে আমার প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ ছিল এবং আমি সেগুলো প্রতিদিন খাই।’ আমার সে কথা শোনার পরই তিনি উঠে দ্রুতগতিতে ভেতরে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পরই ফিরে এসে বললেন, ‘ব্যাগটি নিয়ে একটি হেলিকপ্টার এখনই রওনা হচ্ছে এবং তোমার ফ্লাইট ছাড়ার আগেই সেটি তুমি হাতে পাবে।’ পেয়েছিলামও তাই।

 

 

 

একটি দেশের পর্যটন ব্যবস্থা কতটা সুসংগঠিত, নিরাপদ তথা পর্যটকবান্ধব হতে পারে সেটি জানানোর জন্যই ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরলাম। শুধু তা-ই না, সেখানকার ব্যবস্থাপনার মধ্যে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বিষয়টিও লক্ষ করেছিলাম।

 

 

বাংলাদেশে প্রায় সব ধরনের (প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় এবং আধুনিক স্থাপনা) দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এসব দর্শনীয় স্থানগুলোর ওপর কমবেশি মানবসৃষ্ট হুমকি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো জায়গায় পর্যটনকেন্দ্রিক হুমকির কথা গবেষণায়ও উঠে এসেছে। যেমন—সুন্দরবন, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, রাতারগুল জলা বন ইত্যাদি জায়গায় পর্যটনকেন্দ্রিক সমস্যার কথা তুলে ধরে এসব জায়গায় ইকোট্যুরিজমের সুপারিশ করা হয়েছে। দেশের ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক স্থানগুলোতেও পর্যটককেন্দ্রিক নেতিবাচক অভিঘাত সৃষ্টির বিষয়টি গবেষণায় পাওয়া গেছে।

 

 

দেশের পর্যটন খাতকে পরিবেশ ও পর্যটকবান্ধব করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বেশ কয়েক বছর আগে থেকে কেউ কেউ ‘ইকোট্যুরিজম’কে অন্যতম সমাধান হিসেবে দেখছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইকোট্যুরিজম বলতে যা বোঝায়, তা কি সত্যিকারভাবে আমাদের দেশে অনুসরণ করা হচ্ছে?

 

 

প্রভাবশালী ব্রিটিশ ইকোলজিক্যাল সোসাইটির জার্নাল, ‘ইকোলজিক্যাল সলিউশনস অ্যান্ড এভিডেন্স’-এ গত বছর লেখক টর্সনি ও অন্যান্য (২০২৪) মিলে ইকোট্যুরিজমের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন সেটি হচ্ছে : ‘যেকোনো ধরনের পর্যটন বা পর্যটন সম্পর্কিত পণ্য, যা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে (প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটন) এবং যা পরিবেশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে উপকার বয়ে আনে (যেমন—প্রকৃতি সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা, পরিবেশ সম্পর্কে শিক্ষামূলক ও অভিজ্ঞতামূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া, মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি করা এবং পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল মনোভাব গড়ে তোলা) ও একই সঙ্গে এ ধরনের পর্যটন এমনভাবে পরিচালিত হয়, যাতে পরিবেশ, স্থানীয় জনগণ ও অর্থনীতির জন্য তা সু-স্থায়ীভাবে মঙ্গলজনক হয়।’ পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করার জন্য এই সংজ্ঞাটি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

 

 

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ট্রাভেল ও ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স-এ বাংলাদেশের স্কোর সব থেকে কম (সাতের মধ্যে তিন দশমিক উনিশ)। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে পর্যটন বিকাশের অন্তরায় হিসেবে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সেগুলো হচ্ছে : অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা, পরিবহন সীমাবদ্ধতা, পর্যটকদের জন্য অতিরিক্ত খরচ, সীমিত বিপণন উদ্যোগ, চিকিৎসা পরিষেবার অভাব, পশ্চিমা দেশগুলো থেকে পর্যটকদের অভাব ইত্যাদি। দেশের পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করতে হলে এই সমস্যাগুলোর সমাধানে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণসহ ‘ইকোট্যুরিজম’ শব্দটির সর্বশেষ সংজ্ঞানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়