কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

পরিবেশ রক্ষার লড়াই সচেতনতা কোথায়?

মীর আব্দুল আলীম [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ০৭ জানুয়ারি ২০২৬]

পরিবেশ রক্ষার লড়াই সচেতনতা কোথায়?

জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যৎ বা তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এটি এখন বাংলাদেশের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অংশ। গত কয়েক বছরের অসহনীয় তাপপ্রবাহ, অতিশীত, অসময়ের বন্যা, উপকূলের ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা এবং ঘন ঘন শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। বলছে উন্নয়ন কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে মানুষের কল্যাণে আসবে? পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ কেবল গাছ কাটা, নদী দখল বা বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির সংকটে সীমাবদ্ধ নেই এটি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং সর্বোপরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একটি রাষ্ট্র যখন প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে উপেক্ষা করে কংক্রিটের অবকাঠামোকে উন্নয়ন মনে করে, তখন সেই উন্নয়ন বালির বাঁধের মতো ক্ষণস্থায়ী হয়। বৈশ্বিক উষ্ণতার সবচেয়ে ভয়াবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবগুলোর একটি হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, সমুদ্রের উচ্চতা ১ মিটার বাড়লে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও ভোলার মতো জেলাগুলো নিয়মিত জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। লবণাক্ত পানির এই অনুপ্রবেশ কেবল কৃষিজমি নষ্ট করছে না, বরং সমগ্র বাস্তুসংস্থানকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

 

 

বন্যা ও নদী ব্যবস্থাপনা : বাংলাদেশে বন্যা একটি পরিচিত প্রাকৃতিক বাস্তবতা হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ধরন ও তীব্রতা আমূল বদলে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলছে এবং মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উজানে (ভারত ও নেপালে) অতিবৃষ্টি হচ্ছে। এই বিশাল জলরাশি যখন বাংলাদেশের নদীগুলো দিয়ে নেমে আসে, তখন নদীর নাব্য না থাকায় তা দুকূল ছাপিয়ে জনপদ ভাসিয়ে দেয়। কিন্তু এই বন্যার ভয়াবহতার পেছনে কেবল প্রকৃতি দায়ী নয়; আমাদের ভ্রান্ত নদী ব্যবস্থাপনা এবং দখলদারিত্বের রাজনীতি সমানভাবে অপরাধী। দেশের প্রায় প্রতিটি নদ-নদী আজ দখল ও দূষণের শিকার। ড্রেজিংয়ের নামে লুটপাট হলেও নদীর গভীরতা বাড়ছে না। উল্টো যত্রতত্র অপরিকল্পিত বাঁধ, স্লুইসগেট ও রাস্তা নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ হয়েছে। অকাল বন্যায় কৃষকের সোনালি ধান চোখের পলকে তলিয়ে যাচ্ছে। বর্ষায় যেমন বন্যা হচ্ছে, শুকনা মৌসুমে নদীগুলো মরে গিয়ে মরুভূমি হয়ে পড়ছে। বন্যা কেবল ফসল ও ঘরবাড়ি ধ্বংস করে না, এটি গ্রামীণ দারিদ্র্যকে স্থায়ী রূপ দেয়। একজন কৃষক যখন তিন বছর পরপর বড় বন্যার কবলে পড়েন, তখন তিনি আর কখনোই দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারেন না।

জলবায়ু পরিবর্তনের গভীর আঘাত : অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো কৃষি। জলবায়ু পরিবর্তন এই খাদ্যের ভাণ্ডারে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে বৃষ্টি হতো, এখন সেখানে দীর্ঘ খরা অথবা অসময়ে অতিবৃষ্টি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রধান ফসল ধানের ওপর। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে ধানের পরাগায়ন ব্যাহত হয় এবং দানা চিটা হয়ে যায়। শুধু ধান নয়, আমাদের ডাল, তেলবীজ এবং শীতকালীন শাকসবজি উৎপাদনও হুমকির মুখে। শীতের স্থায়িত্ব কমে যাওয়ায় রবিশস্যের ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে এবং উত্তরাঞ্চলে মরুকরণের প্রভাবে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং ক্ষুদ্র কৃষকরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

 

 

শিল্পায়ন ও জ্বালানি নীতি : একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই উন্নয়ন কি পরিবেশকে কবর দিয়ে হবে? বাংলাদেশে শিল্পায়নের যে মডেল আমরা দেখছি, তা অত্যন্ত উদ্বেগের। দেশের অধিকাংশ বড় শিল্পকারখানা নদী বা জলাশয়ের ধারে অবস্থিত, যা থেকে নির্গত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি পানি ও মাটিকে বিষাক্ত করছে। শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা বা তুরাগ নদী আজ মৃত। এর দায় কার? জ্বালানি নীতির ক্ষেত্রেও আমরা এক সংকটজনক অবস্থানে আছি। বিশ্ব যখন কয়লা ও জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন আমরা বড় বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর নির্ভর করছি। পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না করলে, দীর্ঘমেয়াদে আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পরিবেশগত মর্যাদা দুই-ই সংকটে পড়বে।

 

 

জলবায়ু উদ্বাস্তু ও সামাজিক অস্থিরতা : জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ যে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তা হলো ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। নদীভাঙন বা লবণাক্ততার কারণে ভিটেমাটি হারানো এই মানুষগুলো যখন রিক্তহস্তে শহরে আসবে, তখন তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে বস্তিতে। এটি কেবল আবাসন সমস্যা নয় বরং এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করবে। বেকারত্ব ও মানবেতর জীবনযাপন করতে গিয়ে, এই বিশাল জনগোষ্ঠী অপরাধপ্রবণতা বা সামাজিক অস্থিরতার দিকে ধাবিত হতে পারে।

 

 

বৈশ্বিক দায় ও জলবায়ু ন্যায়বিচার : পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য বাংলাদেশ কোনোভাবেই দায়ী নয়। আমরা বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে মাত্র ০.৪৭ শতাংশের মতো ভূমিকা রাখি, কিন্তু ক্ষতির শিকার হচ্ছি সবচেয়ে বেশি। এটি একটি চরম অন্যায্য পরিস্থিতি। শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার জন্য পরিবেশ ধ্বংস করেছে, আর তার মাশুল দিচ্ছি আমরা আমাদের জীবন ও জীবিকা দিয়ে। জলবায়ু তহবিল থেকে কেবল ঋণ নয়, বরং ক্ষতিপূরণ হিসেবে অনুদান নিশ্চিত করতে হবে।

 

শিক্ষা, সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা : পরিবেশ রক্ষার লড়াই কেবল আইন দিয়ে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন নাগরিকের সচেতনতা। আমাদের শিক্ষাক্রমের প্রাথমিক স্তর থেকে পরিবেশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মকে শেখাতে হবে কীভাবে প্লাস্টিক বর্জন করতে হয়, কীভাবে গাছ লাগাতে হয় এবং কেন প্রকৃতিকে রক্ষা জরুরি। তবে নাগরিক সচেতনতার চেয়েও বড় হলো, রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা। পরিবেশ আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। নদী দখলকারীদের বা বায়ুদূষণকারী কলকারখানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট।

 

লেখক : সাংবাদিক ও সমাজ গবেষক