প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ : টেকসই উন্নয়নে রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে
এম হুমায়ুন কবির [সূত্র : সমকাল, ৫ নভেম্বর ২০২৫]

গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতি বিশেষ একটি মুহূর্তে পৌঁছেছে। গত পরশু প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। আমরা সাধারণভাবে ভাষণটি ইতিবাচকভাবে দেখছি। এটি গঠনমূলক একটি বক্তৃতা, একই সঙ্গে চলমান সমস্যার সমাধানে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিলে মনে হয়, জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হলেও পরে এটি বাস্তবায়ন কতটা হবে, তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। কেননা, ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সনদ, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে বিচিত্রমুখী মতদ্বৈততা দেখা যাচ্ছে। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দেওয়ার পরও এক ধরনের গুঞ্জন দেখেছি– নির্বাচন আদৌ হবে কিনা।
কেন বক্তৃতাটি গঠনমূলক বলছি, তার একাধিক যুক্তি রয়েছে। তিনি বক্তৃতায় সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, নির্বাচন-পরবর্তী সংবিধান সংস্কারে সংসদের ভূমিকা এবং এগুলো বাস্তবায়নে সময়সীমা নির্ধারণের কথা বলেছেন। এতে আমার মনে হয়েছে, সব কয়টি রাজনৈতিক দল তাদের দাবির কিছু না কিছু মেটাতে পেরেছে। যেমন বিএনপির একটি প্রধান দাবি ছিল– গণভোট ও নির্বাচন একই দিনে হোক। তাদের কাছে এটি একটি বড় বিষয়। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে এটি তুলে এনেছেন। এতে ভাষণটি গ্রহণের বিষয়ে এদিন দুপুর পর্যন্ত তাদের দোদুল্যমানতা থাকলেও রাতে স্থায়ী কমিটির সভায় তারা প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এতে বোঝা গেল, বিএনপি প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের বিষয়গুলো মোটামুটি গ্রহণ করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকে গণভোট চাওয়া হচ্ছিল; আবার তারা নির্বাচনও চাচ্ছিল। এই জায়গায় তাদের কিছুটা ছাড় দিতে হয়েছে। এর মানে এই নয়, তাদের কোনো দাবীই পূরণ হয়নি। সংসদের উচ্চকক্ষে যে আনুপাতির হারের কথা বলা হয়েছে, তা দলটির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, আপাতদৃষ্টিতে তারা বিভিন্ন মন্তব্য করলেও তাদের মূল যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, সেটা বাস্তবায়নের একটা সুযোগ তারা পাচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিও প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ মোটামুটি গ্রহণযোগ্য মনে করেছে। তাদের প্রধান বিষয় ছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। এনসিপির মধ্যে একটা ভয় ছিল যে, সনদ বাস্তবায়ন হবে না। কেননা, আমরা আগেও দেখেছি, নব্বই পরবর্তী রূপরেখাসহ বিভিন্ন বিষয় দেখা গেলেও তার তেমন বাস্তবায়ন ঘটেনি। বহু প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুর বাস্তবায়ন হয়নি। এই ভয়ের কারণে তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে খুবই জোর দিয়েছিল। এ জন্য তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ চেয়েছিল। সে আদেশ জারির মাধ্যমে এখন যেহেতু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের একটা প্রক্রিয়া নির্ধারিত হলো, সেহেতু এনসিপিও লাভবান হয়েছে।

ছোট রাজনৈতিক দলগুলোও প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের ব্যাপারে ইতিবাচক। আমার ধারণা, এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে সবার মতকে সম্মান দেখিয়ে একটা সমাধানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা গত পরশু প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে উঠে এসেছে। সরকার সে পথেই বেশ দক্ষতার সঙ্গে এগোচ্ছে বলে মনে করি। এখন যেসব বাধা-বিপত্তি রয়েছে, তার মধ্যে আছে একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট হওয়া। এখানে নির্বাচনের পাশাপাশি চারটি বিষয়ে হ্যাঁ বা না ভোট দিতে হবে। যেহেতু বিষয় দুটি একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে, তাই কোনো একটি বিষয় যেন কম গুরুত্ব না পায়, সেটা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের প্রক্রিয়া প্রথমবারের মতো হতে যাচ্ছে। তাই সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটি এক বাড়তি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং তারা প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। জনমতকে সংস্কারের পক্ষে টানার জন্য উভয় পক্ষকেই কাজ করতে হবে। আর পরে যে সংসদ গঠিত হবে, সেখানেও রাজনৈতিক দলগুলোর খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা জরুরি। সংসদ গঠনের পর সংবিধান সংশোধনের কাজটি বেশ সূচারুভাবে সম্পন্ন করতে হবে। তা না হলে সংকট নিরসন হবে না। তাই সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে একই সঙ্গে একাধিক কাজের দায়িত্ব নিতে হবে। তার ওপর নির্ভর করছে আগামীর রাজনীতি কোন দিকে এগোবে।
এবারে আরও একটি নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। উচ্চকক্ষের ধারণা। রাজনৈতিক দলগুলো আনুপাতিক হারে তাদের সদস্য উচ্চকক্ষে নিযুক্ত করতে পারবে। এতে সংসদীয় কাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য একটি পরিবর্তন আসবে বলে মনে করি। কাজেই পুরো প্রক্রিয়াতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোট, নির্বাচন, সরকারের সমন্বয়ের ব্যাপারগুলো প্রধান উপদেষ্টার বক্তৃতার মধ্যেই একটা সমাধানের রূপরেখা পাওয়া গেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে দু’চারজনের সঙ্গে আলাপ করে বুঝতে পেরেছি, একটা সুস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হবে এবং গণভোটও।
কয়েক দিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে টানটান উত্তেজনা ও বিভাজনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল; আমার মনে হয় সেই সুযোগটা এখন আর নেই। তা ছাড়া প্রধান উপদেষ্টাও তাঁর বক্তৃতায় সবাইকে সতর্ক করেছেন– সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে; অন্যথায় বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।
গত পরশু লকডাউনের আহ্বান ছিল। আমার ধারণা, এটি রাজনৈতিক দলগুলোকে গণভোট ও নির্বাচনমুখী হতে আরও উৎসাহিত করবে।
সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা মনে করি, প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের মধ্য দিয়ে একটা ইতিবাচক টার্নিং পয়েন্ট তৈরি হলো। যদি আমরা সম্মিলিতভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটা টেকসই, দায়বদ্ধ, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে গত বছর জুলাই-আগস্টে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তার আগেও যারা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন, তাদের স্বপ্ন সফল হবে। আমাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আরও শক্তিশালী হবে, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা পাবে, মানুষের আত্মমর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে এবং ভবিষ্যৎমুখী সফলতার জন্য বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যবস্থা জোরদার হবে। এসব স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটা রূপরেখা আমরা দেখতে পাচ্ছি। এখন আমাদের সবারই দায়িত্ব সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সম্মিলিতভাবে প্রত্যেকের অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখা।
এম হুমায়ুন কবির: যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত