কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

প্রবাসীদের সুরক্ষায় সরকারের পদক্ষেপ

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম [সূত্র : জনকণ্ঠ, ৫ নভেম্বর ২০২৫]

প্রবাসীদের সুরক্ষায় সরকারের পদক্ষেপ

চলতি অর্থবছরে রেমিটেন্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১ জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রবাসীরা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। সরকার কর্তৃক অর্থ পাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ এবং হুণ্ডিপ্রবণতা কমার কারণে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির হার- চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবরের প্রথম ২৬ দিন পর্যন্ত রেমিটেন্স প্রবাহ ১১ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্য একটি হিসাবে এই সময়ে প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল।

 

 মোট পরিমাণ- চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন প্রায় ১০ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। অক্টোবরের প্রবৃদ্ধি- শুধু অক্টোবর মাসেই প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। রেমিটেন্স বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারের অর্থ পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা এবং হুণ্ডির প্রভাব কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি। রিজার্ভ বৃদ্ধি- রেমিটেন্সের এই ইতিবাচক ধারা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ভালো খবর। অর্থনৈতিক প্রভাব- শক্তিশালী রেমিটেন্স প্রবাহ দেশের বাণিজ্য ঘাটতি সত্ত্বেও চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত তৈরি করেছে, যা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছেন রেমিটেন্স যোদ্ধারা। যাদের এখনো অবহেলার চোখে দেয়া হয়। আর অবহেলার প্রমাণটা পাওয়া যায় বিমানবন্দরে যা বলার অপেক্ষা রাখে না।

 

 


পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ও উন্নত জীবনের আশায় প্রতিদিন হাজার হাজার যুবক পাড়ি জমাচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। সুদে টাকা নিয়ে ভিটেবাড়ি বন্ধক দিয়ে চড়া দামে ভিসা নিয়ে অনেকেই আবার টাকার বিনিময়ে চুক্তি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমায় সমুদ্র পথে। প্রবাসীরা রাত দিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে যায় শুধু পরিবারের সুখ আর শান্তির জন্য। দুই ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবে সবাই আনন্দ করে। প্রবাসে ঈদের দিনেও কাজে যেতে হয়। কর্মস্থলে সহপাঠীদের সঙ্গে ঈদের আনন্দটুকু ভাগাভাগি করে নেয় নিজেদের মতো করে। আবার বেশির ভাগ দেশেই নিজ দেশের বাংলাদেশিদের কারণে বেতন, আকামাসহ নানা ধরনের ঝামেলার মধ্যে দিন কাটে প্রবাসীদের। মাস শেষে যখনই বেতন হাতে পায় সেই বেতনের টাকা কখন দেশে পরিবারে কাছে পাঠাবে সেই চিন্তায় অস্থির থাকে। আবার অনেক সময় দেখা যায় কাজ করেও মাস শেষে ঠিকমতো বেতন পায় না। বেতন দিতে দেরি হলে দেশ থেকে ফোন আসে। মাসতো শেষ, টাকা কোথায়? পাড়ার দোকান ও পাওনাদাররা শোনায় নানা ধরনের কথা।

 

 


পরিবারের বিভিন্ন জনের কাছ থেকে নানাবিধ চিন্তায় বাসা বাঁধে হৃদরোগের মতো নীরব ঘাতক। প্রতিদিন শোনা যায় ওমুক নামের ওমুক উপজেলার এক প্রবাসী ভাই স্ট্রোক করে মারা গেছে। এ ধরনের সংবাদ প্রতিদিনই চোখে পড়ে ফেসবুক খুললে। যাদের আত্মীয় স্বজন থাকে মৃত প্রবাসী মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠাতে সম্পন্ন করতে শুরু করে আইনি কার্যক্রম। বিভিন্ন জনের সহযোগিতায় কফিন বন্দি করে মরদেহ পাঠায় দেশে। কোনো প্রবাসী বিদেশে মারা গেলে বাংলাদেশ সরকার লাশ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে তিন লাখ টাকা প্রদান করে। কিন্তু কেউ একজন বিদেশে মারা গেলে একটি লাশ কীভাবে দেশে আসে? সেই খোঁজ কেউ রাখে না। পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজন গুঞ্জন করে লাশের সঙ্গে কত টাকা আসছে? শুধু মা-বাবা ছাড়া প্রায় সবার মনে এ কৌতূহল জাগে কত টাকা এসেছে কফিনের সঙ্গে। লাশ আসার আগে পাওনাদারেরা এসে বসে থাকে টাকার জন্য। অনেক সময় লাশ দাফন দিতেও বাধা দেয়ার ঘটনা শোনা যায়। বেশির ভাগ শ্রমিক হিসেবে কম বেতনে কাজ করে যা পায়, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলত।

 

 

সংগঠন বা বন্ধু-বান্ধব মিলে প্রবাসীদের কাছ থেকে টাকা তুলে যে যা পারে সহযোগিতা করে। এমনও প্রবাসীর মরদেহ হিমঘরে বক্সে পড়ে আছে, যার খোঁজখবর নেয়ার কেউ নেই। দেখা যায় এদের মধ্যে বেশির ভাগ নকল পাসপোর্ট বা অবৈধ পথে আসা প্রবাসী। অনেক সময় বাংলাদেশের নাগরিক ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, অন্য দেশে পাসপোর্ট নিয়ে প্রবেশ করে। তথ্য গরমিল থাকার কারণে খোঁজ না পেলে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন দিয়ে দেয়া হয়।  পরিবারে সুখের ও শান্তির জন্য আসা প্রবাসী যখন অসুস্থ হয়ে দেশে যায় কিছুদিন পর টাকার অভাবে সেই প্রবাসী ও তার পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করে। আগে যে পরিবার দশ জনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে, এখন চোখ শরমে আত্মীয়স্বজন কারও কাছে বলতে পারে না। নীরব কান্না আর দুঃখে জীবন যায় তাদের। তাই প্রবাসীদের নিজের প্রতি নজর দেয়া বেশি জরুরি। সবচেয়ে জরুরি নিজের শরীরের যত্ন নেয়া, খেয়াল রাখা। মনের প্রশান্তির জন্য ছুটির দিনগুলোতে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মিলিত হওয়া। এতে মনের মধ্যে দুঃখ-কষ্ট কমে থাকবে। কমে যাবে মানসিক চাপ ও অশান্তি।

 

 


২০২৪ সালে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের প্রবাসীর সংখ্যা কত তা নিয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপ রয়েছে। প্রতি বছরই প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায় এবং অনেকেই দেশে ফিরে আসেন। তাই বাংলাদেশের মোট প্রবাসী সংখ্যা কত তা সঠিক ভাবে নির্ণয় করা খুব কঠিন। তবে আনুমানিকভাবে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার জরিপের আলোকে ২০২৪ সালের বাংলাদেশি প্রবাসী সংখ্যার একটি নির্ভরযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করার চেষ্টা করবো। ২০২৪ সালে সারা বিশ্বে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ১৩ দশমিক ৫ মিলিয়নে। এই বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, সংস্কৃতিতে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীর সংখ্যা ১ কোটি ৫৫ লাখ।

 

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা ১ কোটি ২৫ লাখ। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, বাংলাদেশী প্রবাসীদের সংখ্যা ১ কোটি ৪৮ লাখের বেশি।  বিদেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা ১ কোটি ৫৫ লাখ। এভাবেই বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মোট প্রবাসীর সংখ্যা কত তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা খুবই কঠিন। কারণ বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন গবেষণার ভিত্তিতে তথ্য তুলে ধরেছে। বোঝার বিষয় হলো প্রবাসীরা যেভাবে কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যায়, আবার কাজ শেষে অনেকেই দেশে ফিরে আসে। আমরা উপরোক্ত তথ্যের সমন্বয় করে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের প্রবাসী সংখ্যা ১ কোটি ৩৫ লাখের বেশি।

 


বাংলাদেশি প্রবাসীরা বিভিন্ন দেশে নিজেদের কর্মক্ষেত্র স্থাপন করে প্রেরিত অর্থের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখছে। তারা প্রতি বছর প্রায় বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়ে থাকেন, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। এই রেমিটেন্স দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান খুঁজে নেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তারা নির্মাণ, গৃহস্থালী কাজ এবং অন্যান্য বিভিন্ন অদক্ষ শ্রমের কাজে নিয়োজিত থাকেন। অন্যদিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় অনেক বাংলাদেশি শিক্ষিত পেশাজীবী হিসেবে আইটি, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কাজ করছেন।

 


চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা- প্রবাসী বাংলাদেশিরা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো কর্মসংস্থান সুরক্ষা, সামাজিক স্বীকৃতি এবং প্রায়ই কঠিন কাজের পরিবেশ। এছাড়া প্রবাসে বসবাসরত অনেকেই ভিসা ও অভিবাসন-সংক্রান্ত জটিলতার মধ্যে পড়েন। অনেক প্রবাসী তাদের পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার কারণে মানসিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েন।

 


সংস্কৃতি ও পরিচিতি- প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সর্বদা চেষ্টা করেন। তারা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় উৎসব এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় বজায় রাখেন। এর মাধ্যমে তারা শুধু নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় করেন না, বরং বিদেশিদের কাছেও বাংলাদেশের সংস্কৃতির পরিচিত করে তোলেন।

 


সরকারের ভূমিকা- বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষা ও স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কনস্যুলার সেবা, আইনি সহায়তা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এছাড়া সরকার প্রবাসী রেমিটেন্স বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও সুবিধা প্রদান করে থাকে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের প্রবাসী সংখ্যা কত তার ওপর বিভিন্ন রিসার্চ থেকে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। তবে একটি বিষয়ে একমত হতে পারি, প্রতি বছরই প্রবাসীদের সংখ্যা ক্রমন্বয়ে বাড়ছে এবং সারা বিশ্বেই তারা নিজেদের উপস্থিতি ও অবদান রেখে চলেছেন দেশের জন্য।

 

 

লেখক: সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যা-ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন