কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

প্রান্তিক বিচারব্যবস্থা : মানবিক উদ্যোগ গ্রাম আদালত

খালিদ ইবনে আমিন [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ২৬ অক্টোবর ২০২৫]

প্রান্তিক বিচারব্যবস্থা : মানবিক উদ্যোগ গ্রাম আদালত

সীমিত ভৌগোলিক সীমানায় জনসংখ্যার আধিক্য ও ঘনত্বের চরম বাস্তবতায় বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় গ্রামীণ আদালত এক আলোকবর্তিকার নাম, যা প্রান্তজনের শেষ ভরসা। গ্রামীণ জনপদে গ্রাম আদালতের বিচার ব্যবস্থা এক অসাধারণ মানবিক উদ্যোগ, যা নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে ভোগান্তি কমাতে কার্যকর। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ?বাংলাদেশের নিম্ন ও উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সাড়ে চার মিলিয়নের বেশি। যার গাণিতিক রূপ ৪৬,৫২,২৬০টি। এর মধ্যে নিম্ন আদালতে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে ৩৯ লাখ ৯৮ হাজার ৮০৫টি মামলা। হাইকোর্ট বিভাগে ৬ লাখ ১৬ হাজার ৪৫৩টি এবং আপিল বিভাগে ৩৭ হাজার ২টি মামলা চলমান।

 


বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় মামলার যে স্রোতধারা, তা দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায়, এ দেশের মানুষেরা কতটা মামলা-মোকদ্দমা প্রিয়! দেশের কোনো কোনো অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে চুন থেকে পান খসলেই মামলা করার এক ধরনের প্রবণতা দৃশ্যমান। আবার এ দেশের মানুষের মাঝে সমঝোতার মাধ্যমে আপোস-মীমাংসা করার মতো লোকও বেশুমার। স্বামী-স্ত্রীর সামান্য মনোমালিন্য, স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ আদায় না করা, পৈতৃক সম্পদে ভাগিদের বঞ্চিতকরণ, ভূমির সীমানা নিয়ে আইল ঠেলাঠেলির অপসংস্কৃতি যুগের পর যুগ ধরে চলমান। অথচ পঞ্চায়েত ব্যবস্থার টেকসই রূপ দেওয়া গেলে বহু মামলাই গ্রামীণ বিচার-সালিশের মাধ্যমে সমাধান করা খুব সহজ হয়ে যায়।

 

 

জনগণকে ভোগান্তির শিকার হতে হয় না। লাখ লাখ টাকা খরচ করেও যুগের পর যুগ মামলা লড়তে আদালতের বারান্দায় অসহায় হয়ে করুণ আর্তনাদ নিয়ে ঘুরতে হয় না। মামলা-মোকদ্দমা কেন্দ্রিক শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার অসহায় দশা থেকে খুব সহজেই পরিত্রাণ পাওয়া যায় গ্রামীণ আদালতের মাধ্যমে। গ্রামীণ আদালত নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত গবেষণামূলক ও তথ্যভিত্তিক রচনার নির্মোহ বিশ্লেষণ এবং বিচার ব্যবস্থার ঐতিহাসিক কাঠামোর কার্যকারিতা, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক আলোচনায় আমরা দেখতে পাই।

 

বাংলাদেশের বিচারিক কাঠামো বহুকাল থেকেই রাজধানী, বিভাগীয় সদর ও জেলা শহর কেন্দ্রিক। এমন বাস্তবতায় গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষ, বিশেষত প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর ও নারীসমাজ, বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সবসময়ই থেকেছে বঞ্চিত। গ্রাম থেকে জেলা শহরের দূরত্ব কোথাও ১০ কিঃ মিঃ আবার কোথাও ১০০ কিঃমিঃ-এর বেশি। ফলে যাতায়াত খরচ ও ঝক্কিঝামেলা সামলানো যেমন দুরূহ, অন্যদিকে তা সময়সাপেক্ষ। গ্রাম আদালত ইউনিয়ন পরিষদে গঠিত পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি ট্রাইব্যুনালধর্মী প্রতিষ্ঠান। এখানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এতে সভাপতিত্ব করেন, বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের মনোনীত দুজন করে সদস্য অন্তর্ভুক্ত থাকেন। এর ফলে আদালতের সিদ্ধান্তে স্থানীয় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। আইনজীবী নিয়োগ করার কোনো ঝামেলা থাকে না। জনগণ বাড়তি খরচ থেকে বেঁচে যান।

 

 
বঞ্চিত নাগরিক কর্তৃক অধিকার আদায়ে আদালতে মামলা দায়ের, আইনজীবী নিয়োগ, নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার মতো দুর্বিষহ কাজ থেকে জনগণকে পরিত্রাণ দিতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটিই হলো গ্রাম আদালত। যা মানুষের দোরগোড়ায় অধিকার পৌঁছে দেওয়ার অনন্য পদক্ষেপ। ইতিহাস অনুসন্ধানে আমরা জানতে পারি, আমাদের এই জনপদে গ্রামীণ সমাজে হাজার হাজার বছর ধরে পঞ্চায়েত বা সালিশি পদ্ধতির মাধ্যমে স্থানীয় বিরোধের নিষ্পত্তি করা হতো। এই পদ্ধতি ছিল সমাজনির্ভর ও মৌখিক, যেখানে গ্রামের প্রবীণরা বাদী-বিবাদী দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করে দিতেন। ব্রিটিশ উপনিবেশকালীন সময়ে স্থানীয় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর জন্য 'Union Bench'  বা 'Village Munsif Court' চালু হয়।

 

 

ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার গ্রামীণ সমাজে স্থানীয় বিবাদ মীমাংসার জন্য ‘পঞ্চায়েত’ বা ‘সালিশ’ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। এটি ছিল অপ্রাতিষ্ঠানিক সমাজিক বিচার ব্যবস্থা। ১৮৭০-এর দশকে ব্রিটিশ প্রশাসন  Munsif Court ও Union Bench Court গঠন করে গ্রামীণ ছোটখাটো মামলার নিষ্পত্তির প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি রূপ দেয়। তবে এসব ছিল ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণাধীন ও সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন আদালত। তবে ঔপনিবেশিক শাসনকালে (১৭৫৭-১৯৪৭) ব্রিটিশরা এই পঞ্চায়েত কাঠামো দুর্বল করে দেয় এবং পশ্চিমা আইনের আলোকে আধুনিক আদালত ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

 

 


এমনকি ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তান আমলেও গ্রামীণ বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত তেমন উন্নতি হয়নি। পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) গ্রামীণ সালিশ বা পঞ্চায়েত প্রথা অনানুষ্ঠানিকভাবে চলত। তবে ১৯৬০ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সরকার Basic Democracies Order, ১৯৫৯ অনুযায়ী Council Courts প্রতিষ্ঠা করে, যা ছিল ইংরেজ কর্তৃক প্রবর্তিত ভিলেজ মুন্সেফ কোর্টের আদলে। একাত্তর উত্তর স্বাধীন বাংলাদেশে বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, রাষ্ট্র যখন জনকল্যাণমূলক ও গণমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, তখন প্রান্তিক মানুষের জন্য বিচার সহজলভ্য করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে প্রথমবারের মতো মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ‌Village Court Ordinance,  ১৯৭৬’ এর মাধ্যমে গ্রাম আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। এই আইনের অধীনে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে একটি গ্রাম আদালত গঠন করা হয়।

 

 

 আদালতে ৫জন সদস্য থাকেন-দুই পক্ষ থেকে দুজন এবং চেয়ারম্যানসহ মোট পাঁচজন। চেয়ারম্যান অথবা তার মনোনীত ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আদালতে বিচারকের ভূমিকা রাখেন। এ আদালত ক্ষুদ্র দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচার করতে পারে, যেখানে জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সীমিত। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাথমিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ আইনের আওতায় কিছু সালিশ ব্যবস্থা চালু ছিল, তবে তা আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামো পায়নি। দেশের প্রান্তিক জনগণ যেন খুব সহজে, দ্রুত এবং স্বল্পব্যয়ে ন্যায় বিচার পেতে পারে তা নিশ্চিত করতেই জেনারেল জিয়াউর রহমান গ্রাম আদালত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেন।
যুগের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে  Village Court Act, ২০০৬ সালে গ্রাম আদালত আইন প্রণয়ন করে এটিকে অধিকতর আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ ও ২০২৩ সালের সংশোধনী আইনের মাধ্যমে এর কাঠামো যুগপোযোগী করা হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালের সংশোধনী আইনের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা ও সীমারেখা আরও পরিষ্কার করা হয়েছে। আজকের দিনে গ্রাম আদালত ইউনিয়ন পরিষদ-ভিত্তিক স্থানীয় বিচার ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় গ্রাম আদালত তৃণমূল স্তরে একটি স্বীকৃত ও স্থায়ী ভিত্তি লাভ করেছে।

 

 

আমাদের দেশে গ্রাম আদালতের আইনি এখতিয়ার সীমিত হলেও তা প্রান্তিক মানুষের প্রয়োজন মেটাতে খুবই কার্যকর। সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক বিরোধ এবং অনূর্ধ্ব ছয় মাস শাস্তিযোগ্য কিছু অপরাধ যেমন- ক্ষুদ্র চুরি, প্রতারণা, মারামারি, গৃহস্থালি সহিংসতা নিষ্পত্তির এখতিয়ার এই আদালতের রয়েছে। দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার জটিল বিষয়গুলো গ্রাম আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত। এ আদালতের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এর মানবিক বৈশিষ্ট্য। যেখানে প্রচলিত আদালতে আইনের জটিল পরিভাষার দুর্বোধ্যতা ও আইনজীবীর পেছনে মোটা অংকের অর্থ ব্যায় এবং দীর্ঘসূত্রিতা সাধারণ মানুষকে আদালত বিমুখ করে, সেখানে গ্রাম আদালত নিরক্ষর ও অসহায় মানুষকে তাদের নিজের ভাষায় কথা বলার ও অভিযোগ উপস্থাপন করার সুযোগ করে দেয়। যা মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের ইমারত মজবুত করে। তিনটি মানবিক দিক আমরা গ্রাম আদালতের মাঝে দেখতে পাই, ১. ইউনিয়ন পরিষদ ভবনেই আদালতের কার্যক্রম চলায়, বিচার প্রার্থীকে জেলা সদরে যেতে হয় না। ২. বাদী-বিবাদী নিজের মনোনীত সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। ফলে তার আস্থা বেড়ে যায় এবং অংশগ্রহণমূলক হয়। ৩. পুনর্মিলন ও সম্প্রীতি রক্ষা এখানে মুখ্য, তাই সবার মাঝেই মীমাংসামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। গ্রাম আদালত হলো ইউনিয়ন পরিষদভিত্তিক একটি স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা, যা ক্ষুদ্র দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গড়ে উঠেছে।

 

 

 এটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিরোধ- যেমন জমি-জমার ছোটখাটো বিবাদ, দেনা-পাওনা, পারিবারিক কলহ, অল্পমাত্রার শারীরিক আঘাত, ক্ষুদ্র চুরি বা প্রতারণা ইত্যাদি- দ্রুত, সহজ ও সাশ্রয়ী উপায়ে নিষ্পত্তি করে। আইনের দৃষ্টিতে গ্রাম আদালত সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারে এবং অনূর্ধ্ব ছয় মাস পর্যন্ত শাস্তিযোগ্য কিছু অপরাধের বিচার করতে সক্ষম। মফস্বলে একজন কৃষকের জমিতে প্রতিবেশীর গরু-ছাগল ফসল নষ্ট করলে প্রচলিত আদালতে মামলা করলে অর্থব্যয়, সময় ও হয়রানি ফসলের ক্ষতির বহুগুণ দাঁড়ায়। কিন্তু গ্রাম আদালত একই সমস্যার সমাধান খুব দ্রুত ও সাশ্রয়ী সময়ে করে দেয়। এভাবে গ্রাম আদালত আইনের শাসনকে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়। বাংলাদেশের প্রথাগত বিচারব্যবস্থায় গ্রামীণ সমাজে নারী ও দরিদ্র মানুষ প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। জেলা শহরের আদালতে যাওয়া নারীর জন্য সামাজিকভাবে চ্যালেঞ্জিং, আর অর্থনৈতিকভাবে নাগালের বাইরে। গ্রাম আদালত নারীদের ভরণপোষণ, দেনমোহরের দেনা-পাওনা, পারিবারিক দ্বন্দ্বসহ ছোটখাটো মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ করে দিয়েছে।

 

 


টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে যখন বলা হচ্ছে ‘সব মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে’, তখন বাংলাদেশের গ্রাম আদালত নিঃসন্দেহে একটি সফল মডেল। একে আরও শক্তিশালী করলে বাংলাদেশ প্রমাণ করতে পারবে, ন্যায়বিচার শুধু শহরের আদালতকক্ষে নয়, গ্রামেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এজন্য বলা যায়- গ্রাম আদালত সত্যিই এক মানবিক ব্যবস্থাপনার নাম, যা বাংলাদেশের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
বাংলাদেশের প্রান্তিক বিচারব্যবস্থায় গ্রাম আদালত নিঃসন্দেহে এক মানবিক দৃষ্টান্ত। এটি শুধু আদালতের বিকল্প নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতি ও শান্তি রক্ষায় অন্যতম বিকল্প। সামান্য বিরোধও যদি দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নিরপেক্ষভাবে সমাধান হয়, তবে তা অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করবে এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা বহুগুণ বাড়াবে। ইউএনডিপি-এর এক জরিপে দেখা গেছে, গ্রাম আদালতে মামলার বাদি এক-তৃতীয়াংশই নারী। তাছাড়া, ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাম আদালতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।

 

 

 

এর ফলে পিছিয়ে পরা নারীদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ছে এবং তাদের ন্যায়বিচারের পথ সুগম হচ্ছে। ইউএনডিপি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ডানিডা প্রভৃতি সংস্থা গ্রামআদালত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়ে আসছে। বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ দশক ধরে সরকার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা গ্রাম আদালত শক্তিশালীকরণ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। 

 


২০১৮ সালে প্রকাশিত ইইউ-ইউএনডিপির এক সমীক্ষায় দেখা যায়, গ্রাম আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তিকৃত মামলার প্রায় ৭০ শতাংশই উভয় পক্ষ সন্তুষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে প্রচলিত আদালতের মামলার চাপও কমেছে। বিশ্বব্যাংক ২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, গ্রাম আদালত বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় অন্যতম কার্যকর মডেল।

 


দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব ও আর্থসামাজিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে, গ্রাম আদালতের গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা ক্রমেই বাড়ছে। কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আদালতের প্রধান যেহেতু চেয়ারম্যান, যিনি আবার স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সংগত কারণেই নেতাদের প্রভাব মাঝে মাঝে বিচারিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাতদুষ্ট করে তোলে। অনেক ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের জন্য আলাদা কক্ষ বা রেকর্ড সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই। মানুষ জানে না কোনো মামলা গ্রাম আদালতে আনা সম্ভব আর কোনটি সম্ভব নয়। গুরুতর অপরাধ বা বড় আর্থিক বিরোধ এখতিয়ারের বাইরে থাকায় জনগণের প্রত্যাশা অনেক সময় পূরণ হয় না। গ্রাম আদালতের সমস্যা ও অযুত সম্ভাবনা সামনে রেখে এসব বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া গেলে তা খুবই ফলপ্রসূ হবে।

 

 এক. আইন বিশেষজ্ঞ ও বিচারকদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়্যারম্যান, সদস্য ও কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দান। দুই. আইনি সহায়তা সংস্থা ও এনজিওর মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। তিন. তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে মামলা যত ছোটই হোক, প্রতিটি মামলার রেকর্ড সংরক্ষণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। চার. দেশের গ্রামীণ নারীদের অধিকাংশই পর্দানশীন।

 

 

তাই ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করে জেন্ডার সংবেদনশীল পরিবেশে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। পাঁচ. রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাসের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কঠোর মনিটরিং চালু করা এবং স্থানীয় শিক্ষাবিদদের সম্পৃক্ত করা। যদি এ পদক্ষেপগুলো নেওয়া যায়, তবে গ্রাম আদালত শুধু ক্ষুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির স্থান নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অন্যতম সূতিকাগার হয়ে উঠবে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় গ্রাম আদালত এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করবে আগামী দিনে।