কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি

ড. মো. মোরশেদুল আলম [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ২১ নভেম্বর ২০২৫]

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি

তুরস্কের ইস্তান্বুল শহরে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার চলমান শান্তি আলোচনায় অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। সীমান্ত সংঘাতের পর এ আলোচনাটি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু সীমান্ত আক্রমণ বন্ধে পরিকল্পনা গ্রহণে উভয় রাষ্ট্রই অনীহা প্রদর্শন করায় সুযোগটি নষ্ট হয়েছে।

 

 

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ তালেবান সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালানো হলে ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের গভীরে আঘাত হানবে। চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে এর অর্থ হবে প্রকাশ্য যুদ্ধ বলে, তিনি এর আগে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের বৈধতা স্পষ্ট নয়। সেই সরকারের পুরো আফগানিস্তানের কর্তৃত্ব নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় জাতিসংঘ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টেফান ডুজারিক আশা প্রকাশ করেন, আলোচনা স্থগিত থাকলেও পুনরায় উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে লড়াই শুরু হবে না।

 

 

 

যদিও আলোচনায় মধ্যস্থতা করার জন্য পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার তুরস্ক ও কাতারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তালেবান সরকার ২০২১ সালের দোহা শান্তিচুক্তি অনুযায়ী সন্ত্রাসবাদ রোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে আতাউল্লাহ তারার উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের এমন কোনো পদক্ষেপকে পাকিস্তান সমর্থন করবে না, যা আফগান জনগণ বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে। তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তানের নাগরিকদের মঙ্গল কামনা করে পাকিস্তান।

 

 

তবে নিজ দেশের নাগরিক এবং সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় পাকিস্তান সকল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। জাতিসংঘ প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষে আফগানিস্তান সীমান্তে এখন পর্যন্ত ৫০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত ও ৪৪৭ জন আহত হয়েছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বলেছে, সংঘর্ষে তাদের ২৩ সেনা নিহতও ২৯ জন আহত হয়েছেন।

 

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আফগানিস্তানের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, দেশের সেনাবাহিনী শুধু আফগানিস্তানের উসকানির যথাযথ জবাবই প্রদান করেনি, বরং তাদের বেশ কয়েকটি চৌকি ধ্বংস করে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এনায়েতুল্লাহ খোয়ারজমি বলেন, পাকিস্তানের সীমান্ত চৌকিগুলোতে তাদের হামলা ছিল পাল্টা জবাব। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি পাকিস্তান আবারও আফগানিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে, তবে তাদের সশস্ত্র বাহিনী নিজেদের আকাশসীমা রক্ষা করতে প্রস্তুত রয়েছে এবং তারা কড়া জবাব দেবে। 

 


সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তান ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। জাতিসংঘের বিশ^ খাদ্য কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানের প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষ খাদ্যঘাটতিতে ভুগছে। তাদের অর্থনীতির এক-তৃতীয়াংশ ধসে পড়েছে। ২০২৫ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ১৭ লাখ আফগান শরণার্থী পাকিস্তানে অবস্থান করছে। এরই মধ্যে পাকিস্তান জানিয়েছে, অবৈধভাবে পাকিস্তানে বসবাসরত আফগান নাগরিকদের বহিষ্কার করা হবে। এর ফলে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটবে। ইতোমধ্যে পাকিস্তান সরকার আফগানিস্তান শরণার্থী বহিষ্কারসহ কিছু শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তুরস্ক ও কাতার উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টা চালালেও তা সফল হয়নি।

 

 

২০২১ সালে তালেবান সরকার আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে পাকিস্তান ভেবেছিল উভয় রাষ্ট্রের পুরাতন সম্পর্ক পুনর্জীবিত হবে। পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে তালেবান সরকার একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু বাস্তবে সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটেছে। ২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পাকিস্তানের বিপরীতমুখী একটি পররাষ্ট্রনীতি ছিল। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের সমর্থন দিয়ে পাকিস্তান দেশ শাসনকারী যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সরকারগুলোকে স্বীকৃতি প্রদান করেছিল।

 

 

অন্যদিকে পাকিস্তনি ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে গোপনে তালেবানের পুনরুত্থানকে সমর্থন দিয়েছিল পাকিস্তান। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগানিস্তানের মাটিতে আশ্রয় গ্রহণ করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা পরিচালনা করছে। যদিও আফগানিস্তান তাদের এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগানিস্তান সীমানে প্রায় সময় বিমান হামলা চালায়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে আফগানিস্তান স্বীকৃতি দিতে প্রথমে অনীহা দেখিয়েছিল। ব্রিটিশ ভারত ও আফগানিস্তানের আমির আবদুর রহমানের মধ্যে ১৮৯৩ সালে স্বাক্ষরিত ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে স্বীকার করেনি আফগানিস্তান সরকার। ব্রিটিশ সরকার ভারতের উত্তর-পশ্চিমাংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুনিশ্চিত করতে আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রায় ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমানা নির্ধারণ চুক্তিটি স্বাক্ষর করে।

 

ডুরান্ড লাইনের পশ্চিম প্রান্ত ইরান সীমান্তের সঙ্গে এবং পূর্ব প্রান্ত চীন সীমান্তের সঙ্গে। আফগানিস্তানের ১২টি প্রদেশ এবং পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া, বালুচিস্তান ও গিলগিত-বালতিস্তান এই রেখার দুই পাশে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তান পাকিস্তানের সীমান্ত ও আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। আবার পাকিস্তানও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের নিকট নিষিদ্ধ টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দাবি জানিয়েছে। সম্প্রতি দোহায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তান-আফগানিস্তান বৈঠকে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষমন্ত্রী মোল্লা ইয়াকুব ডুরান্ড লাইনকে কাল্পনিক বলে আখ্যা দিয়েছেন। আফগানিস্তান ডুরান্ড লাইনকে মানতে নারাজ এবং এটিকে ব্রিটিশদের চাপের ফল মনে করে। 

 

 


সত্তরের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সমর্থনে আফগানিস্তানের মুজাহিদিনদের অস্ত্র ও আশ্রয় প্রদান করে পাকিস্তান সহযোগিতা করে। তখন থেকেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আফগানিস্তানের রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদদে ১৯৯০ এর দশকে তালেবানদের উত্থান হয়েছিল।

 

 

পাকস্তিানের পরিকল্পনা ছিল, আফগানিস্তানে যদি তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে ওই অঞ্চলে ভূকৌশলগত একটি অবস্থান তৈরি হবে। এতে করে ভারতের বিরুদ্ধে এক ধরনের নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি হবে। এটাও ঠিক যে, তালেবান সরকার কখনই পাকিস্তানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে তালেবান সরকারের পতন ঘটলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে টিটিপির আবির্ভাব ঘটে। তারা আফগান তালেবানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে। জাতিসংঘের এক হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে পাকিস্তানে টিটিপির হামলায় প্রায় ৮০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। কোনো কোনো আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন, আফগানিস্তান ইস্যুতে পাকিস্তানের ভুল পদক্ষেপের কারণে ভারতের জন্য আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমেয় সরকার পর্যায়ে কোনো সুসম্পর্কই নেই। ফলে টিটিপি ও বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য কোনো উপযোগী যোগাযোগ মাধ্যম নেই বললেই চলে। ভারত এমন পরিস্থিতিতে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। পাকিস্তান ও আফগনিস্তানের মধ্যকার সংঘর্ষে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উভয় রাষ্ট্রকে সংযম, সংলাপ ও প্রজ্ঞা প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।

 

 

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের জনগণের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে তারা শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে সংযম প্রদর্শন করতে আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ তাদের স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে বলে তিনি জানিয়েছেন। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উভয় পক্ষকে সংলাপ ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উত্তেজনা কমাতে এবং শান্তি বজায় রাখতে হবে। ভারত সংঘর্ষ বিষয়ে এখনো মন্তব্য করেনি। তবে ভারত-আফগানিস্তান ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পাকিস্তান উদ্বিগ্ন। তবে কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করছেন, এই সংঘর্ষ বড় কোনো যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করবে এমন সম্ভাবনা অবশ্য কম। আফগানিস্তানের প্রচলিত যুদ্ধক্ষমতাও কিন্তু পাকিস্তানের তুলনায় কম বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আফগানবিষয়ক প্রতিনিধি আসিফ দুররানি এ প্রসঙ্গে বলেন, যতই পরিস্থিতি ভয়াবহ হোক না কেন, কূটনীতিকে সবসময় সুযোগ দিতে হবে। যতদিন আফগান সরকার তাদের মাটিতে টিটিপির উপস্থিতি স্বীকার না করবে, ততদিন পর্যন্ত উভয় রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন চলতে থাকবে বলে এই বিশ্লেষক মনে করেন। 

 

 


আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাকিস্তানের ছায়া থেকে বের হয়ে আফগানিস্তান স্বাধীন নীতিতে চলতে ইচ্ছুক। ১৯৯৬ সালের মতো তালেবান সরকার এখন আর পাকিস্তানের ‘ক্লায়েন্ট রেজিম’ নয়; বরং চীন, ইরান, রাশিয়া ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চায়। চীন খুব সতর্কতার সঙ্গে আফগানিস্তানের খনি ও অবকাঠামো থাতে বিনিয়োগ করেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করতে চীন আগ্রহী। চীন আফগানিস্তানের সঙ্গে লেনদেনভিত্তিক ও বাস্তবমুখী সম্পর্ক রেখেছে। পাকিস্তানের গওয়াদার বন্দরের সঙ্গে আফগানিস্তানের বাণিজ্য রুট সংযোগের পরিকল্পনা থাকলেও সীমান্তে অস্থিরতা এবং টিটিপির উপস্থিতি এমন সম্ভাবনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের বিরুদ্ধেও কাজ করতে আগ্রহী ভারত। রাশিয়াও সম্প্রতি তালেবানের সঙ্গে নীরব কূটনীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। পশ্চিমা প্রভাব ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে আফগানিস্তানকে একটি সম্ভাব্য বাফার জোন হিসেবে মনে করে রাশিয়া।

 

 

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবকে সঙ্গে নিয়ে আফগানিস্তানে প্রক্সি যুদ্ধে সম্পৃক্ত হতে গিয়ে পাকিস্তানের শাসকরা নিজেদেরও বহুমুখী বিপদ ডেকে এনেছেন। অভ্যন্তরীণ ও বাইরে তালেবানদের সঙ্গে সীমান্ত অস্থিতিশীল হওয়ায় ডুরান্ড লাইন মাদক ও অস্ত্র চোরাচালঅনের স্বর্গভূমি হয়ে উঠেছে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে এটি পাকিস্তান, চীন, ভারত ও মধ্য এশিয়ার জন্য একটি বড় বিপদ তৈরি করছে। আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় একধরনের নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। আফগানিস্তান যেহেতু দক্ষিণ এশিয়াকে মধ্য এশিয়া এবং অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে; তাই রাষ্ট্রটির ভূকৌশলগত গুরুত্বও বেশি। আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে উনিশ শতকেও ব্রিটিশ ও রাশিয়ার মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতময় পরিস্থির সৃষ্টি হয়েছিল; যাকে ‘গ্রেট গেম’ বলে সে সময় অভিহিত করা হয়েছিল। বর্তমান সময়েও দেখা যাচ্ছে একদিকে পাকিস্তান এবং অন্যদিকে ভারত এবং তার সঙ্গে একদিকে চীন ও অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থাকায় দ্বিতীয় ‘গ্রেট গেম’ এর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলা যায়। অনেকে মনে করছেন, আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে ও নিজেদের ভূমিতে থাকা আন্তঃসীমান্ত জঙ্গিগোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ থেকে দৃষ্টি সরাতে তারা আফগান জাতীয়তাবাদকে উসকে দিচ্ছে। 

 

 

 


আফগানিস্তান বলছে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আফগানিস্তান সম্পর্কে ভ্রান্ত তথ্য ছড়াচ্ছে এবং ইসলামিক স্টেট ঘনিষ্ঠ সদস্যদের আশ্রয় দিচ্ছে। আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা ও সার্ভভৌমত্বকে তারা ক্ষুণ্ন করছে। আর পাকিস্তানের দাবি, আফগানিস্তান বছরের পর বছর ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে দেশটিতে নিজেদের মতো করে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া মধ্য এশিয়ায় নিরাপত্তা ভারসাম্য রক্ষায় আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখতে চায়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান সময়ে পাকিস্তানের প্রধান চ্যালেঞ্জ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকট; আর আফগানিস্তানের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। পাকিস্তান মনে করে টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না আফগানিস্তান।

 

 

 

আর আফগানিস্তান মনে করে পাকিস্তান তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিমাত্রায় হস্তক্ষেপ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফর করেছেন। বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন মোড় এনে দিয়েছে। ২০২৫ সালে আফগানিস্তানে দূতাবাস পুনরায় খুলে দেয় ভারত। একইসঙ্গে সীমিত বাণিজ্যিক কার্যকক্রম আরম্ভ করে; যা পাকিস্তানের পছন্দ হয়নি। ভারত ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তানে ‘সফট পাওয়ার’ গড়ে তুলতে আগ্রহী। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে পাকিস্তানের কৌশলগত প্রভাব হ্রাস করা। পাকিস্তানের আশঙ্কা হচ্ছে, আফগাস্তিানের ভূমিকে ব্যবহার করে পাকিস্তানবিরোধীকে গোষ্ঠীগুলোকে উসকে দিতে পারে ভারত। মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংকট খুব দ্রুত সমাধান করার আশ্বাস দেন। কেবল সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ নিরাপত্তা দিতে পারবে না, যদি তা ধারাবাহিক কূটনীতি ও আঞ্চলিক সমঝোতার সম্পর্কে সম্মিলিত না হয়। তবে উভয় রাষ্ট্রই যদি সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখে, বাণিজ্য পুনরায় শুরু করে এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করে; তাহলেই কেবল পারস্পরিক সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন যাত্রা শুরু হতে পারে। 

 

 


লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়