পাকিস্তান-আফগান উত্তেজনায় ডুরান্ড লাইন কেন আলোচনায়
[সূত্র : প্রথম আলো, 23/10/2025]

সপ্তাহজুড়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তীব্র রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হয়েছে। সীমান্তও খুলে দেওয়া হয়েছে। তবু পরিস্থিতি মোটেই স্থিতিশীল নয়। আফগান তালেবান নেতারা বারবার জোর দিয়ে বলছেন, পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সীমান্ত, অর্থাৎ ডুরান্ড লাইন আসলে ‘কাল্পনিক’ এবং এই সীমান্তরেখার বৈধতা তাঁরা মানেন না। দোহায় যুদ্ধবিরতি সইয়ের পর অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে আফগান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, এই কাল্পনিক সীমান্ত চুক্তির আলোচ্য বিষয় ছিল না। বক্তব্যটি তথ্যগতভাবে সত্য হলেও তাঁর ভঙ্গি ও ভাষা পাকিস্তানের কাছে একপ্রকার উসকানি হিসেবে ধরা হয়েছে।
স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কোনো আফগান সরকারই ডুরান্ড লাইনকে বৈধ আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে বর্তমান তালেবান প্রশাসন, বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে টানাপোড়েন চরমে ওঠার পর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মকভাবে ডুরান্ড লাইনের বৈধতাকে অস্বীকার করছে।
রাশিয়া ছাড়া এখনো বিশ্বের কোনো দেশ তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। অনেকে মনে করছেন, আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে ও নিজেদের ভূমিতে থাকা আন্তসীমান্ত জঙ্গিগোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ থেকে দৃষ্টি সরাতে তারা ‘আফগান জাতীয়তাবাদ’ উসকে দিচ্ছে। দোহা বৈঠকের পর মোল্লা ইয়াকুবের ভাষ্য থেকেও বোঝা যায়, কাবুল কোনো নমনীয়তা দেখাতে রাজি নয়।
তালেবান যখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়ছিল, তখন তাদের অনেক নেতাই পাকিস্তানের ভেতর থেকে সেই যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। তাই অনেকের মনে হয়েছিল, তালেবান আসলে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে বা পাকিস্তানের হয়ে কাজ করে। কিন্তু বাস্তবে তালেবান-পাকিস্তান সম্পর্ক ছিল শুধু তখনকার প্রয়োজন আর সুবিধা অনুযায়ী। দুই পক্ষই একে অন্যকে ব্যবহার করেছে। সম্পর্কটা কখনোই পুরোপুরি বিশ্বাস বা ভালো বোঝাপড়ার ওপর ছিল না।
তারপরও যে রকম খোলামেলা শত্রুতা আর বৈরিতা এখন দেখা যাচ্ছে, আগে কেউ তা ভাবেনি। আগে সম্পর্ক ছিল টানাপোড়েনের, এখন তা গড়িয়েছে প্রকাশ্য সংঘাতে। মোল্লা ওমরের প্রথম তালেবান সরকারও পাকিস্তানের পূর্ণ সমর্থনের ওপর নির্ভর করত। তবে সে সময়ও তারা ডুরান্ড লাইনকে বৈধ সীমান্ত হিসেবে মানেনি। যদিও তারা এটিকে বড় রাজনৈতিক ইস্যুও বানায়নি। তখনো বহু তালেবান নেতা প্রকাশ্যে বলতেন, এই সীমারেখা ‘কৃত্রিম’, এটি মুছে ফেলতে হবে।
১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ শাসক ও আফগান সম্রাট আবদুর রহমানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে ডুরান্ড লাইনের জন্ম। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার। এটি খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানের মধ্য দিয়ে গেছে। পাকিস্তান স্বাধীনতার পর এ চুক্তিকে পশ্চিম সীমান্তের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক আইনেও ডুরান্ড লাইন স্বীকৃত সীমান্ত বলে গণ্য। ডুরান্ড লাইনকে মানতে অনীহার কারণেই আফগানিস্তান পাকিস্তানকে স্বীকৃতি দিতে দীর্ঘ বিলম্ব করে।
বিগত সময়ে সীমান্তে দফায় দফায় উত্তেজনা ও অবরোধ হয়েছে। কিন্তু গত সপ্তাহের সংঘর্ষ ছিল নজিরবিহীন। খবরে এসেছে, পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান কাবুলসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন শহরে বোমাবর্ষণ করেছে। পাকিস্তানের দাবি, এ হামলা ছিল ওপার থেকে লাগাতার সশস্ত্র উসকানির প্রতিশোধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যেই তা করা হয়েছে।
তালেবান সরকার ফেরার পর খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে জঙ্গি হামলা ব্যাপক বেড়েছে। গত এক দশকে এত রক্তপাত আর হয়নি। শত শত পাকিস্তানি নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানের বার্তা পরিষ্কার—জঙ্গি আশ্রয় দেওয়ার মূল্য খুবই চড়া হবে। যুদ্ধবিরতিতে সই করলেও তালেবান এখনো কোনো ইঙ্গিত দেয়নি যে তারা তেহরিক-ই-তালেবান বা টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কারণ, টিটিপিকে তারা ‘মুজাহিদ ভাই’ বলে মনে করে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ডুরান্ড ইস্যু আবার তোলা হলো? এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে জর্জরিত তালেবান সরকার পাখতুন–অধ্যুষিত এলাকায় জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে জনসমর্থন টানতে চাইছে।
এদিকে পাকিস্তান সরকারের আফগান শরণার্থী বহিষ্কারসহ কিছু শাস্তিমূলক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এটি যেমন অবিবেচক সিদ্ধান্ত, তেমনই মানবাধিকারবিরোধী। এটি জনরোষও বাড়িয়েছে। পাকিস্তানের ক্রোধের কারণ যৌক্তিক। কিন্তু উত্তেজনা না বাড়িয়ে সংযমই সমাধানের বাস্তবসম্মত পথ। যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি ও আলোচনায় বসার বিষয়টি বিচক্ষণতা ছিল। কারণ, এ সংঘাত দুই পাশের কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে।
দোহা বৈঠক থেকে যুদ্ধবিরতি হয়েছে। আশা আছে, শিগগিরই ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী বৈঠক অঞ্চলে শান্তির পথে থাকা বহু বাধা দূর করতে সহায়তা করবে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যস্থতা ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
● জাহিদ হুসাইন পাকিস্তানের গবেষক ও সাংবাদিক
ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
জাহিদ হুসাইন