কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

অযৌক্তিক সমালোচনা : উন্নয়নে বাধা

ব্রি. জে. এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.) [প্রকাশ : যুৃগান্তর, ২৯ নভেম্বর ২০২৫]

অযৌক্তিক সমালোচনা : উন্নয়নে বাধা

বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে-একদিকে রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়, অন্যদিকে একটি অস্থায়ী সরকার দেশের প্রশাসন, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে সুশৃঙ্খল করতে কাজ করছে। এমন সময়ে প্রয়োজন ছিল গঠনমূলক আলোচনা, দায়িত্বশীল মতামত এবং বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা যে প্রবণতা দেখছি, তা সম্পূর্ণ বিপরীত অপ্রতিরুদ্ধ সমালোচনা, অজ্ঞাত মন্তব্য, আবেগনির্ভর অভিযোগ এবং প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অসুস্থ অভ্যাস।

 

 

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের ভিত্তি, কিন্তু প্রতিটি স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ থাকা আবশ্যক। যখন সবাই বিশেষজ্ঞ সেজে কথা বলে, যখন অর্ধসত্য বা গুজব তথ্যের জায়গা নেয়, যখন টকশো ও ফেসবুক পোস্ট নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করে, তখন তা দেশের অগ্রগতি ও জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করে। আজকের বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৯০ লাখ। এ বিশাল অনলাইন জনপরিসরে গুজব, অর্ধসত্য বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনের নানা বর্ণনাও দেশের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ঢুকে পড়ে। বিশেষ করে ভারতীয় কৌশলগত বর্ণনা আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এ বর্ণনা কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে কিছু বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মন্তব্যে প্রতিফলিত হয়, যা প্রকৃতপক্ষে দেশের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

 

 

 

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু এ ক্ষেত্রে বড় উদাহরণ। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে, যার বার্ষিক ব্যয় ১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাজনিত চাপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। আন্তর্জাতিক চাপ, দাতা সংস্থার নীতি এবং কূটনৈতিক জটিলতার মধ্যে বাংলাদেশ সরকার যখন এ জটিল ও দীর্ঘদিনের পুরোনো সমস্যা সমাধানের নতুন পথ খুঁজছিল-আসিয়ান মানবিক সংস্থা, তৃতীয় পক্ষ মধ্যস্থতা বা নতুন কূটনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে, ঠিক তখনই দেশের ভেতরে কিছু গোষ্ঠী ভারতের বয়ানে অকারণে সমালোচনা শুরু করে। অনেকেই প্রস্তাবিত পদক্ষেপের প্রকৃতি না বুঝে অভিযোগ তোলে, ভয় তৈরি করে, এমনকি সরকারের উদ্দেশ্য নিয়েও সন্দেহ সৃষ্টি করে। এর ফলে সরকারের কিছু উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়-এটি নীতিগত ব্যর্থতার কারণে নয়, বরং দায়িত্বহীন সমালোচনা ও ভারতের উসকানির কারণে।

 

 

 

সম্প্রতি একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে বন্দরগুলোর টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কাছে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে। এখানে বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি-বাংলাদেশ কোনো বন্দর বিক্রি করছে না, সার্বভৌমত্ব হারাচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা ব্যবহার করে টার্মিনাল পরিচালনা উন্নত করতে চাইছে। বিশ্বে প্রায় ১২০টির বেশি বড় বন্দর এমন ব্যবস্থাপনার অধীনে চলছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বহু দেশ তাদের বন্দর টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির কাছে লিজ দিয়ে দক্ষতা, গতি এবং আর্থিক আয় বহুগুণ বাড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শ্রীলংকার কলম্বো বন্দর বিদেশি টার্মিনাল অপারেটর যুক্ত করার পর অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বছরে ৭ মিলিয়ন টিইইউ কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা অর্জন করেছে। সেখানে পণ্যের গড় মজুত সময় ২-৩ দিনে নেমে এসেছে।

 

 

 

অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রামে গড় মজুত সময় এখনো ৬-৮ দিন। আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, দ্রুত কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। বিদেশি অপারেটর যুক্ত হলে পণ্য ওঠানামার সময় কমে যাবে, রপ্তানির প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং জাতীয় আয়ে ১৫-২০ শতাংশ অতিরিক্ত সুবিধা আসতে পারে। অর্থাৎ এটি দেশের জন্য একটি কৌশলগত লাভজনক সিদ্ধান্ত; কিন্তু কিছু বামপন্থি রাজনৈতিক দল, স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞ এবং টকশোমুখো বক্তা এমনভাবে অযৌক্তিক সমালোচনা শুরু করেছেন, যেন দেশের সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি বিপন্ন হয়ে গেছে। তারা ভৌত বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাধারণ নিয়ম না জেনেই এমন এক আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছেন, বাংলাদেশ নাকি তার বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এ প্রচারণার উদ্দেশ্য জ্ঞানভিত্তিক নয়; বরং আবেগ, রাজনৈতিক লাভ এবং বিভ্রান্তি দ্বারা সৃষ্ট।

 

 

বাস্তবতা হলো, বন্দরগুলোর জমি, মালিকানা, নিরাপত্তা, শাসন-সবই সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এখানে মূল বন্দর নয়, শুধু নির্দিষ্ট টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা বিশ্বের প্রায় সব আধুনিক বন্দরে প্রচলিত একটি পদ্ধতি। ‘লিজ’ মানে মালিকানা হারানো নয়, এটি কেবল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পেশাদার ব্যবস্থাপনা ব্যবহারের ব্যবস্থা। যেমন একজন বাড়ির মালিক ভাড়া দিলে মালিকানা হারান না, ঠিক তেমনভাবেই টার্মিনাল লিজ দেওয়া মানে বন্দর বিক্রি করা নয়। এর মূল লক্ষ্য হলো দক্ষতা বাড়ানো, প্রযুক্তি আনা, দ্রুত কার্গো খালাস এবং লোডিং-আনলোডিংয়ের আধুনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে বাংলাদেশের রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রম আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়। আজকের বিশ্বে বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার গুরুত্ব অপরিসীম। চট্টগ্রাম বন্দরে গড় অবস্থানকাল যেখানে ৬-৮ দিন, সেখানে বিশ্বের উন্নত বন্দরে এটি মাত্র ২-৩ দিন। এ ব্যবস্থাপনাগত ঘাটতি দূর করতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা যুক্ত করা ছাড়া বিকল্প নেই।

 

 

 

টার্মিনাল লিজের ফলে বাংলাদেশ আর্থিকভাবে লাভবান হবে-উন্নত প্রযুক্তি, দ্রুত কার্গো ক্লিয়ারেন্স, মনিটরিং সিস্টেম, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে অপারেশনের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়বে। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ কমবে, পণ্যের ডেলিভারি সময় কমে যাবে; ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান পাবে। এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।

 

 

অযৌক্তিক সমালোচনার ফলে যা হচ্ছে, তা হলো-সুযোগ হারানো, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ধাক্কা এবং নীতিনির্ধারকদের অপ্রয়োজনীয় চাপ। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা দেশকে পিছিয়ে দেয়। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণই। তাই যারা উগ্র সমালোচনা করছেন, তারা প্রকৃত দেশপ্রেমের জায়গা থেকে কাজ করছেন না; বরং অজান্তেই বাহ্যিক ন্যারেটিভের হাতিয়ার হয়ে যাচ্ছেন। সত্য হলো-টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতা এবং আন্তর্জাতিক দক্ষতা যুক্ত হওয়া দেশের জন্য আশীর্বাদ, কোনোভাবেই হুমকি নয়। দেশের উন্নয়নকে যদি আমরা সত্যি গুরুত্ব দিই, তাহলে এ ধরনের ভুল ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই উচিত।

 

 

এ অযৌক্তিক ও অজ্ঞতাপ্রসূত সমালোচনার ফলে দেশের ক্ষতি হচ্ছে তিনভাবে। প্রথমত, বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে; দ্বিতীয়ত, সরকার যে নীতিগত পরিবর্তনগুলোর জন্য সাহসী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; তৃতীয়ত, গণতন্ত্র আরও ঝুঁকিহীন, ধীর ও অকার্যকর হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা হিসাব করে দেখিয়েছেন, শুধু ভুল তথ্যের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ায় বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য সুযোগ হারায়।

 

 

 

সমস্যা আসলে রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিকও। আমাদের সমাজে ‘পারফরম্যান্স’ জ্ঞান না থাকলেও মন্তব্য করা যায়, তথ্য যাচাই ছাড়াই ফেসবুক লাইভে কথা বলা যায়, টকশোতে উচ্চৈঃস্বরে কথা বললেই মানুষকে প্রভাবিত করা যায়; কিন্তু এর ফলে যে নীতিনির্ধারণ, বিনিয়োগ এবং জাতীয় অগ্রগতিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তা কেউ বিবেচনা করে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই অজ্ঞতা বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর লাইসেন্স নয়। রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন জনগণ ভালো সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে এবং খারাপ সিদ্ধান্তকে যুক্তিনিষ্ঠভাবে সমালোচনা করে। এর বাইরে যখন সমালোচনা অরাজনৈতিক ও দায়িত্বহীনভাবে পরিচালিত হয়, তখন দেশ পিছিয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে স্থিতিশীলতা, দক্ষতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেগুলো বাস্তবায়নে জনসমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল তথ্যের বন্যায় ভেসে গিয়ে আমরা যেন দেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত না করি।

 

 

 

বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার বিশাল দরজা খুলে আছে। কৌশলগত বন্দর আধুনিকায়ন, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্য, রোহিঙ্গা সংকটের কূটনৈতিক সমাধান-সবই দেশের ভবিষ্যৎ শক্তিশালী করার পথ। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের দরকার দায়িত্বশীল নাগরিক, তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা। সমালোচনা করা সহজ, দেশ গড়া কঠিন। দেশের স্বার্থে যেসব উদ্যোগ প্রয়োজন, সেগুলোকে সমর্থন করাই প্রকৃত দেশপ্রেম। আওয়াজের ভিড়ে সত্য হারিয়ে গেলে ক্ষতি হয় রাষ্ট্রের। তাই এখন সময় এসেছে বুদ্ধি দিয়ে শোনা, জেনে-বুঝে মন্তব্য করা এবং দেশের অগ্রগতির পথে বাধা না হয়ে বরং সহযাত্রী হওয়া।

 

 

 

ব্রি. জে. এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.) : নিরাপত্তা বিশ্লেষক