কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এসএমই খাত

মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল [প্রকাশিত : জনকণ্ঠ, ১২ অক্টোবর ২০২৫]

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এসএমই খাত

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত বা এসএমই সেক্টর। এ খাত দেশের মোট কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ তৈরি করে এবং শিল্পোন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বলা যায়, দেশের অর্থনীতি যে বহুমাত্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার অন্যতম স্তম্ভ হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এ খাত কেবল পণ্য উৎপাদনই করছে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য নিরসন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। আরও সহজ করে বললে, এসএমই খাত আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড।

 

 

কারণ এই খাতে প্রায় ১ কোটিরও বেশি ক্ষুদ্র, কুটির, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং প্রায় ৩ কোটির বেশি মানুষ এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, এসএমই খাত বাংলাদেশের জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি অবদান রেখেছিল, যা শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ সরবরাহ করে। তবে শঙ্কার বিষয়, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, উচ্চ জামানত ও ঋণ প্রক্রিয়ার জটিলতা এই খাতের প্রবৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মুদ্রানীতিতে কড়াকড়ি আরোপ এবং বাজার বাস্তবতায় যে হারে সুদ বেড়েছে, তা এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে যারা ছোট পরিসরে ব্যবসা করেন বা নতুনভাবে শুরু করছেন তাদের জন্য মূলধনের খরচ বেড়ে যাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। 

 

 


সাম্প্রতিক সময়ে এই খাত আরও মারাত্মক সংকটে পড়েছে। যার প্রধান কারণ হলো ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা ও সুদের বৈষম্য। বিশেষ করে সিঙ্গেল ডিজিট ঋণনীতি (সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ)। এমনিতেই  বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি এসএমই খাতকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এখন যদি সুলভ ঋণ না মেলে, তবে হাজার হাজার ছোট শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। এতে কেবল উৎপাদনই কমবে না, শ্রমিকরা চাকরি হারাবেন। ব্যাপক হারে বেকারত্ব বাড়বে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি ধসে পড়বে। সরকার হারাবে বিপুল পরিমাণে রাজস্ব। এক কথায়, এসএমই খাতের ধস মানে জাতীয় অর্থনীতির ধস।

 

 


বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই, বড় ব্যবসায়ীরা সহজে ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকার ঋণ পান। কিন্তু একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ১০-২০ লাখ টাকা ঋণ নিতেও ভোগেন নানান বিড়ম্বনায়। প্রথমত, ব্যাংক জামানত ছাড়া ঋণ দিতে চায় না। দ্বিতীয়ত, কাগজপত্র ও নথি সংগ্রহের প্রক্রিয়া এত জটিল যে অনেক উদ্যোক্তা মাঝপথেই থেমে যান। তৃতীয়ত, সুদের হার তুলনামূলক বেশি, যা প্রায়ই ১২-১৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। চতুর্থত, অনেকে অভিযোগ করেন যে ঋণ পেতে অনৈতিক সুবিধা দিতে হয়। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাংকের বদলে মহাজন বা বেসরকারি এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন, যেখানে সুদের হার এত বেশি যে ব্যবসা লাভজনক তো দূরে থাক, টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 

 

অবশ্য এসএমই উদ্যোক্তাদের মূলধন সংকট এই প্রথম নয়। বড় ব্যবসায়ী বা করপোরেট গ্রুপ সহজে ব্যাংক ঋণ পেলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সবসময় নানা শর্ত ও জটিলতার মুখোমুখি হন। তার ওপর যখন সুদের হার বৃদ্ধি পায়, তখন তাদের জন্য ঋণ গ্রহণ আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ধরা যাক, পূর্বে কোনো উদ্যোক্তা ১০ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালাতেন, এখন সেই হার বেড়ে ১৪ বা ১৫ শতাংশ হলে তার মাসিক কিস্তির চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এতে অনেকেই নতুন ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকবেন, আবার যারা ইতিমধ্যে ঋণ নিয়েছেন তারা কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাবেন।
আরেকটা বিষয় এখানে উল্লেখ্য, সুদের হার বাড়ার পরই এসএমই খাতের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। এই খাতের উদ্যোক্তাদের অনেকেই কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি বা অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার জন্য ঋণের ওপর নির্ভরশীল। সুদ বাড়ায় সেই খরচ সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ে যুক্ত হয়। ফলে তাদের পণ্যের দাম বাড়াতে হয়। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হয় না। এতে ব্যবসার স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়, বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।

 


কর্মসংস্থানের ওপর সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাব খুব স্পষ্ট। বাংলাদেশে এসএমই খাত প্রায় অর্ধেকের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করে। কিন্তু উদ্যোক্তারা যখন ব্যবসা সম্প্রসারণে ঋণ নিতে সাহস পান না বা ব্যয় মেটাতে অক্ষম হয়ে পড়েন। তখন তারা নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ করেন। এমনকি পুরনো কর্মীদের ছাঁটাই করতে বাধ্য হন। এতে একদিকে বেকারত্ব বাড়ে, অন্যদিকে পরিবারের আয় কমে গিয়ে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও সুদের হার বৃদ্ধি মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। অনেক নারী ক্ষুদ্র ঋণ বা ব্যাংক লোন নিয়ে ছোট ব্যবসা চালান। সুদের চাপ বেড়ে যাওয়ায় তারা ব্যবসা চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এতে নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণও বাধাগ্রস্ত হবে। সুদের হার বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘমেয়াদে এসএমই খাতের প্রতিযোগিতা শক্তি কমে যাবে। যখন উদ্যোক্তারা ঋণের উচ্চ সুদ মেটাতে ব্যস্ত থাকেন, তখন তারা নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা বা বাজার সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করতে পারেন না। ফলে এসএমই খাত ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়বে এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়বে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।

 


এ খাতের উদ্যোক্তাদের সহায়তা প্রয়োজন। তাই সরকার তথা সকল ব্যাংকের অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংককে বলতে চাই, এসএমই উদ্যোক্তাদের এগিয়ে যেতে হলে মূলত চারটি ধরনের সহায়তা জরুরি- অর্থায়নের সহজপ্রাপ্যতা, দক্ষতা উন্নয়ন, বাজার সংযোগ ও ডিজিটাল সক্ষমতা। দেশের নীতিনির্ধারক মহল এ বিষয়গুলো অনেকটাই উপলব্ধি করেছে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই নীতিমালা, পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম- এসব উদ্যোগ উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে সহায়ক হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। অনেক উদ্যোক্তা এখনো ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় অনভ্যস্ত, ব্যবসার হিসাব-নিকাশ আনুষ্ঠানিক নয়, জামানতের শর্ত পূরণ করা কঠিন- এসব কারণে অনেকে কাক্সিক্ষত সহায়তা পান না। 

 

 


ক্ষুদ্রশিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি এসএমই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সুদ নীতি সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। সিঙ্গেল ডিজিট ঋণনীতি বলতে বোঝানো হচ্ছে, ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ এক অঙ্কে (৯ শতাংশের মধ্যে) রাখা। সরকার বড় শিল্প ও ব্যবসার জন্য এ নীতি কার্যকর করেছে। কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেক সময় এ সুবিধা দেওয়া হয় না। ব্যাংকগুলো যুক্তি দেখায়- ছোট ঋণের জন্য পরিচালন ব্যয় বেশি, তাই সুদের হারও বাড়াতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো- যারা দেশের কর্মসংস্থানের সিংহভাগ বহন করছে, তাদের কেন বেশি সুদে পিষ্ট হতে হবে? যদি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সিঙ্গেল ডিজিট ঋণ না পান তবে তারা টিকতে পারবেন না। ফলে পুরো অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাই এ খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি সুশৃঙ্খল ও বহুমাত্রিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ চাই, যাতে প্রত্যেক উদ্যোক্তার প্রকৃত সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হয়। 
আরও সহজ করে বলা যায়- ১. সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ নিশ্চিত করা: ব্যাংকগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে এসএমই উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে হবে। ২. জামানত ছাড়াই ঋণ: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতমুক্ত ঋণ চালু করতে হবে। ৩. বিশেষ প্রণোদনা তহবিল: সরকারের পক্ষ থেকে আলাদা তহবিল গঠন করে এসএমই খাতে সাশ্রয়ী ঋণ বিতরণ করা প্রয়োজন। ৪. ব্যাংক কোটা নির্ধারণ: প্রতিটি ব্যাংককে তাদের মোট ঋণের অন্তত ২০-২৫ শতাংশ এসএমই খাতে বরাদ্দ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ৫. ডিজিটাল ঋণপ্রাপ্তি: ফিনটেক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য দ্রুত ও সহজলভ্য ঋণব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি। ৬. নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ছাড়: নারী নেতৃত্বাধীন ব্যবসার জন্য সুদ আরও কমানো যেতে পারে। ৭. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এগিয়ে আসবে- এটাই প্রত্যাশা।

 

 


দেশের টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের জন্য এসএমই খাতকে সুরক্ষা দেওয়া হোক। নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে সুদের হার নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এ খাতকে টিকিয়ে রাখা। অন্যথায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়াবেন, যা অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। তাই দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এসএমই খাতকে সুরক্ষা দিন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য জামানত ছাড়া ঋণ ব্যবস্থা এবং সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট নিশ্চিত করুন।

 

 

লেখক : শিল্প-উদ্যোক্তা