কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

অর্থনীতির নিরাময়ে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

ড. সেলিম রায়হান [প্রকাশ: বণিক বার্তা, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

অর্থনীতির নিরাময়ে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

১৮ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণের সুস্পষ্ট রায় কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি নীতিনির্ধারণের একটি নতুন সুযোগও। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি জানালা খুলেছে।

 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ জানালা দিয়ে কি কেবল স্বস্তির বাতাস ঢুকবে, নাকি একটি গভীর সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু হবে?

 
 
 
 
 
 

 

সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চাপ মূল্যস্ফীতি। খাদ্যদ্রব্যের দাম কখনো কিছুটা কমলেও অখাদ্য খাতে ব্যয় বেড়েই চলেছে—বাসা ভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা। মজুরি সেই গতিতে বাড়েনি। ফলে প্রকৃত আয় কমেছে, জীবনযাত্রার মানে চাপ পড়েছে। নীতিগত প্রতিক্রিয়াও ছিল অসম্পূর্ণ। দেরিতে মুদ্রানীতি কঠোর করা হয়েছে, আবার দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তাও দেয়া হয়েছে। ফল হয়েছে এক অস্বস্তিকর মিশ্রণ: উচ্চ সুদের হার, তবু স্থায়ী মূল্যস্ফীতি। এতে বিনিয়োগ কমেছে, কিন্তু দামের স্থিতি পুরোপুরি আসেনি।

 

 

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্বীকার করতে হবে। বর্তমান মূল্যস্ফীতি কেবল চাহিদাজনিত নয়। সরবরাহ ঘাটতি, বাজার তদারকির দুর্বলতা, জ্বালানি মূল্যের বিকৃতি, পরিবহন ব্যয়, এমনকি কিছু পণ্যে কারসাজিও ভূমিকা রেখেছে। শুধু কড়া মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে তা উল্টো ক্ষতি করতে পারে। উচ্চ সুদ উৎপাদকদের ঋণ ব্যয় বাড়ায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কর্মপরিধি সংকুচিত করে। অথচ খাদ্য সরবরাহের বিঘ্ন, বাজারে অদক্ষতা বা কৃত্রিম সংকট—এসব সমাধান করে না।

 

 

নতুন সরকারকে তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কৌশল নিতে হবে। মুদ্রানীতির শৃঙ্খলা প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে লক্ষ্যভিত্তিক সরবরাহপক্ষীয় উদ্যোগ জরুরি। উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কোল্ড চেইন, দ্রুত আমদানি অনুমোদন, সার ও ডিজেলের মতো পণ্যে কৌশলগত মজুদ, বাজার তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা—এসব পদক্ষেপ সুদের হার বাড়ানোর চেয়ে বেশি ফল দিতে পারে।

 

 

বিনিয়োগ ও উৎপাদন: সংকীর্ণ ভিত্তি থেকে বিস্তৃত কাঠামো

 

 

গত তিন দশকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয় ও অবকাঠামো বিনিয়োগ। এ মডেল প্রাথমিক সাফল্য এনেছে, কিন্তু সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি এখনো পোশাকনির্ভর। বৈশ্বিক চাহিদার ওঠানামা, শ্রম ও পরিবেশ মানদণ্ড, প্রযুক্তিগত স্বয়ংক্রিয়তা—সব মিলিয়ে ঝুঁকি বাড়ছে। এলডিসি উত্তরণ সেই ঝুঁকিকে তীব্র করবে।

 

 

উৎপাদন বহুমুখীকরণ তাই অপরিহার্য। ওষুধ শিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, আইসিটি সেবা, ইলেকট্রনিকস সংযোজন, মেডিকেল সরঞ্জাম, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উপকরণ—এসব খাতে সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্যোক্তার অভাব নেই; অভাব রয়েছে সমন্বিত সহায়তার। অর্থায়ন, মাননিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা উন্নয়ন, বাজার তথ্য—সব মিলিয়ে একটি সহায়ক বাস্তুতন্ত্র দরকার।

 

 

প্রণোদনা হতে হবে ফলাফলভিত্তিক, সময়সীমাবদ্ধ ও স্বচ্ছ। কর্মসংস্থান, রফতানি বৃদ্ধি, প্রযুক্তি গ্রহণ—এসব সূচকে মূল্যায়ন করে সহায়তা দেয়া ও প্রত্যাহার করতে হবে। ভৌগোলিক ভারসাম্যও জরুরি। শিল্প কার্যক্রম ঢাকাকেন্দ্রিক হলে আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়ে। নির্বাচিত জেলায় অবকাঠামো, দক্ষতা প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের ক্লাস্টার গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিনিয়োগ প্রশাসনে বাস্তব সংস্কার দরকার। ওয়ান-স্টপ সেবার কথায় কাজ হয়নি। নির্দিষ্ট সময়সীমা, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, নীরব অনুমোদন, কার্যকর আপিল ব্যবস্থা—এসব বাস্তবায়ন ছাড়া বিনিয়োগের গতি ফিরবে না।

 

 

রাজস্ব ও ব্যয়: উন্নয়নের আর্থিক ভিত্তি

 

 

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বে অন্যতম নিম্ন। স্থায়ী ব্যয় রাজস্বের বড় অংশ গ্রাস করে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা—সব খাতে ঘাটতি। নতুন সরকারকে দেশীয় সম্পদ আহরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি কেবল কর বাড়ানো নয়; একটি ন্যায়সংগত, পূর্বানুমানযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা। করভিত্তি প্রসারিত করতে হবে। ছাড় ও অব্যাহতি কমাতে হবে। ডিজিটালাইজেশন বাড়াতে হবে। প্রয়োগে স্বচ্ছতা আনতে হবে। সম্পত্তি কর বিশেষত শহরাঞ্চলে সম্ভাবনাময় উৎস। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমাতে শাসন ব্যবস্থা সংস্কার জরুরি। ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস দরকার। অকার্যকর ভর্তুকি পুনর্বিবেচনা করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এগুলো ব্যয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

 

 

ব্যাংক খাত: আস্থা ফিরিয়ে আনা

 

 

দুর্বল আর্থিক খাত দিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়—এটি এখন আর তাত্ত্বিক বক্তব্য নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতার ফল। অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল করা হয়েছে, আর শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আস্থাহীন করে তুলেছে। আমানতকারী উদ্বিগ্ন, বিনিয়োগকারী সতর্ক, আর উদ্যোক্তা অনিশ্চিত। এ অবস্থায় কেবল নতুন আইন প্রণয়ন বা কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস যথেষ্ট নয়; প্রয়োগই মূল চাবিকাঠি।

 

 

সাম্প্রতিক আইনি ও তদারকি সংস্কার অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কতটা নিরপেক্ষভাবে এবং কতটা ধারাবাহিকভাবে তা বাস্তবায়িত হবে? ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কাগজে-কলমে পুনঃতফসিল বা সময় বাড়িয়ে সমস্যাকে আড়াল করলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বাড়ে। ঋণ শ্রেণীবিন্যাসে স্বচ্ছতা, প্রকৃত সম্পদমান নির্ধারণ এবং দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। যে ব্যবস্থায় সৎ ঋণগ্রহীতা শাস্তি পায় আর প্রভাবশালী খেলাপি সুবিধা ভোগ করে, সে ব্যবস্থায় সুদের হার কমে না, বরং ঝুঁকি প্রিমিয়াম বাড়ে।

 

 

আমানতকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আমানতকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা, শেয়ারহোল্ডার বা দুর্বল ব্যবস্থাপনার সুরক্ষা নয়। যদি ক্ষতির ভার বারবার জনগণের ওপর চাপানো হয়, তাহলে শৃঙ্খলা ফিরবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও পেশাদারত্ব রক্ষা করতে হবে। তদারকি সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ কমাতে না পারলে সংস্কার ভঙ্গুরই থেকে যাবে। উচ্চ সুদের চক্র ভাঙতে হলে দুই দিকেই কাজ করতে হবে—একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে ব্যাংকের ঝুঁকি ও অদক্ষতা কমানো। ব্যাংকের ব্যালান্সশিট শক্তিশালী না হলে এবং খেলাপি ঋণ কমানো না গেলে ঋণের খরচ কমবে না। ফলে উৎপাদন ও বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে না।

 

 

একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য। অবকাঠামো, সবুজ জ্বালানি, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগের জন্য পাঁচ বা দশ বছরের ঋণ দরকার, যা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সবসময় দিতে আগ্রহী নয়। উন্নয়নমূলক অর্থায়ন যন্ত্র, ঋণ গ্যারান্টি স্কিম এবং একটি কার্যকর বন্ড বাজার এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য উপযোগী করপোরেট বন্ড বা প্রকল্পভিত্তিক বন্ড বাজার উন্নত করা দরকার। তবে এগুলোও কাগুজে কাঠামো হয়ে থাকলে লাভ নেই। মূল বিষয় হলো সুশাসন। স্বচ্ছতা, তথ্যপ্রকাশ, নিরপেক্ষ তদারকি এবং বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরবে না। আর্থিক খাতকে উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হলে সংস্কারকে ধারাবাহিক ও গভীর করতে হবে। সাময়িক স্থিতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসই হবে প্রকৃত নিরাময়।

 

 

 

কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও যুবসমাজ: বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত কাঠামো একদিকে বিশাল সম্ভাবনা, অন্যদিকে স্পষ্ট ঝুঁকি। কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়া কাগজে-কলমে আশীর্বাদ মনে হতে পারে, কিন্তু পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান ছাড়া সেই জনসংখ্যা দ্রুত চাপ হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে। অনেক তরুণ ডিগ্রি অর্জন করেও উপযুক্ত কাজ পাচ্ছে না। অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে, যেখানে আয় অনিশ্চিত, সামাজিক সুরক্ষা নেই, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও সীমিত।

 

 

 

সরকারকে তাই কর্মসংস্থানকে প্রবৃদ্ধির স্বয়ংক্রিয় ফল হিসেবে না দেখে একটি স্পষ্ট নীতিগত লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শ্রমঘন শিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল, সেবা খাত—এসব ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য সহজতর অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং প্রশাসনিক সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ বড় শিল্প একা সব কর্মসংস্থানের চাপ বহন করতে পারবে না।

 

 

প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। শিল্পের চাহিদা ও শিক্ষা ব্যবস্থার পাঠ্যক্রমের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষাকে আরো বাস্তবমুখী করতে হবে। শিল্প-শিক্ষা অংশীদারত্ব জোরদার করা জরুরি। দক্ষ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাক-প্রস্থান প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অনিয়ন্ত্রিত ভূমিকা কমানো গেলে প্রবাসী আয় বাড়বে এবং শ্রমিকদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সবচেয়ে বড় কথা, যুবসমাজকে নীতিনির্ধারণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। তরুণদের আকাঙ্ক্ষা ও হতাশাকে উপেক্ষা করলে প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না; বরং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়বে।

 

 

সামাজিক সুরক্ষা: অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির শর্ত

 

 

সামাজিক সুরক্ষা খণ্ডিত, বিচ্ছিন্ন এবং অনেক ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত। একই পরিবারের সদস্য ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্ত থাকলেও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, আবার অনেক প্রকৃত দরিদ্র সম্পূর্ণ বাইরে থেকে যায়। শহুরে ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে—অনিয়মিত আয়, উচ্চ ভাড়া, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি—কিন্তু অধিকাংশ নিরাপত্তা কর্মসূচি এখনো গ্রামকেন্দ্রিক নকশায় আবদ্ধ। তাই জীবনচক্রভিত্তিক, সমন্বিত এবং পূর্বানুমানযোগ্য একটি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। আপডেটেড ডেটাবেজের ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল প্লাটফর্ম এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়—এসব ছাড়া কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা সম্ভব নয়।

 

 

এ প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ‘‌ফ্যামিলি কার্ড’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদি এটি সঠিকভাবে নকশা ও বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বর্তমানে বিদ্যমান খণ্ডিত ও পুনরাবৃত্ত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে একীভূত করার একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। একটি একক পারিবারিক পরিচিতি ও ডেটাবেজের মাধ্যমে কে কোন সুবিধা পাচ্ছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কোথায় পুনরাবৃত্তি হচ্ছে—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেয়া সহজ হবে, আর একই পরিবারের নামে একাধিক সুবিধা নেয়ার সুযোগও কমবে। তবে নকশা যতই ভালো হোক, বাস্তবায়নে দুর্নীতি রোধ করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে দীর্ঘদিন ধরে যে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য রয়েছে, তা মোকাবেলায় কঠোর জবাবদিহি ব্যবস্থা দরকার। স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন, নিয়মিত অডিট, অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক পর্যবেক্ষণ—এসব নিশ্চিত করতে হবে।

 

 

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও গুণগত উন্নয়ন অপরিহার্য

 

 

শিক্ষা খাতে পরিমাণগত অগ্রগতি হয়েছে—ভর্তি হার বেড়েছে, অবকাঠামো বিস্তৃত হয়েছে, নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু গুণগত মানের প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা শ্রেণী উত্তীর্ণ হচ্ছে, অথচ মৌলিক দক্ষতা অর্জন করছে না। ভাষা, গণিত, বিশ্লেষণ ক্ষমতা—এ ভিত্তিগত সক্ষমতায় ঘাটতি স্পষ্ট। পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সংযোগ দুর্বল। ফলে ডিগ্রিধারী তরুণ বাড়ছে, কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠছে না। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকতা এবং বিদ্যালয় পর্যায়ে জবাবদিহি শক্তিশালী না করলে কেবল অবকাঠামো বাড়িয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। অনেক বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, কিন্তু গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্প সংযোগ এখনো সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক জ্ঞান বিতরণের জায়গা হিসেবে না দেখে জ্ঞানসৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিল্প খাতের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ বাড়ানো জরুরি। শিক্ষা তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন তা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াবে।

 

 

স্বাস্থ্য খাতেও একইভাবে গুণগত উন্নয়ন অপরিহার্য। অনেক এলাকায় স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে, কিন্তু চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি, ওষুধের অপ্রতুলতা এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সেবা গ্রহণকে কঠিন করে তোলে। শহর-গ্রাম বৈষম্য প্রকট। সরকারি ব্যয় বাড়ানো প্রয়োজন, তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সুশাসন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসায় গুরুত্ব এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন মানুষের আস্থা বাড়াতে পারে। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠীই উৎপাদনশীল অর্থনীতির ভিত্তি—এ উপলব্ধি নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আনতে হবে।

 

 

বাণিজ্য ও এলডিসি উত্তরণ

 

 

এলডিসি উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যনীতির গুরুত্ব আরো বেড়ে গেছে। বিশেষ সুবিধা ধীরে ধীরে কমবে, প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে কেবল কম দামের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। মান, নির্ভরযোগ্যতা, সময়মতো সরবরাহ এবং বিধিবিধান মেনে চলার সক্ষমতা—এসবই হবে মূল প্রতিযোগিতার ভিত্তি। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ শুল্ক ও প্যারা-ট্যারিফের মাধ্যমে যে রফতানিবিরোধী কাঠামো তৈরি হয়েছে, তা এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধাপে ধাপে শুল্ক সরলীকরণ, অপ্রয়োজনীয় কর ও নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ব্যবসায়ীরা যদি প্রতিনিয়ত নীতির পরিবর্তনের মুখোমুখি হন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

 

 

ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনেও বাস্তব অগ্রগতি প্রয়োজন। সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা, ঝুঁকিভিত্তিক কাস্টমস পরীক্ষা চালু করা, ইলেকট্রনিক ডকুমেন্টেশন ও দ্রুত ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিত করা—এসব পদক্ষেপ সরাসরি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারে। অনেক সময় বিদেশী শুল্কের চেয়ে দেশের ভেতরের জটিলতা ও বিলম্ব বেশি ব্যয় তৈরি করে। তাই বন্দর ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিক সংযোগ এবং সীমান্ত সংস্থাগুলোর সমন্বয় উন্নত করা জরুরি। একই সঙ্গে রফতানি বহুমুখীকরণ আর বিলাসিতা নয়; এটি এখন অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। পোশাক খাত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু নতুন খাতে প্রবেশ ও মূল্যসংযোজন বাড়ানো ছাড়া ঝুঁকি কমবে না।

 

 

এ প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছে, যা কৌশলগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে কেবল আবেদন করলেই হবে না; সফল হতে হলে শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। উন্নয়ন সহযোগী দেশ, বাণিজ্য অংশীদার এবং বহুপক্ষীয় ফোরামে সক্রিয় সমর্থন আদায় করতে হবে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুইদিন আগে যে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করেছে, তা সতর্কতার সঙ্গে পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। চুক্তির শর্তাবলি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য স্বার্থ, শিল্পনীতি এবং কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনে সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।

 

 

জলবায়ু, জ্বালানি ও গ্রামীণ উন্নয়ন

 

 

জলবায়ু ঝুঁকি এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, উপকূলীয় লবণাক্ততা—এসব কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এগুলো সরাসরি কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ আয়, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। তাই অভিযোজন ও প্রশমনকে আলাদা প্রকল্প হিসেবে নয়, মূলধারার উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণে জলবায়ু সহনশীল নকশা, কৃষিতে জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, নগর পরিকল্পনায় বন্যা ব্যবস্থাপনা—এসবকে বাধ্যতামূলক উপাদান করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ টেকসই হবে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, তবে তা হতে হবে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, গ্রিড সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ নীতিগত কাঠামোর ভিত্তিতে।

 

 

 

গ্রামীণ উন্নয়নকে অবহেলা করলে উন্নয়নের ভারসাম্য নষ্ট হবে। শুধু বড় অবকাঠামো প্রকল্প দিয়ে গ্রামাঞ্চলের কর্মসংস্থান ও আয় বৈচিত্র্য আনা যায় না। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজার সংযোগ উন্নত করা, গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে সহায়তা দেয়া এবং অকৃষি কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এসবকে সমন্বিতভাবে ভাবতে হবে। পানি ব্যবস্থাপনা, সেচ, স্থানীয় সড়ক, সংরক্ষণ অবকাঠামো—এসব বিনিয়োগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পারে। একটি শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতি শুধু দারিদ্র্য কমায় না; এটি শহরমুখী চাপও কমায় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতি শক্তিশালী করে।

 

 

পরিশেষে নতুন সরকার একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল কিন্তু ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। সামনে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন—আস্থা পুনর্গঠন, উৎপাদন বিস্তৃতি, রাজস্ব সংস্কার, আর্থিক খাত পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষায় জোর, এলডিসি-পরবর্তী প্রস্তুতি এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন। পথ সহজ নয়। স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিরোধ থাকবে, প্রশাসনিক জড়তা থাকবে। তবু বিকল্প নেই। এখন সিদ্ধান্তের সময়। যদি সরকার দূরদর্শিতা, শৃঙ্খলা ও অন্তর্ভুক্তির ভিত্তিতে এগোয়, তাহলে সংকট ব্যবস্থাপনা পেরিয়ে একটি টেকসই ও সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধির পথে যাওয়া সম্ভব। না হলে মূল্য চুকাতে হবে সুযোগ হারানো এক প্রজন্মকে।

 

 

ড. সেলিম রায়হান: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম