অর্থনীতি কি গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছে
দেশের অর্থনীতি এখন একসঙ্গে কয়েকটি চাপে আছে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি কমেনি, মানুষের আয় চাপে, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি দুর্বল। বিনিয়োগও প্রত্যাশামতো বাড়ছে না। এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি ও বৈদেশিক খাতে চাপের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা আরও কঠিন হতে পারে। এ অবস্থায় নতুন সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন একটাই—কোন সমস্যাকে আগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে? মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাত, নাকি জ্বালানি। শওকত হোসেন, ঢাকা [আপডেট : প্রথম আলো, ১৬ এপ্রিল ২০২৬]


বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যেই নতুন সরকার অর্থনীতির দায়িত্ব নিয়েছে। টানা তিন বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল। এতে অর্থনীতির পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করার সক্ষমতা কমে গেছে।
সংকটে আছে দেশের আর্থিক খাত। কয়েকটি ব্যাংক চালু রাখতে সরকারকে তারল্যসহায়তা দিতে হচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে। ফলে এখন সরকার চাইলেও অর্থনীতিকে চাঙা করতে অর্থের খরচ বাড়াতে পারছে না।
প্রবাসী আয় বাড়ায় বৈদেশিক খাতের চাপ কিছুটা কমলেও রপ্তানি আরও দুর্বল হয়েছে। এর মধ্যে আবার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অর্থনীতির আরও ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, রপ্তানি দুর্বল হতে পারে, প্রবাসী আয় কমতে পারে, আর তাতে চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়বে।
ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে টাকার আরও অবমূল্যায়নের আশঙ্কা আছে, যা মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়াবে। এখন জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাড়লে সরকারের আর্থিক জায়গা আরও সংকুচিত হবে।
সব মিলিয়ে, অর্থনীতি আগে থেকেই সমস্যায় ছিল, ছিল নানা ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা। আর এখন সেই অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ অবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে, আস্থা পুনরুদ্ধার করতে, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে এবং অর্থনীতিকে আরও টেকসই রাখতে একটি সুসংগঠিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কৌশল দরকার, আর এর সঙ্গে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।
দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ শুরু হয়েছিল কোভিডের সময় থেকে। গত আওয়ামী লীগের সময় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। শেষ দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদের হার বাড়ালেও তত দিনে অনেক বেশি দেরি হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতি সুদহার ক্রমে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমেছে। টানা তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে দেশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী এখন মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি বাড়ছে। মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেলে সাধারণত তারা কম খরচ করে এবং সঞ্চয় বাড়ানোর চেষ্টা করে। এতে বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে যায়। চাহিদা কমে গেলে ব্যবসা ও শিল্পে এর প্রভাব পড়ে। এতে উৎপাদন হ্রাস পায়, নতুন বিনিয়োগও শ্লথ হয়। এর সবই ঘটেছে বাংলাদেশে।
বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন সরকারের ওপর সুদহার কমানোর চাপ আছে। তবে এখনই সুদহার বাড়ালে চাপ পড়বে মূল্যস্ফীতির ওপর। সরকারের অগ্রাধিকারই এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তা না হলে অর্থনীতি টেকসই হবে না।

২. কর্মসংস্থানে কী চাপ পড়বে
অর্থনীতি নিয়ে এখন উভয়সংকটে সরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নাকি বেকারত্ব কমানো—দ্বন্দ্বটা এ নিয়েই। সাধারণত সরকার যখন বেকারত্ব কমাতে চায়, তখন বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়। এতে মানুষের হাতে টাকা যায়, চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা আবার পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতির হারকেই বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির হার কমানোর জন্য সুদের হার বাড়াতে হয়। এতে বিনিয়োগ কমে যায়, বাড়ে বেকারত্ব। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন পথ যাবে সরকার।
বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কোনো একটি সমস্যাকে বেছে নেওয়া নয়; বরং কীভাবে একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়, সেই ভারসাম্য খুঁজে বের করা।

৩. এখনই প্রবৃদ্ধি নয়, আগে স্থিতিশীলতা
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে তার পরই নজর দিতে হবে প্রবৃদ্ধির দিকে, তার আগে নয়। বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে ছিটকে পড়েছিল কোভিডের সময় থেকেই। মাঝখানে দুই অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উচ্চ প্রবৃদ্ধির তথ্য দেওয়া হলেও তা বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। ২০২২–২৩ অর্থবছর থেকেই ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি কমেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ টানা তিন অর্থবছর কমেছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি।
করোনার পরে বিশেষজ্ঞদের অভিমত ছিল, প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার প্রতি মনোযোগ দেওয়া। তবে প্রথমে কোভিড এবং পরে ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি শুরুতে বিপাকে পড়লেও পরে বেশির ভাগ দেশই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। এখন কেবল টিকে থাকা নয়, ঘুরে দাঁড়ানোরও সময়। বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর জন্যও উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে। সুতরাং নতুন সরকারের জন্য এটিই প্রথম চ্যালেঞ্জ। ইরান যুদ্ধ এই চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

৪. দারিদ্র্য আবার আলোচনায়
মানুষের আয় কমে যাওয়ায় বেড়ে গেছে দারিদ্র্যের হার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ করেছিল ২০২২ সালে, তখন দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এর পরে আর কোনো খানা ব্যয় ও আয় (এইচআইইএস) জরিপ হয়নি। তবে গত নভেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার এখন ২১ দশমিক ২ শতাংশ, এই হিসাবে এখন দেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। ২০২৫ সালে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। দারিদ্র্য হারের এই পতন ঠেকাতে হলে মানুষের আয় বাড়াতে হবে।
দেখা গেছে উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশে ২০১৬ সাল থেকে দারিদ্র্যের হার হ্রাসের গতি কমে গেছে। প্রবৃদ্ধি আর আগের মতো একই গতিতে দারিদ্র্য কমাতে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশে এখন ১ শতাংশ জিডিপি বাড়লে দারিদ্র্য গড়ে দশমিক ৯ শতাংশ কমে যায়; আর দক্ষিণ এশিয়ায় ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়লে দারিদ্র্য কমে প্রায় দেড় শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি হলেও তার সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
৫. বৈষম্য অর্থনীতিকে দুর্বল করছে
বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ। বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী ২০১০ সালে দেশের জিনি অনুপাত ছিল ০.৪৫৮ শতাংশ, ২০২২ সালে তা আরও বেড়ে হয়েছে ০.৪৯৯ শতাংশ। তত্ত্বগতভাবে জিনি অনুপাত শূন্য দশমিক ৫০–এর কাছাকাছি পৌঁছানো মানে উচ্চ মাত্রার আয়বৈষম্য রয়েছে।

দেশের মোট আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ এখন মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাত; আর সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ মানুষ এখন জাতীয় আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, জাতীয় আয়ে মধ্যবিত্তের অংশ কমেছে। এর অর্থ হচ্ছে ভোক্তাচাহিদা কমে যাচ্ছে। অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে যাওয়াই এর প্রমাণ।
৬. প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কাজ কোথায়
বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেখা মিললেও তা ছিল কর্মসংস্থানহীন। অর্থাৎ জিডিপি বাড়ছে; কিন্তু বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের আয় বাড়ানোর মতো পর্যাপ্ত কাজ তৈরি হচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, দেশে ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছেছেন; কিন্তু এ সময়ে শ্রমবাজারে নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক তরুণই কাজ পাননি। আবার যাঁরা কাজ পেয়েছেন, তাঁদের মধে৵ প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্ত হয়েছেন কম উৎপাদনশীল কৃষি খাতে। উৎপাদনশীল শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমেছে।
দেখা যাচ্ছে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শিল্প খাত বছরে গড়ে ৯ শতাংশ হারে বেড়েছে; কিন্তু একই সময়ে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। আবার দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮২ শতাংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে এলেও এখানে কর্মসংস্থান হচ্ছে মাত্র ৬ শতাংশের মতো। অর্থাৎ রপ্তানিতে সাফল্য এলেও তা পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি করতে পারেনি।
বিনিয়োগের এতটা দুরবস্থা করোনা মহামারির সময়েও ছিল না। জ্বালানিসহ অবকাঠোমার সমস্যা আগে থেকেই ছিল, তবে তার চেয়েও বেশি ছিল আস্থাহীনতা। সরকার বেসরকারি খাতের আস্থা অর্জনের কোনো চেষ্টাও করেনি; বরং কারখানা বন্ধ হওয়ায় নতুন করে চাকরি হারিয়েছেন অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিক। এ অবস্থায় নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হচ্ছে বিনিয়োগ বাড়ানো।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নারীদের ক্ষেত্রে। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রতি পাঁচজন তরুণীর একজন কর্মসংস্থানে নেই। আবার শিক্ষিত তরুণীদের ক্ষেত্রে প্রতি চারজনের একজন কাজ পান না। শহরে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০১৬ সালে ৩১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩ সালে ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অনেক নারী এখন কৃষি খাতে কাজ করছেন, যেখানে তারা মূলত কম বেতনের অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত—এখন কৃষি খাতে কর্মীদের ৫৮ শতাংশই নারী। বিপরীতে শিল্প খাতে নারীর অংশ কমেছে, যা আগে তৈরি পোশাকশিল্পের প্রসারের কারণে বেড়েছিল। অর্থাৎ নারীরা চাকরি থেকে সরে যাচ্ছেন।
শ্রমশক্তিতে যুব অংশগ্রহণও কমেছে। ২০২৩ সালে যুব বেকারত্বের হার ছিল ৮ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের মধ্যে ছিলেন ১৪ শতাংশ। পাশাপাশি ১৬ শতাংশ তরুণ ছিলেন, যাঁরা কাজ, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ—কোনোটিতেই যুক্ত নন। এই তরুণদের মধ্যে ৭৩ শতাংশ নারী এবং ৬৩ শতাংশ শহরাঞ্চলের বাসিন্দা।
সুতরাং নতুন সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রতিবছর যে ২২ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, তাঁদের কাজের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।
৭. এ জন্য চাই নতুন বিনিয়োগ
অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ; আর এখন সরকারি খাতের ঋণ বেড়ে হয়েছে ৩৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের ঋণ আরও কমে হয়েছে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ। এমনকি জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগও অনেক কমে গেছে।
বিনিয়োগের এতটা দুরবস্থা করোনা মহামারির সময়েও ছিল না। জ্বালানিসহ অবকাঠোমার সমস্যা আগে থেকেই ছিল, তবে তার চেয়েও বেশি ছিল আস্থাহীনতা। সরকার বেসরকারি খাতের আস্থা অর্জনের কোনো চেষ্টাও করেনি; বরং কারখানা বন্ধ হওয়ায় নতুন করে চাকরি হারিয়েছেন অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিক। এ অবস্থায় নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হচ্ছে বিনিয়োগ বাড়ানো।
৮. বিনিয়োগে আস্থা ফিরবে কীভাবে
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেসরকারি খাতে বেশ কিছু ব্যবসায়ীর গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল। এই অলিগার্ক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় নীতি ও অর্থনীতির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করত। এতে ভালো উদ্যোক্তাদের একটি অংশ পিছিয়ে গেছে, আরেকটি অংশ সরকারের কাছে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল সেই সব অলিগার্ক ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও পাচার করা অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু করা। এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ একটি আস্থাপূর্ণ বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা। এ জন্য ব্যবসা পরিচালনার সময় ও ব্যয় কমাতে হবে।
৯. জ্বালানি খাত এখন বড় ঝুঁকি
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট বিনিয়োগের বড় বাধা। গ্যাস–সংযোগের কারণে কারখানা চালু না করতে পারার উদাহরণও আছে। বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে (২০০১–০৬) এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বলা হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বের ৩২টি দাতা দেশ ও সংস্থার পক্ষে বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীত ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন সে সময়ের বিশ্বব্যাংকের কন্ট্রি ডিরেক্টর ক্রিস্টিন ওয়ালিচ।
আর এখন তো সংকট বহুমুখী। চলমান ইরান যুদ্ধ জ্বালানিসংকট আরও তীব্র করেছে। ফলে সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও বেড়েছে। বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হবে। সেই জ্বালানি দেশে নিয়ে আসতে হবে। জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে মূল্য সমন্বয় করতে সরকার এরই মধ্যে একটি কমিটি করেছে। এখন দাম বাড়ালে এর প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে। আর তা না করলে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বাড়বে। সব মিলিয়ে জ্বালানি নিয়ে সরকার এখন উভয়সংকটে।
১০. এখনই সুদহার কমানো নয়
উদ্যোক্তারা এখন বিনিয়োগের বাধা হিসাবে উচ্চ সুদহারকেও দায়ী করছেন। তবে বাংলাদেশে উচ্চ সুদহারের কারণে বিনিয়োগ কমার তথ্য প্রমাণিত নয়; বরং উচ্চ সুদহারের মধ্যেও বিনিয়োগ বেড়েছে—এমন উদাহরণই বেশি। তবে উদ্যোক্তারা সব সময়েই চান সুদহার কমুক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়েছিল মূল্যস্ফীতিকে আটকে রাখতে। সারা বিশ্ব এভাবেই মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে; বরং বাংলাদেশ বিলম্বে এ পথে মুদ্রানীতি প্রয়োগ না করায় এর সুফল পায়নি।
বিএনপি সরকারের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এসেই সুদহার কমানোর কথা বলেছেন। এ জন্য মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠক ডাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদহার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দেশে বিনিয়োগও প্রয়োজন। তবে আপাতত সুদহারে হাত না দিতেই পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। এখন সরকারের অর্থনীতির সিদ্ধান্ত রাজনীতির চাপে কতটা প্রভাবিত হয়, এটি হবে তারই বড় পরীক্ষা।
১১. প্রতিশ্রুতি মেটানোর টাকা কোথায়
বিএনপি সরকার অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছে। যেমন ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বেকার ভাতা দেওয়া ইত্যাদি। এর বাইরে অন্তর্বর্তী সরকার বেতন কমিশনের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে গেছে। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে; আর এখন শুরু হয়েছে ভর্তুকির চাপ।
সুতরাং সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাড়তি অর্থ আসবে কোথা থেকে। কেননা, সরকারের রাজস্ব আয় অনেক কমে গেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে কর–জিডিপির অনুপাত বিগত সাত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তা ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।