কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

অর্থনীতি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব

মো. মাজেদুল হক [প্রকাশ: বণিকবার্তা, ২৭ নভেম্বর ২০২৫]

অর্থনীতি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব

অন্তর্বর্তী সরকার জোরালোভাবে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ চাচ্ছে। অন্যদিকে ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পেছাতে সরকারের মাধ্যমে জাতিসংঘের কাছে অনুরোধ জানাতে বলছে। এর কারণ বহুবিধ। সাধারণত জাতিসংঘ তিনটি মানদণ্ড বিবেচনা করে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণের জন্য সুপারিশ করে থাকে। এটা করে থাকে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি)। মানদণ্ডগুলো হলো—মাথাপিছু আয়, মানব উন্নয়ন সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দুর্বলতা। এখন প্রশ্ন হলো তিনটি মানদণ্ডে বাংলাদেশ কতটুকু এগিয়েছে? বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে এ তিন সূচকে অগ্রগতি দেখিয়েছিল। যে কারণে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি বাংলাদেশকে সুপারিশ করেছিল উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দেয়ার জন্য। সে সময় বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৩৪৬ ডলারের ওপর, মানবসম্পদ উন্নয়নের সূচক ছিল ৬৬ পয়েন্টের বেশি এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার সূচক ছিল ৩২ পয়েন্টের নিচে। অর্থাৎ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেতে জাতিসংঘের সব শর্ত পূরণ করতে সক্ষমতা অর্জন করেছিল।

 

 


উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বার্ষিক কান্ট্রি রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী এলডিসি উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি সূচকেই আবার উত্তীর্ণ হয়েছে বাংলাদেশ। সত্য যে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বেশি নেই। তবে প্রশ্ন হলো, এলডিসি উত্তরণের বিষয়ে বাংলাদেশ কতটুকু প্রস্তুতি নিয়েছে? সরকার স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) প্রণয়ন করেছে এবং এটা বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

 


এটা নিশ্চিত যে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেলে বাংলাদেশকে বাণিজ্য-সংক্রান্ত অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে। পাশাপাশি রফতানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেলে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে, ওষুধ উৎপাদনে পেটেন্ট ছাড় সুবিধা হারাবে (ট্রিপস চুক্তি কার্যকর হবে)। এছাড়া স্বল্প সুদে বৈদেশিক ঋণ বন্ধ হয়ে যাবে, আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া যাবে না, উন্নত দেশে শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এটাও সত্য যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হলে আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং দেশের ক্রেডিট রেটিং ভালো হবে।

 

 

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এ মুহূর্তে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে কতটুকু প্রস্তুত রয়েছে? অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয় নিয়ে কী ভাবছে? চলতি বছরের মার্চে এক বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এলডিসি উত্তরণে জাতিসংঘের দেয়া নির্ধারিত সময়সীমা পেছানো হবে না। সম্প্রতি ঢাকাভিত্তিক ১৬টি ব্যবসায়িক সংগঠন এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর জোর দাবি করেছে। ব্যবসায়িক সংগঠন বলছে, এলডিসি উত্তরণ ২০২৬ সালে হলে অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যবসায়িক সংগঠনের পাশাপাশি বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানও এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরছে। গবেষণায় বলা হচ্ছে, ৬-১৪ শতাংশ পর্যন্ত রফতানি কমে যাবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোয় জিএসপি সুবিধা (ইবিএ-এভরিথিং বাট আর্মস) বন্ধ হয়ে গেলে ১২ শতাংশ শুল্ক দিয়ে রফতানি করতে হবে। এছাড়া কিছু দেশের সঙ্গে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা চলমান, তা অকার্যকর হয়ে পড়বে।

 

 

সরকারের কাছে আমার সুপারিশ হলো এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পেছানো যাবে না। এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ালে বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য কতটুকু প্রস্তুতি নেবে? প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এত বছর কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে? বাংলাদেশ সরকার কি জানত যে তার এলডিসি উত্তরণে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে? জানত। কিন্তু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ২০২১ সাল থেকে শক্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়নি। প্রস্তুতির কাজ শুধু কমিটি গঠন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে জিএসপি সুবিধা—ইবিএ বন্ধ হলে ‘জিএসপি প্লাস’ সুবিধার মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা পাওয়া সম্ভব। ‘জিএসপি প্লাস’ সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে ৩২টি শর্ত (আন্তর্জাতিক কনভেনশন) পরিপালন করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কতটুকু অগ্রগতি করেছে? শর্তগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশকে ১৯৭৪ সালে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে জাতিসংঘ।

 

 

এ ৫০ বছর ধরে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) রফতানি পণ্য বৈচিত্র্যকরণে ব্যর্থ হয়। রফতানি পণ্য বৈচিত্র্যকরণের জন্য ১৭ বছর আগে ইপিবি ‘‌এক জেলা এক পণ্য’ ধারণা উদ্ভাবন করলেও সফল হয়নি। এরপর ২০২৪ সালে ‘‌এক গ্রাম এক পণ্য’ ধারণা চালু করলেও পরবর্তী সময়ে থেমে যায়। এমনকি কোনো দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হয়নি। একমাত্র ভুটানের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) হয়েছে। এত বছর ধরেও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা যায়নি। যার জন্য দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে শ্রমিক পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। দুঃখজনক যে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের তালিকায় ১২৫টি থাকলেও একটা পণ্য (তৈরি পোশাক) থেকে আসে মোট রফতানির ৮৪ শতাংশ, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বলেছেন বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে।

 

 

 

উল্লেখ্য, চীন কয়েক বছর আগ থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে রেখেছে, ভারত ২০১০ সাল থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। রফতানিতে বৈচিত্র্য আনতে না পারার কারণে সুবিধাগুলো কাজে লাগাতে পারেনি। এক অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান এলডিসি উত্তরণের পক্ষে কথা বলেছে। তিনি বলেন, পুরনো চিন্তা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেতে হবে।

 

 

 

এটা ঠিক, কর-জিডিপি অনুপাত না বাড়ার কারণে সামনের দিনে বৈদেশিক ঋণ লাগবে। দুঃখজনক যে লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনাল দুই বিদেশী কোম্পানির দায়িত্বে দেয়া হচ্ছে এবং তাদেরকে ১০ বছরব্যাপী ১০০ শতাংশ করমুক্ত সুবিধা দেয়া হচ্ছে। তাহলে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবেলা করা যাবে? অন্তর্বর্তী সরকার ৩৬ প্রকল্পের জন্য বৈদেশিক ঋণ খুঁজছে। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেলে বৈদেশিক ঋণের সুদহার বেশি হয়ে যাবে। সত্য যে এলডিসি উত্তরণে চ্যালেঞ্জ আছে। তার পরও প্রতিযোগিতা বিশ্বের সঙ্গে সমানতালে চলতে হলে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে থাকতে হবে। রাষ্ট্র চাইলে এলডিসি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সহজতর হবে।

 

 

 

রাষ্ট্র চাইলে গঠনতন্ত্র, বাক-স্বাধীনতা, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ শ্রম আইন অধ্যাদেশ-২০২৫ সংশোধন করা হয়েছে। এটা অবশ্যই ইতিবাচক। এলডিসি উত্তরণ হলে দেশের ওপর বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়ে যাবে। ফলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে, বৈশ্বিক বাণিজ্য বাড়বে। এলডিসি উত্তরণ হলে বাংলাদেশের পাসপোর্ট শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশের নাগরিকের সারা বিশ্বে সামাজিক মর্যাদা বেড়ে যাবে। করোনাভাইরাসের পর পরই বিশ্বে শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। যুদ্ধের প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। ব্যবসায়িক সংগঠন বলছে, এলডিসি উত্তরণ সময়সীমা ২০২৬-এর পরিবর্তে ২০৩২ সালে হোক। ২০৩২ সাল পর্যন্ত পৃথিবী কি শান্ত থাকবে? করোনাভাইরাসের মতো আর কি কোনো ভাইরাসের আবির্ভাব হবে না?

 

 

 

 এগুলো প্রাক্কলন করা কঠিন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসতে পারে। মালদ্বীপ ও নেপাল প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেছিল একসময়। সলোমান দ্বীপপুঞ্জে হঠাৎ গৃহযুদ্ধ দেখা দিয়েছিল। যে কারণে তাদের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পেছানো হয়েছিল। জাতিসংঘের যে সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের মর্যাদা বেড়ে যাবে, সে সুযোগ হাতছাড়া করা কোনোভাবেই ঠিক হবে না বাংলাদেশের। জাপানের সঙ্গে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) হচ্ছে। তবে এখন মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে। আসিয়ানভুক্ত দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করা অপরিহার্য। যদি বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক জোট/ব্লক-রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপের (আরসিইপি) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করা যায়, এলডিসি উত্তরণে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সহজতর হবে।

 

 

 বাংলাদেশের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ (রিজিওনাল কানেক্টিভিটি) বৃদ্ধি করতে হবে আঞ্চলিক বাণিজ্যের স্বার্থে। বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণ করে দক্ষ জনবল প্রেরণ করতে হবে। কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে রফতানি গন্তব্য বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্বল শ্রমবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে। একটা উদার বাণিজ্য নীতি প্রণয়ন করতে হবে। তাহলে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ থাকবে না। এখন বিশ্বের দরবারে রাষ্ট্রের মর্যাদা বৃদ্ধি জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই রাষ্ট্রের বৃহৎ স্বার্থে এলডিসি উত্তরণ সময়সীমা বাড়ানো যৌক্তিক হবে না।

 

 

 

সম্প্রতি ৮০তম জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে প্রধান উপদেষ্টা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাপরিচালকের সহায়তা চেয়েছে এলডিসি উত্তরণের বিষয়ে। যাতে বাংলাদেশ বাণিজ্য-সংক্রান্ত সুবিধা হারালেও যেন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এ বিষয়ে ডব্লিউটিওর মহাপরিচালক আশ্বস্ত করেছেন। বলা দরকার যে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৭৫ শতাংশই এখন ডব্লিউটিওর নিয়মে হয়। এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ডব্লিউটিওর সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। যদি এলডিসি উত্তরণের পর ডব্লিউটিওর ‘‌এনহ্যান্সড ইন্টিগ্রেটেড ফ্রেমওয়ার্কের (ইআইএফ)’ আওতায় সুবিধা পাওয়া যায়, তাহলে চ্যালেঞ্জ কমে যাবে। এছাড়া ডব্লিউটিওর ‘‌এইড ফর ট্রেড ইনিশিয়েটিভ’ সুবিধাভোগী বাংলাদেশ। ২০০৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ এ সুবিধার অধীনে ২৩ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে। এলডিসি উত্তরণের পর এ সুবিধা অব্যাহত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এ পদক্ষেপগুলো নেয়ার পাশাপাশি অর্থনীতি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

মো. মাজেদুল হক: অর্থনীতিবিদ এবং চেয়ারম্যান, পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টার (পিটিইআরসি)