অর্থবছরের বৈশ্বিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ
মো. জসিম উদ্দিন [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ০৯ নভেম্বর ২০২৫]

স্বাধীনতার পর, দেশের অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। কিন্তু আজকের বাংলাদেশ সেই সীমা পেরিয়ে এক বহুমুখী অর্থনীতির রূপ নিয়েছে। তৈরি পোশাক, রেমিট্যান্স, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা খাত আমাদের বৈশি^ক বাণিজ্যের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করেছে, যা একসময় কল্পনাও করা যেত না। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের আর্থিক কাঠামো কি বিশ্বমানের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারছে? কারণ এখনো আমরা জুলাই থেকে জুনকে অর্থবছর ধরে এগোচ্ছি। অথচ বিশ্ব অর্থনীতি চলে, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের ক্যালেন্ডার বর্ষে। এই অমিল বাজেট প্রণয়ন, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সেতুবন্ধন সবকিছুকেই কঠিন করে তুলছে। সময় এসেছে, নতুন করে ভাবার।
বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মতো জুলাই থেকে জুন অর্থবছর অনুসরণ করে আসছে। তখন এটি যৌক্তিক ছিল কারণ কৃষিচক্র, বর্ষা মৌসুম, বাজেট বরাদ্দ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জুলাই-জুন অর্থবছর বেশ মানানসই ছিল। কৃষি ছিল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ফলে কৃষি মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে, বাজেট প্রণয়ন সহজ হতো। কিন্তু আজকের বাংলাদেশ শুধু কৃষিনির্ভর নয়। আমরা রপ্তানিমুখী শিল্প, বৈদেশিক বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স এবং বৈশি^ক বাণিজ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছি। আমাদের বাণিজ্য অংশীদাররা ইউরোপ, আমেরিকা, জাপানসহ অধিকাংশ দেশ ক্যালেন্ডার বর্ষ অনুযায়ী অর্থবছর পরিচালনা করে। শুধু আমরা ব্যতিক্রমে রয়েছি, যা আন্তর্জাতিক লেনদেন, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং হিসাব-নিকাশে জটিলতা সৃষ্টি করছে। অর্থবছর শুধু হিসাব-নিকাশের সময়কাল নয়। এটি রাষ্ট্রের আর্থিক নীতি বাস্তবায়নের মূল কাঠামো। বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব সংগ্রহ, উন্নয়ন ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন সবকিছু অর্থবছরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
যখন অর্থবছরের সময়কাল বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না, তখন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে অমিল তৈরি হয়। অতএব, পরিবর্তিত অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের আর্থিক কাঠামোকে বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বিত করা সময়ের দাবি। বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দেশ জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর অনুসরণ করে। বাংলাদেশ একই চক্র গ্রহণ করলে বহুজাতিক কোম্পানি, দাতা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে সহজ হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্বৈত হিসাব কমবে, খরচ ও ঝামেলা কমবে এবং দেশের বাজার আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে, বছরের শুরুতেই প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু সম্ভব হবে, বর্ষার কারণে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম আরও সুষ্ঠু ও পরিকল্পিতভাবে চলবে।
জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর হলে, শিক্ষাবর্ষ, বাজেট এবং গবেষণা পরিকল্পনার মধ্যে কোনো ছয় মাসের ফারাক থাকবে না, ফলে মানবসম্পদ ও শিক্ষা উন্নয়নে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে। নতুন বছরের শুরুতেই বাজেট কার্যকর হলে সরকারি সংস্থা, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করতে পারবে, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করবে। সুতরাং আন্তর্জাতিক মান, বিনিয়োগ সুবিধা, কার্যকর বাজেট বাস্তবায়ন, শিক্ষা-গবেষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং ইতিবাচক অর্থনৈতিক মনোভাব সবদিকে জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর এখন সময়োপযোগী এবং অপরিহার্য। জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছরের পক্ষে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়েছেন।
ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীন একসময় এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেন। বলেছিলেন, ‘অর্থনীতিকে বৈশি^ক মানের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হলে, অর্থবছরের সময়কাল সেই অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে।’ এছাড়াও সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর ড. আতিউর রহমান এবং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য, বাজেট বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য এ রূপান্তর অপরিহার্য। অর্থনীতিবিদ ড. খোন্দকার ইকবাল হোসেনও এই ব্যবস্থার পক্ষে মতপ্রকাশ করেছেন। অর্থনীতি যখন বহুমুখী হয়ে গেছে, তখন শুধু কৃষি-চক্রকে অজুহাত হিসেবে ধরে রাখা সময়োপযোগী নয়।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দেখা গেছে, জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে কার্যকর। ভারত এবং পাকিস্তান বিষয়টি আলোচনা করেছে, যদিও তারা এখনো বাস্তবায়ন করেনি। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র দেশগুলো ক্যালেন্ডার বর্ষ অনুসরণ করে। তাদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং হিসাব-নিকাশের স্বার্থে এ কাঠামো অনেক বেশি সুবিধাজনক। বাংলাদেশও এখন দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম প্রবৃদ্ধির দেশগুলোর মধ্যে। আমরা এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে এগোচ্ছি।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের নীতি, কাঠামো এবং অর্থবছর সবকিছু আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর গ্রহণ করলে, আমরা বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে আরও সংগতি রাখব এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারব। বাংলাদেশ সবসময় প্রমাণ করেছে, প্রয়োজন হলে, পরিবর্তন করতে আমরা কখনো পিছপা হই না। একসময় কর আদায়, ব্যাংক ব্যবস্থা, এমনকি শিক্ষাবর্ষ নিয়েও বড় ধরনের সংস্কার আনা হয়েছে। অর্থবছরের পরিবর্তনও ঠিক এমনই একটি নীতি সংস্কার, যা দেশের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক প্রবাহের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করবে। অনেকে এটি ঝুঁকি মনে করতে পারেন, কিন্তু আসলে এটি সুযোগ। জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর গ্রহণ করলে, বাজেট ঘোষণার সময় হবে বছরের শুরুতে। তখন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম নতুন উদ্যমে শুরু হবে। বছরের শুরু মানেই নতুন সম্ভাবনা, নতুন লক্ষ্য, নতুন পরিকল্পনা। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও তখন প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের পথে এবং শিগগিরই এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে বেরিয়ে আসবে। এই রূপান্তরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোকেও আধুনিক করা জরুরি। জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর গ্রহণ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে, বাজেট বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে, শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ সময়মতো কাজে লাগানো যাবে। সবচেয়ে বড় কথা, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের সেতুবন্ধন আরও দৃঢ় হবে। অতএব, সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখনই সঠিক সময়। দেশের অগ্রগতির জন্য, এটাই অপরিহার্য।
লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর