অবশেষে স্রোত কি ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বইছে?
মোতালেব জামালী [সূত্র : আমার দেশ, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন কয়েকটি ইস্যু আছে, যেগুলো যুগ যুগ ধরে অমীমাংসিতই রয়ে গেছে এবং এগুলোর সমাধান করা অসাধ্য কাজ বলেই বিবেচিত হচ্ছে। ফিলিস্তিন ইস্যু তার একটি। এই জটিল ইস্যুর সমাধানে কূটনীতিকরা দশকের পর দশক ধরে আলোচনার টেবিলে বসেছেন, তৈরি করেছেন নানা পরিকল্পনা ও প্রস্তাবের খসড়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের এসব প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়েছে, চাপা পড়েছে বাস্তব পরিস্থিতির ওজনের নিচে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় আবারও এই সত্য সামনে চলে এসেছে। ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে চূড়ান্ত লড়াই কেবল সম্মেলন কেন্দ্রগুলোতেই হচ্ছে না, মাঠেও তা গড়িয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের হামলার দ্বিতীয় বার্ষিকী সামনে রেখে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদানের ঢেউ উঠেছে ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বে। ২৭ সদস্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই স্বীকৃতি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের লড়াই-সংগ্রামে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার ২১ সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর সেদিনই তাদের সরকারি ওয়েবসাইটে ফিলিস্তিনের একটি মানচিত্র আপডেট করা হয়, যেখানে আগের ‘অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চল’ লেখার পরিবর্তে এখন ‘ফিলিস্তিন’ উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান এবং ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
অনেক বিশ্লেষক ইউরোপের দেশগুলোর এই স্বীকৃতিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইলপন্থি নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র মুখে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের কথা বললেও বাস্তবে ইসরাইলের দখলদারি ও সম্প্রসারণবাদী নীতিকেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ইহুদি বর্ণবাদী দেশটিকে কার্যত ‘ব্ল্যাংক চেক’-ই দিয়ে রেখেছে ওয়াশিংটন।
গাজায় গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে আমলে নিয়ে স্লোভেনিয়া সরকার দেশটিতে নেতানিয়াহুর প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এছাড়া গাজা অভিমুখে ত্রাণবাহী জাহাজ বহর গ্রিসে পৌঁছালে সেখানে ইসরাইল ড্রোন হামলা চালায়। এরপরই এই ত্রাণ বহরের নিরাপত্তায় যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে ইতালি ও স্পেন। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর এসব পদক্ষেপকে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের মীমাংসার পথে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।
ইহুদি বর্ণবাদী রাষ্ট্রটির সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের লড়াই-সংগ্রাম প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে ১৯৭৪ সালে। এ বছর প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও) ফিলিস্তিনিদের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ করে। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পথে এই স্বীকৃতি ছিল প্রথম বড় একটি অর্জন, যা ফিলিস্তিনিদের লড়াইকে আইনগত বৈধতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়।
এরপর ১৯৮৮ সালে আলজিয়ার্সে ইয়াসির আরাফাত স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ঘোষণা করার পরপরই প্রথম দেশ হিসেবে আলজেরিয়া ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর আরব বিশ্বসহ শতাধিক দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু সেই সময় থেকে পরের দশকগুলোয় ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো এ ব্যাপারে নীরব ছিল। ১৯৯৩ সালে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে অসলো চুক্তি স্বাক্ষর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কিছুটা আশার সঞ্চার করে। কারণ এ সময় যুক্তরাষ্ট্র ‘দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান’ নিয়ে আলোচনায় বসতে ইসরাইলের ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু ইসরাইল দখলকৃত ভূখণ্ডে অবৈধ ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখলে দ্রুতই এই আশা শূন্যে মিলিয়ে যায়।
তবে জাতিসংঘ ২০১২ সালে ফিলিস্তিনকে ‘অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের’ মর্যাদা দিলে তা ফিলিস্তিনের জন্য একটি প্রতীকী বিজয় বয়ে আনে। এখন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেনসহ ইউরোপের দেশগুলোর ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি প্রদানকে একটি কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই সমর্থনের প্রেক্ষাপটেই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরে কখনোই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হবে না।’ কিন্তু ফিলিস্তিনকে পশ্চিমা দেশগুলোর স্বীকৃতি এটাই প্রমাণ করে, তারা ইসরাইলের এসব বক্তব্যকে মোটেই পাত্তা দিচ্ছে না।
অবশ্য কোনো কোনো বিশ্লেষক পশ্চিমা দেশগুলোর ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি প্রদানকে একটি ‘ফাঁপা’ বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তারা বলছেন, এই স্বীকৃতির কোনো গুরুত্ব নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ফিলিস্তিনকে দেওয়া এই স্বীকৃতি মোটেই গুরুত্বহীন নয়। কারণ এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনের আইনি বৈধতাকে আরো জোরদার করবে—আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতসহ (আইসিসি) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করা সহজ হবে ফিলিস্তিনের। একইসঙ্গে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করারও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পশ্চিমা দেশগুলোর স্বীকৃতিতে ফিলিস্তিনিদের মনোবল যেমন বাড়বে, তেমনি চাপ বাড়বে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে পশ্চিমা দেশগুলোসহ ১৫৮টি দেশের স্বীকৃতি ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রামে নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন পরে হলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।
এই পরিবর্তনের হাওয়ায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাট সদস্যদের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি প্রদানের একটি প্রস্তাব। সিনেট পররাষ্ট্র সম্পর্ক-বিষয়ক কমিটির সদস্য জেফ মার্কলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে গত বৃহস্পতিবার সিনেটে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দুর্দশা ও নিরাপত্তাহীনতা’ দূর করার ‘একমাত্র নির্ভরযোগ্য পন্থা’ হচ্ছে ফিলিস্তিনকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়া, যেখানে ইসরাইলিরা ও ফিলিস্তিনিরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটাই হবে সঠিক পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলপন্থি লবিং গ্রুপ ‘জে স্ট্রিট’ ডেমোক্র্যাট সিনেটরদের এই প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আরব দেশগুলো কি ফিলিস্তিনির পক্ষে সৃষ্ট এই ঢেউকে কাজে লাগাতে পারবে? না পারলে সেটা হবে আরব দেশগুলোর চরম ব্যর্থতা এবং নিজেদের অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি। কারণ নেতানিয়াহু ও তার সরকারের উগ্রপন্থি মন্ত্রীরা ‘গ্রেটার ইসরাইল’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে হুংকার দিচ্ছেন, তা কেবল গাজা ও পশ্চিম তীরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার প্রমাণ এরই মধ্যে নেতানিয়াহু দিয়েছেন। ইসরাইলের দুই বছরের যুদ্ধে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল ও গাজা ধ্বংস হয়ে গেছে।
গত ডিসেম্বরে বাশার আল আসাদের পতনের পর সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল দখল করেছে ইসরাইল। ইরানে হামলা চালিয়ে শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন এবং ইয়েমেনের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করেছে ইহুদি বর্ণবাদী দেশটি। নেতানিয়াহু গাজা থেকে ১০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে মিসরের সিনাই এলাকায় ঠেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, যা দেশটির নিরাপত্তার ওপর গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে। এজন্য মিসর তার এই সীমান্তে সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে কার্যত যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়েছে। সর্বশেষ, কাতারে হামলা চালিয়ে ইসরাইল প্রমাণ করেছে, তাদের আগ্রাসন থেকে এই অঞ্চলের কোনো দেশই নিরাপদ নয়।
ইসরাইলের এই হুমকির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক যুগ-সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিভেদ ভুলে সব দেশ এক হয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়। কেবল কূটনীতি নয়, কৌশলগত ক্ষেত্রেও নিজেদের প্রভাব ও সক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে। তাদের উচিত হবে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা ইসরাইলকে সংযত রাখতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি ইরান, তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর উচিত হবে শক্তিশালী সামরিক জোট গঠনের পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করা। এসব পদক্ষেপ ইসরাইলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকেও মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারে সংযত হতে বাধ্য করবে।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ