কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ন্যায্য রূপান্তর ছাড়া টেকসই ভবিষ্যৎ অসম্ভব

অন্‌জন কুমার রায় [প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ২৫ নভেম্বর ২০২৫]

ন্যায্য রূপান্তর ছাড়া টেকসই ভবিষ্যৎ অসম্ভব

র‌্যাচেল কার্সনের লেখা Silent Spring বইয়ের ‘A Fable for Tomorrow’- অধ্যায়ে একটি কাল্পনিক শহরের দুঃস্বপ্নের চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে। যেখানে ছিল পাখির গান, ফুলের সুবাস, কলতান, মানুষ, প্রাণী, গাছ-গাছালি। কিন্তু এক সময় পাখি হারিয়ে যায়, মাছ নষ্ট হয়, মানুষ ও পশুদের প্রাণ উপেক্ষিত থাকে। র‌্যাচেল কার্সন এটি লেখেন একটি গভীর ও যুক্তিসমর্থক সতর্কবাণী হিসেবে। লেখক দেখাতে চেয়েছিলেন যে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কোন নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সম্প্রসারিত হলে মানুষের কর্মকাণ্ড শুধু ব্যবধান ঘটায় না, বরং প্রকৃতির মৌলিক কাঠামো- জীববৈচিত্র্যের পারস্পরিক নির্ভরতা ধ্বংস করতে পারে। Silent Spring- এর ‘A Fable for Tomorrow’ আজকের জলবায়ু সংকটের প্রতিচিন্তা হিসেবে আবর্তিত হতে পারে। কারণ, কার্সন বলেছিলেন, আমরা যদি দ্রুত প্রযুক্তি ও শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করার যুক্তি ও কাঠামোগত পরিবর্তন না আনতে পারি, তাহলে সেই নীরব বসন্ত আমাদের ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এটি শুধু একটি উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং এটি সিস্টেম চেঞ্জ ও ন্যায্য রূপান্তর (Just Transition) আলোচনার প্রাসঙ্গিক ভিত্তি। কার্সন দেখান যে, প্রযুক্তি ও পণ্যের ব্যবহার যখন লাভ বা দক্ষতার দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত হয় এবং পারিপার্শ্বিক ক্ষতি, সামাজিক প্রভাব ও দূরবর্তী প্রভাব উপেক্ষা করা হয়, তখন এটি একটি অস্থির ও অনিরাপদ পৃথিবীর দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

 


তাই, আধুনিক শিল্পসভ্যতায় কার্বন নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা পরিবর্তিত না হলে Silent Spring- এর নীরবতা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বাস্তবে রূপ নেবে। বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা যায় যে, ১৮৫০ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য ৮০% দায় মাত্র ২০টি দেশের। এদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, রাশিয়া ইত্যাদি। জলবায়ু সংকটের কারণে অনুন্নত, উপকূলীয় ও নিম্নভূমির দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ৩০ এর গবেষণা ভিত্তিক যুক্তি উঠে এসেছে যে, জলবায়ু নীতি এখন আর শুধু কার্বন কমানোর পরিকল্পনা নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্ন। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা তিনটি বড় কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তা হলো, উচ্চ কার্বন নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা, বৈষম্য বৃদ্ধি করে এমন বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতি ও উন্নত দেশগুলোর শিল্পায়নের সুবিধা নিশ্চিত রাখার জন্য নির্মিত আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা। এই তিনটির সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে একটি ‘কার্বন লক-ইন স্ট্রাকচার’ যা বদলানো ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণায়ন থামানো সম্ভব নয় (কার্বন লক-ইন বলতে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায় যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিতে এত বেশি বিনিয়োগ করা হয় যে এটি একটি নির্দিষ্ট কার্বন-নিবিড় পথে আটকে থাকে)। তাই কপ৩০ সম্মেলনে সিস্টেম চেঞ্জের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। সিস্টেম চেঞ্জের মূল তিনটি স্তম্ভ হবে: (১) জ্বালানি ব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তর- জীবাশ্ম জ্বালানি নিষ্কাশন থামানো এবং নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস সম্প্রসারণ, (২) বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার- ঐতিহাসিকভাবে দায়ী দেশগুলোর পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক অর্থায়ন এবং (৩) রাজনৈতিক ন্যায়বিচার- আদিবাসী জনগোষ্ঠী, শ্রমিক, কৃষক এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা।

 

 


ব্রাজিলের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওঘচঊ INPE (National Institute for Space Research)- এর তথ্য মতে, গত ৪০ বছরে অ্যামাজনের ১৭% বন উজাড় হয়েছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবে ‘টিপিং পয়েন্ট’ নামে পরিচিত। এই ডেটা কপ৩০ আলোচনায় একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেয়। কারণ অ্যামাজন ধ্বংস হলে বিশ্বব্যাপী কার্বন শোষণ ক্ষমতা কমে যাবে। গবেষণা বলছে, অ্যামাজন রক্ষায় কেবল পরিবেশ নীতি নয়, বরং সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন, অর্থনীতি, অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে। এজন্য বৈশ্বিকভাবে প্রয়োজন ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ অর্থাৎ, ন্যায়ভিত্তিক রূপান্তর নীতি। যেখানে রয়েছে শ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষতি কমানো, দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন চাকরি সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালীকরণ এবং অংশগ্রহণমূলক নীতি। সম্মেলনে আরও উত্থাপিত হয়েছে শুধু নবায়নযোগ্য শক্তির প্রযুক্তি বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি বাড়লে জ্বালানি ব্যবহারের সামগ্রিক হার বেড়ে যেতে পারে যাকে বলা হয় ‘রিবাউন্ড ইফেক্ট’। তাই বৈজ্ঞানিকভাবে সিস্টেম চেঞ্জকে অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করতেই হবে। কারণ, ধনী দেশগুলো উন্নয়নের নামে এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পে ভর্তুকি দেয়। এই ভর্তুকি সিস্টেম চেঞ্জকে বাঁধাগ্রস্ত করার অন্যতম একটি কারণ। তাই রূপান্তরের জন্য প্রযুক্তিগত নয়, বরং নীতি, অর্থায়ন ও সামাজিক কাঠামোর সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন যা কপ৩০-তে বিশেষ প্রাধান্য পায়।

 

 

 


সম্মেলনে উঠে আসে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর কৃষি, খাদ্য ও শিল্পনীতিতে যে পরিবর্তন আনতে চাইছে, তা বহুজাতিক কোম্পানির বাজার নিয়ন্ত্রণের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পরিবেশবান্ধব কৃষিনীতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সিস্টেম চেঞ্জের জন্য বাজার কাঠামোর ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে। সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান। গবেষণা বলছে- বিশ্বের যে ৮০% জীববৈচিত্র্য এখনো টিকে আছে তার বেশিরভাগই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূখণ্ডে। কারণ তারা প্রকৃতি নির্ভর টেকসই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করে। কপ৩০-তে আদিবাসী প্রতিনিধিরা গবেষণা উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, বন রক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো ‘ইন্ডিজেনাস-লেড কনজারভেশন’। এই যুক্তি থেকে জাস্ট ট্রানজিশনের ধারণায় যোগ হয়েছে ‘সাংস্কৃতিক ন্যায়বিচার’ অর্থাৎ রূপান্তরের সময়ে সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষা করতে হবে। গবেষকরা আরও দেখান যে, জলবায়ু সংকট শুধু পরিবেশ নয় বরং অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্যব্যবস্থা, পানি, শ্রমবাজারসহ সব কিছুকে প্রভাবিত করছে। WHO- এর গবেষণায় দেখা গেছে- ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু সংকট জনস্বাস্থ্যে এমন চাপ সৃষ্টি করবে যার ফলে দরিদ্র দেশের স্বাস্থ্য ব্যয় এউচ-র ৪৫% পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সম্মেলনে এই গবেষণাগুলো দেখিয়ে বোঝানো হয়েছে যে, জাস্ট ট্রানজিশন কেবল শ্রমিক কেন্দ্রিক নয়, স্বাস্থ্য ও মানব উন্নয়ন কেন্দ্রিক হতে হবে।

 

 


বৈশ্বিক গবেষণা একটি সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, এখন দরকার ‘চরম দ্রুত রূপান্তর’ বা Rapid Systemic decarbonization। বিজ্ঞানীদের মতে, যদি ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমপক্ষে ৪৩% কমানো না যায়, তাহলে ‘বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না’ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হবে। তাই কপ৩০- এ জোরালোভাবে বলা হয়েছে, ২০২৫- এর মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি সম্প্রসারণ বন্ধ করে কয়লা, তেল, গ্যাস প্রকল্পে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। এছাড়াও, জাস্ট ট্রানজিশনে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের খরচ উন্নত দেশের তুলনায় বেশি। তাই, কপ৩০- সম্মেলনে একটি নতুন প্রস্তাব এসেছে- ‘নেট জিরো নয়, নেট জাস্ট’। অর্থাৎ শুধু নিট কার্বন শূন্য লক্ষ্য নয়, ন্যায্য কার্বন রূপান্তর লক্ষ্য। কারণ, ন্যায্যতা ছাড়া রূপান্তর হলে তা শুধু সমাজে বৈষম্য বাড়াবে, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত লক্ষ্য ভেস্তে যাবে। তাই সিস্টেম চেঞ্জ এখন বৈজ্ঞানিক বাধ্যবাধকতা, নৈতিক দায়িত্ব ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা- তিনের সমন্বিত ফল।

 

 

 


বিশ্বকে বাঁচাতে হলে প্রযুক্তিগত সমাধান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অর্থনৈতিক কাঠামোর পুনর্গঠন, নীতি-গবেষণার সমন্বয় এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। সিস্টেম চেঞ্জ মানে উন্নয়ন দর্শন বদলানো। শোষণমুখী প্রবৃদ্ধি থেকে ন্যায়ভিত্তিক মানবিক উন্নয়ন। আর জাস্ট ট্রানজিশন মানে রূপান্তরের পথটি যেন সকল মানুষের জন্য নিরাপদ হয়। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, যে পদক্ষেপ আগামী পাঁচ বছরে নেওয়া হবে তাতেই নির্ধারিত হবে পৃথিবী শতাব্দীর শেষে কেমন থাকবে। এ কারণেই কপ৩০-এ গৃহীত আলোচনা শুধু কূটনীতি নয়, বরং বৈজ্ঞানিক বার্তার প্রতিফলন। তবে, আশার কথা ‘Belem 4X’ অঙ্গীকারে ২৩টি দেশ ঘোষণা করেছে ২০৩৫-এর মধ্যে টেকসই জ্বালানির ব্যবহার চারগুণ বৃদ্ধি করবে। এটি শুধু জলবায়ু দৃষ্টিকোণেই নয়, সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বড় পদক্ষেপ হতে পারে।