ন্যানো প্রযুক্তি টেকসই কৃষির নতুন পথ
ড. মো. আনোয়ার হোসেন প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা আবারও দেখিয়ে দিল বৈশি^ক অর্থনীতি ও কৃষি কতটা নিবিড়ভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। জ্বালানি, গ্যাস ও কাঁচামাল সরবরাহে বিঘœ ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষি উপকরণের বাজারে। বিশেষ করে, সারের দামে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়া সারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইউরিয়ার মূল্যবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইউরিয়া সারের মূল্য প্রায় ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
যা গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী মূল্য থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। এই প্রবণতা শুধু বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা নয়, বরং এটি বৈশি^ক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য একটি সতর্ক সংকেত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন সংকট আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। দেশের খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি ধান উৎপাদন। যা বহুলাংশে ইউরিয়া সারের ওপর নির্ভরশীল। দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৬ লাখ টন ইউরিয়ার চাহিদা থাকলেও দেশীয় বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ১০ লাখ টন; বাকি প্রায় ১৫১৬ লাখ টনের মতো আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা সরাসরি দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যয়, খাদ্যমূল্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলার সংকট, এলসি খোলার জটিলতা এবং জ্বালানি ঘাটতির কারণে সার আমদানির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি সরবরাহকারীরা সার্বিক জটিলতা বিবেচনা করে নতুন রপ্তানিতে অনীহা দেখাচ্ছে। ফলে আসন্ন মৌসুমে সারের প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশে মোট সারের চাহিদা প্রায় সাড়ে ৬৮ লাখ টন, যেখানে শুধু ইউরিয়া সারের চাহিদাই প্রায় ২৬ লাখ টন। অথচ এর বিপরীতে ইউরিয়াসহ, অন্যান্য সারের মোট মজুদ রয়েছে মাত্র প্রায় ১৮ লাখ টন।
এই বিশাল ঘাটতি পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববাজারে সারের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বহুমাত্রিক কারণ রয়েছে। ইউরিয়া উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস। ফলে গ্যাসের দামের ওঠানামা সরাসরি ইউরিয়ার বাজারকে প্রভাবিত করে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, ইউরোপে জ্বালানি সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী সারের সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫-২৬ সময়কালে জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
বাংলাদেশে এই পরিস্থিতির প্রভাব কেবল কৃষকের উৎপাদন ব্যয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গেও জড়িত। দেশে ইউরিয়া সারে সরকার বিপুল ভর্তুকি প্রদান করে থাকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাজেট ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় কৃষি ভর্তুকি বাবদ ২৫ হাজার কোটি টাকা চেয়েছিল। কৃষি মন্ত্রণালয় যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাওয়া ভর্তুকির চেয়ে ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। তবে অর্থ বিভাগ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মতো ভর্তুকির পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকাই রাখার পক্ষে মত দেওয়া হয়। কৃষি ভর্তুকির সিংহভাগ যায় সারে। কৃষির আধুনিকায়নের লক্ষ্যে যন্ত্রপাতি কেনা, কৃষি পুনর্বাসন ও গবেষণাতেও ভর্তুকি দেয় সরকার। এর বাইরে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের সরাসরি কিছু ভর্তুকি দেওয়া হয়ে থাকে।
একটি বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, শুধু সারের জন্য কৃষক যেখানে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেন, সেখানে সরকারকে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এই ভর্তুকির পরিমাণ আরও বাড়বে, যা বাজেট ঘাটতি ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করতে পারে। এদিকে প্রচলিত দানাদার ইউরিয়া সারের ব্যবহার দক্ষতা তুলনামূলকভাবে কম। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত ইউরিয়া ব্যবস্থাপনায় ফসল সাধারণত ৩০-৪০ শতাংশ নাইট্রোজেন শোষণ করে থাকে। উন্নত ব্যবস্থাপনায় শোষণ হার ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত উঠাতে পারে।
বাকি অংশ ভোলাটিলাইজেশন, লিচিংসহ বায়ু, পানি ও মাটিতে অপচয় হয়। এই অপচয়ের ফলে একদিকে যেমন কৃষকের আর্থিক ক্ষতি হয়, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণও বাড়ে। ২০২৪ সালে FAO এর তথ্যমতে, নাইট্রোজেনের একটি অংশ নাইট্রাস অক্সাইড ((N2O) হিসেবে বায়ুমণ্ডলে গিয়ে শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাসে পরিণত হয়। যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ বেশি তাপধারণ ক্ষমতা রাখে যা জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রতি টন ইউরিয়া উৎপাদনে প্রায় ২.৬৮ টন CO2নির্গমন হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া ইউরিয়া উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ পানি ও শক্তির প্রয়োজন হয়। সেখানে প্রতি টনে প্রায় ৩০ গিগাজুল শক্তি এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। সেই কারণে প্রচলিত ইউরিয়া নির্ভর কৃষিব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগতভাবে টেকসই নয়।
অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে মাটির জৈবগুণ কমে যায়, উপকারী অণুজীবের কার্যকারিতা হ্রাস পায় এবং মাটির ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে কৃষিজমি থেকে বয়ে যাওয়া নাইট্রোজেন, জলাশয়ে জমা হয়ে ইউট্রিফিকেশন সৃষ্টি করে, যা জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরিয়ার প্রভাবে মাছের বৃদ্ধি কমে যায়, অক্সিজেন গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হয় এবং প্রজনন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে ন্যানো প্রযুাক্তিনির্ভর সার, বিশেষ করে ন্যানো ইউরিয়া, একটি যুগান্তকারী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। IFPRI -এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ন্যানো ইউরিয়ার কার্যকারিতা প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যেখানে প্রচলিত ইউরিয়ার কার্যকারিতা প্রায় ৪৫ শতাংশ।
ফলে একই ফলন পেতে অর্ধেক পরিমাণ সারই যথেষ্ট হতে পারে। বাংলাদেশসহ ভিয়েতনাম, চীন, ভারত ইত্যাদি বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণায় ধান, গম, ভুট্টা, আলু এবং উদ্যান জাতীয় ফসলে ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহার করে প্রচলিত ইউরিয়ার ব্যবহার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে ফলন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভারতের ইফকো (IFFCO) ইতোমধ্যে ন্যানো ইউরিয়া বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করেছে এবং দেশটির লাখ লাখ কৃষক এটি ব্যবহার করছেন। ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে সারের ব্যবহার কমেছে, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IFPRI) টেকসই কৃষির জন্য ‘নিউট্রিয়েন্ট ইউজ এফিসিয়েন্সি’ বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। তাদের মতে, ভবিষ্যতের কৃষি হবে কম ইনপুটে বেশি উৎপাদন নিশ্চিত করার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে ন্যানো প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ন্যানো ইউরিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
IFPRI -এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহার করলে প্রতি হেক্টরে প্রচলিত ইউরিয়া প্রয়োগের পরিমাণ কমে যায় প্রায় ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ৫০০ মিলি ন্যানো ইউরিয়া, প্রায় ৫০ কেজি দানাদার ইউরিয়ার সমতুল্য। এতে পরিবহন, সংরক্ষণ এবং প্রয়োগ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। হিসাব বলছে, ন্যানো ইউরিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে ইউরিয়া আমদানি খরচ প্রায় ৫৮ শতাংশ কমানো সম্ভব এবং সরকারি ভর্তুকি ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। এই সাশ্রয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে কিছু নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে ন্যানো বা তরল সারের পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন নেই, ফলে এটি বাণিজ্যিকভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। গবেষণায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলেও, তা মাঠপর্যায়ে বিস্তৃতভাবে প্রয়োগের সুযোগ সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত একটি বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করে, ন্যানো সারের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা দরকার। একইসঙ্গে মাঠপর্যায়ে পাইলট প্রকল্প, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু করা গেলে এই প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
শুধু ন্যানো ইউরিয়া নয়, ন্যানো টিএসপি, ন্যানো এমওপি এবং অন্যান্য মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সারের উন্নয়ন ও ব্যবহারও জরুরি। সুষম সার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে কেবল ইউরিয়া নির্ভরতা কমিয়ে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। তাই সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ন্যানো প্রাযুক্তিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সময় এসেছে, প্রযুক্তিগত নতুন দিগন্তে প্রবেশ করার। ন্যানো সার সেই সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা একই সঙ্গে উৎপাদন বৃদ্ধি, খরচ হ্রাস এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে পারে। বর্তমান বৈশি^ক সংকট একটি সতর্কবার্তা হলেও, এটি একই সঙ্গে একটি সুযোগ। প্রচলিত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের এটাই উপযুক্ত সময়। ন্যানো প্রযুক্তি সেই পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে যদি নীতিনির্ধারণে দ্রুততা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তবায়নে আন্তরিকতা থাকে। খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য এই তিনের সমন্বয়ে টেকসই কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। বৈশ্বিক সারের বাজারে অস্থিরতার এ সময়ে ন্যানো ইউরিয়া ও অন্যান্য ন্যানো সার শুধু বিকল্প নয়, বরং একটি কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে উঠছে। এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশ কত দ্রুত এই বাস্তবতাকে গ্রহণ করে ভবিষ্যতের কৃষিকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করে তুলতে পারে।
লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালক
এলএসটিডি প্রকল্প বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট