নতুন সরকার গতি আনতে হবে সার্বিক অর্থনীতিতে
ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম প্রকাশিত: জনকণ্ঠ, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

গত ১৮ মাসে অর্থনীতিতে দেখা গেছে একটা স্থবিরতা। যেমন প্রবৃদ্ধি কমেছে, কর্মসংস্থানের দিক থেকেও সংকোচন হয়েছে। বর্তমানে সরকারি ভাষ্য অনুসারেই দেশের প্রায় ৩০ লাখ লোক বেকার। অর্থনীতির বাইরে সামাজিক ক্ষেত্রেও সহিংসতাসহ ছিল নানা অস্থিরতা। সব মিলিয়ে আস্থার অভাব থাকায় দেশে বিনিয়োগ সেভাবে হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে নতুন সরকার। নির্বাচিত সরকারের কাছে তিন দিক থেকে মানুষের প্রত্যাশা রয়েছে। এক. অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বাড়বে। দুই. বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি হবে।
তিন. বিদ্যমান সমস্যাগুলো সরকার যেন ধীরে ধীরে কমিয়ে আনে। নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রথম প্রত্যাশা হচ্ছে, অর্থনীতির বিভিন্ন জায়গায় যে অস্থিরতা ও স্থবিরতা আছে। সেখানে যেন একটা গতি ও স্থিতিশীলতা আসে। মানুষের প্রত্যাশা শুধু সামাজিক বা পারিবারিক জীবনে নয়; অর্থনৈতিক জীবনেও ফিরে আসবে স্বস্তি।
দ্বিতীয় প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। এ জন্য যদি মূল্যস্ফীতি ও সুদহার কমিয়ে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা যায়, তাহলে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরবে এবং বিনিয়োগ বাড়বে। আর বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে শুধু অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিলে হবে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা চান দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা।
তৃতীয়ত, দেশের অর্থনীতির কিছু দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা নিয়েও মানুষের ভাবনা রয়েছে। যেমন বাংলাদেশের ঋণের ভার অত্যন্ত বেশি। বর্তমানে রাজস্ব আয়ের তুলনায় রাজস্ব ব্যয় অনেক বেশি। ফলে জনগণের প্রত্যাশা, সরকার এই অসমতা কাটিয়ে উঠতে সরকারি খরচ কমানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। নতুন সরকারকে সুষম উন্নয়নে জোর দিতে হবে। সুষম উন্নয়নের দুটি দিক রয়েছে। একটা দিক হচ্ছে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে একটা সমতা তৈরি করা। আরেকটা দিক হচ্ছে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে একটা সমতা সৃষ্টি করা। নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রথম প্রত্যাশা হচ্ছে, অর্থনীতির বিভিন্ন জায়গায় যে অস্থিরতা ও স্থবিরতা আছে, সেখানে যেন একটা গতি ও স্থিতিশীলতা আসে।
দেশের দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে তিন কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে বাস করে। ছয় কোটির মতো মানুষ রয়েছে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে। শুধু আয়ের অসমতা নয়, সম্পদের অসমতাও রয়েছে। আবার সুযোগের অসমতাও বড় একটি বিষয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যেও একটা বৈষম্য রয়েছে। দেশের উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গ বা ঢাকার আশপাশের তুলনা করলে দেখা যায়, বহুদিক থেকে তারা বঞ্চিত। এ সমস্যার সমাধানে সরকারকে অর্থ বণ্টনে সচেতন হতে হবে।
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা খুব জরুরি। বিগত সময়ে আর্থিক খাতে প্রচুর অনিয়ম হয়েছে। ব্যাংকের পর ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; প্রয়োজন আছে কি না, দেখা হয়নি। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পারিবারিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ঋণখেলাপি একটা বড় সমস্যা। তবে ভালো করার জায়গাও রয়েছে। আর্থিক খাতের সুবিধা হচ্ছে, সেখানে কতগুলো বিধিবদ্ধ নিয়ম-কানুন আছে। সেগুলোকে আবার কার্যকর করতে হবে, মানতে হবে। ব্যাংক কত টাকা ঋণ দিচ্ছে ও কত টাকা ফেরত পাচ্ছে; কোনো ব্যাংকে অনিয়ম হলে সে জন্য কে দায়ী, কীভাবে দায়ী প্রভৃতি ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও দৃশ্যমানতা বাড়াতে হবে। তাতে সুশাসন ফিরবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে একটা প্রস্তাব গিয়েছিল। সরকার সেটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, নির্বাচিত সরকার বিষয়টি দেখবে। আমরা মনে করি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে আর্থিক খাতে যত চেষ্টাই করা হোক, সংস্কার হবে না। তাই নতুন সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি বিবেচনা করবে বলেই প্রত্যাশা।
অভ্যন্তরীণভাবে প্রবল অর্থ সংকটের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে নতুন সরকারের যাত্রা। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় অর্থ সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে সবার আগে উদ্যোক্তাদের আস্থার সংকট দূর করতে হবে। জরুরিভিত্তিতে সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করার পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পদক্ষেপ নিতে হবে ঋণের সুদের হার কমানোর।
পাশাপাশি উন্নয়ন ঘটাতে হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। একইসঙ্গে সরকারকে আমদানি ও রপ্তানি বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর জন্য কম সুদে ও সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহের পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। অপচয় ও দুর্নীতির লাগাম টানতে হবে। এতে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্য হবে গতিশীল। ফলে বাড়বে রাজস্ব আয়। এর মাধ্যমে সরকারের অর্থ সংকট ঘুচতে থাকবে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে অর্থনৈতিক মন্দা বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে করোনার সময় তা প্রকট আকার ধারণ করে। ২০২২ সালে বৈশ্বিক মন্দা শুরু হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তারা জাল-জালিয়াতি ও টাকা পাচার রোধ করতে সক্ষম হওয়ায় অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে স্বস্তি ফিরে আসে। রিজার্ভ বেড়েছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ খাতে বিরাজ করছে চরম অস্বস্তি। বিনিয়োগে নিদারুণ মন্দা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সর্বকালের সর্বনি¤েœ, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের পতন, ব্যাংক খাত চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দিতে অক্ষম। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী ধারা এখনো অব্যাহত। এমন সব বহুমুখী সংকটের মধ্যেই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত (২০২৪-২৫) অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) ৬৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে পুঁজি হিসাবে বিনিয়োগ এসেছে খুবই কম। দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগও কম। যে কারণে ঋণ প্রবাহ বাড়ার চাহিদা তৈরি হয়নি। জুলাই-ডিসেম্বরে এ খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩২ শতাংশ। যা স্মরণকালের সর্বনি¤œ। এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুটপাটে দুর্বল ব্যাংক খাতও চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দিতে পারছে না। ফলে ঋণ প্রবাহও বাড়েনি। অর্থ সংকট দূর করতে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে।
এজন্য ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে হবে। উন্নয়ন করতে হবে ব্যবসার পরিবেশ। আমদানি-রপ্তানি বাড়াতে হবে। ব্যাংক খাতকে গতিশীল করতে হবে। তাহলে রাজস্ব বাড়বে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকা- যেমন বাড়বে, তেমনি সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা খাতে ভারসাম্য শক্তিশালী হবে।
সরকারের অর্থ সংকটের আরও একটি বড় কারণ দুর্নীতি ও অপচয়। এটি রোধ করতে হবে। তাহলে সরকারি হিসাবে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে হবে দ্রুত। যাতে সরকারের আচরণে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসে। একইসঙ্গে সরকারি খাতেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নির্মাণ করতে হবে অবকাঠামো। সরকার অবকাঠামো নির্মাণ করলে সেখানে বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহে ঘাটতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে দেশে বিনিয়োগ বাড়েনি। বর্তমান সরকারকে অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে সবার আগে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে হবে। এর জন্য উদ্যোক্তাদের মধ্যে আগে করতে হবে আস্থার সঞ্চার। উন্নয়ন ঘটাতে হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির।
বিনিয়োগের জন্য পরিবেশ উন্নত করাসহ শিল্প খাতে গ্যাস-বিদ্যুতের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। যেটি এখন প্রায় নেই। ২০২২ সালের জুলাই থেকে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ করতে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। যা এখনো চলমান রয়েছে। এতে সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ শতাংশে ওঠেছে। একই সময়ে ডলারের দাম ৮৬ থেকে ১২৩ টাকা হয়েছে। যা ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ডলারের দাম এখন স্থিতিশীল রয়েছে।
সুযোগ থাকলেও রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর স্বার্থে ডলারের দাম কমানো হচ্ছে না। কিন্তু উদ্যোক্তারা জোর দাবি করেছেন ঋণের সুদের হার কমাতে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির হার কমেনি বলে ঋণের সুদের হার কমাচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশই বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। এ জন্য স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে বাড়াতে হবে ঋণ প্রবাহ। এতে আমদানি-রপ্তানি বাড়বে। ২০২২ সাল থেকে ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যবসায় মন্দা চলছে। এদিকে, ডলারের জোগান বর্তমানে বাড়লেও আমদানি ব্যবসা এখনো চাঙা হয়নি উদ্যোক্তাদের আস্থার অভাবে। আমদানি বাড়ানোর পদক্ষেপ নিলে এ খাতের ব্যবসা চাঙা হবে। পাশাপাশি আমদানির কাঁচামাল দিয়ে রপ্তানি বাড়ানোরও সুযোগ তৈরি হবে।
রপ্তানি আয় নি¤œমুখী। ফলে এ খাতকে অবকাঠামোগত সহায়তা দিতে হবে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স বেড়েছে ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে জানুয়ারিতে বেড়েছে ৪৫ শতাংশের বেশি। এটি ধরে রাখতে হু-ির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়াতে হবে রেমিট্যান্স সেবা। অর্থনীতিতে রক্ত সঞ্চালনের মতো কাজ করে ব্যাংক খাত। এ খাতটি এখন অত্যন্ত দুর্বল। কিছু ব্যাংক রপ্তানি আয়ের ডলারের টাকাও পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে খাতটিকে চাঙা করতে হলে চলমান সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি খেলাপিঋণ আদায় বাড়াতে হবে।
আমানতকারীদের উৎসাহ দিয়ে আমানতের প্রবাহও বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়লে একদিকে ঋণের সুদের হার কমবে, অন্যদিকে ঋণ প্রবাহও বাড়বে। উদ্যোক্তারা যখন দেখবেন কম সুদে ঋণ মিলবে, তখন তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন। ব্যবসা চাঙা হলে, রেমিট্যান্স বাড়লে ও রপ্তানি খাত গতিশীল হলে ব্যাংক খাতেও টাকার জোগান বাড়বে। এককথায় সার্বিক অর্থনীতিতে গতি ফিরবে।
লেখক : সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যশনাল এফ এফ ফাউন্ডেশন