কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

নতুন বাঁকে দাঁড়িয়ে নেপাল

ইমতিয়াজ আহমেদ [সূত্র : সমকাল, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

নতুন বাঁকে দাঁড়িয়ে নেপাল

দক্ষিণ এশিয়া মঙ্গলবার আরেকটি গণঅভ্যুত্থান দেখল। প্রতিবেশী দেশ নেপালে সামাজিক মাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদে সূচিত আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটিয়েছে। মাত্র তিন দিনের মাথায় কেপি শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।

 

 

নেপাল সরকার চেয়েছিল ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, টেলিগ্রামের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নেপালের আইন মেনে নিবন্ধন করুক। সমালোচকদের বক্তব্য ছিল, এর মধ্য দিয়ে সরকার আসলে বিরোধী মত দমন ও বাকস্বাধীনতা হরণ করতে চেয়েছিল। ওই কোম্পানিগুলোও এ ব্যাপারে উৎসাহী ছিল না, স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু বিষয়টি সুরাহা হওয়ার আগেই নেপাল সরকার সামাজিক মাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। মূলত এর পরই দেশটির তরুণ সমাজ, যারা ‘জেন জি’ নামে পরিচিত, রাস্তায় নেমে আসে। নেপাল সরকার তাদের সঙ্গে আলোচনার বদলে বলপ্রয়োগের অবিমৃষ্যকারিতা দেখায়। প্রবল বিক্ষোভ ও পুলিশি দমনপীড়নের মুখে সোমবার পর্যন্ত ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, এখনও স্পষ্ট নয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে দেখছিলাম, প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌড়েলও পদত্যাগ করেছেন। ফলে পরিস্থিতি এখনও ঘোলা।

 

 


নেপালের সদ্যবিদায়ী সরকারের বিভ্রম হলো, বর্তমান বিশ্ব যে আধুনিক প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে অভাবনীয়ভাবে এগিয়ে গেছে, সেটা পুরোপুরি বিস্মৃত হওয়া। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কারণে বিশ্বের কোনো কিছুই এখন অজানা থাকছে না। এটি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যা অর্থনৈতিক অবস্থা, নীতিনির্ধারকদের জীবনযাপন ও তাদের পারিবারিক সদস্যদের জীবনযাত্রা– কোনো কিছুই লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। দার্শনিক হেবারমাস ও দেরিদা এক আলাপে বলেছিলেন, মোবাইল ফোনই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমরা প্রায় জায়গায়ই দেখতে পাচ্ছি, আন্দোলনকালে প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের আন্দোলনে এ ধরনের তৎপরতা দেখেছি। নেপাল তার সর্বশেষ উদাহরণ। এর আগে শ্রীলঙ্কাতেও সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রযুক্তির প্রভাব আমরা দেখেছি। বাংলাদেশে গত বছরের গণঅভ্যুত্থানেও দেখেছি একই চিত্র।

 

 

এটা ঠিক, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের আন্দোলনের নেপথ্য কারণ অভিন্ন ছিল– এ দাবি করা যাবে না। বিশেষত বাংলাদেশে তরুণরা সবসময় আন্দোলনে ছিল। বাংলাদেশে যত আন্দোলন হয়েছে, সবই তরুণ ও ছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, এরশাদবিরোধী আন্দোলন– সবটাতে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছে। ফলে এখন যেটাকে ‘জেন জি’র আন্দোলন বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে সেটা নতুন ছিল না। কিন্তু তিন দেশের কথাই যদি ধরি– শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালকে একসূত্রে গেঁথেছে আন্দোলনে প্রযুক্তির ব্যবহার। 

 


আরেকটি বিষয় স্পষ্ট, তিন দেশের ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি মাধ্যম মাত্র। মূল কারণ হচ্ছে, জনগণের সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর দূরত্ব। নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের বৈষম্য আগেও ছিল। কিন্তু আগে তা হয়তো অতটা ধরা পড়ত না। কেননা, অতীতে সবার হাতে হাতে তথ্যপ্রযুক্তি ছিল না। 

 

 

নেপালে দেখা গেছে, নীতিনির্ধারকদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে রীতিমতো বিলাসী জীবন যাপন করছে। অথচ দেশের মধ্যে সাধারণ মানুষের সন্তানরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য খাতের করুণ অবস্থা ইত্যাদি। মোটাদাগে একদিকে জনসেবা খাতগুলোর দুর্বলতা, অন্যদিকে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর সদস্যদের বিলাসী জীবনযাপন জনগণের কাছে উন্মোচিত। যে কারণে নেপালের এবারের গণঅভ্যুত্থানে স্লোগান ছিল– ‘ইয়ুথ অ্যাগেইনস্ট করাপশন’। তরুণরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে। 

 

 


নেপালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকে অবশ্য শুধু শাসক-জনগণ দূরত্ব ও প্রযুক্তির প্রভাববিষয়ক সরলরেখায় চিত্রায়িত করার অবকাশ নেই।

 

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, শাসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যখন বিভাজন তৈরি হয়, তখন আন্তর্জাতিক মহল ঘটনা নিজেদের মতো ব্যবহার করতে চায়। নেপালের ঘটনাতেও ভারত ও চীনের দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাও থাকতে পারে। এ নিয়ে অনুসন্ধান ও গবেষণা হতেই পারে। কিন্তু আমি মনে করি, ঘরের বিভাজনমূলক কাঠামোই প্রধান। অভ্যন্তরীণ বিভাজন রয়েছে বলেই বহির্বিশ্বের উস্কানি ও তার মাত্রা নিয়ে প্রশ্নগুলো আসে।

 

 

 

কেপি শর্মা অলি মানুষকে বিপুল পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। পরে দেখা গেছে, নাগরিক হিসেবে তাদের যে দাবি ও স্বপ্ন ছিল, সেগুলো পূরণের ধারেকাছে ছিল না তাঁর সরকার। জনগণের সেবা খাতগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছিল। তা ছাড়া এগুলো পুনর্গঠনের মতো সরকারের কোনো রকম প্রস্তুতি বা সুশাসন ছিল না। একদিকে জনপ্রশাসন ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক অবস্থা অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে যে কোনো দেশে বিক্ষোভ ও আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠবেই। জনগণ স্বাভাবিকভাবেই একসময় রাস্তায় নেমে আসবে। সামাজিক মাধ্যম বন্ধের পদক্ষেপ সেই বারুদে অগ্নিশলাকা হিসেবে কাজ করেছে।  

 

 

নেপালের ঘটনায় নেপথ্যে কারা যুক্ত; দল-উপদল ছিল কিনা, সেটি আমরা পরে গবেষণায় দেখতে পাব। কিন্তু এ পর্যন্ত জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভের জন্ম হয়েছিল, তা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট। যে বৈষম্যমূলক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, তার বিরুদ্ধেই এ আন্দোলন গড়ে উঠেছে। 

 

 

এসব আন্দোলন শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় গড়ে উঠছে, তা বলা ঠিক নয়। এখন বার্লিনে বিশাল বিশাল মিছিল বের হচ্ছে; প্যারিসে বিশাল বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। স্পেনেও একই চিত্র। এসব দেশে গাজাকে কেন্দ্র করে বড় বড় মিছিল হয়েছে। যেমন ৪০টি দেশের মানুষ নিয়ে ‘ফ্লোটিলা’ স্পেন থেকে গাজার দিকে রওনা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যুক্তরাষ্ট্রেও একাধিক আন্দোলন দেখেছি। 

 


পুরো বিষয়কে ‘জেন জি প্রবণতা’ বলে সরলীকরণের সুযোগ কম। আমার মনে হয়, বরং এভাবে দেখা যেতে পারে– রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য বিভাজন ও বৈষম্য থাকলে তরুণরা আন্দোলন গড়ে তুলবে, বিক্ষোভ করবে, প্রতিবাদ জানাবে। উন্নত কিংবা অনুন্নত সব দেশে একই অবস্থা। এটিই ঐতিহাসিক প্রবণতা। নেপালের ঘটনাও ব্যতিক্রমী কিছু নয়।

 

 

কথা হচ্ছে, এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নেপাল নতুন রাজনৈতিক বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই শেষ হবে, মনে হচ্ছে না। কারণ যে বৈষম্য ও বিভাজনের কারণে জনগণ আন্দোলনে নেমেছে; নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই সেটার সুরাহা করতে পারবে বলে মনে হয় না। নেপালের দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য থেকে উত্তরণে সময় লাগবে। রাজপথে উঠে আসা দাবির বাইরেও অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সেটা করতে হবে চীন ও ভারতের মতো দুই প্রতিবেশীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে। বিষয়টি সহজ নয়। 

 

 


নেপালের ঘটনা থেকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ভেতর-বাইরের অন্যান্য দেশের নিরেট শিক্ষা হচ্ছে– আর যাই হোক, বিরোধী মত দমন ও বাকস্বাধীনতা হরণ করা চলবে না। বিশ শতকের দমনমূলক নীতি নাগরিকের হাতে হাতে প্রযুক্তি থাকার কারণেই এখন অচল প্রমাণ হতে থাকবে।

 


 
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ: সাবেক অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়