নোবেল পুরস্কার ২০২৫ সংক্রান্ত যত তথ্য
[সূত্র : প্রথম আলো, ৫ নভেম্বর ২০২৫]


চাকরির পরীক্ষায় নানা প্রশ্নই আসে। নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে সম্প্রতি। প্রায় সব পরীক্ষাতেই নোবেল পুরস্কার নিয়ে এক বা একাধিক প্রশ্ন আসে। একনজরে দেখে নেওয়া যাক ২০২৫ সালের নোবেল পুরস্কার ও বিজয়ীদের সম্পর্কে জরুরি কিছু তথ্য।
নোবেল পুরস্কার প্রচলন হয় ১৯০১ সালে। এ বছর ১২৫তম নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। ৬টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কারপ্রাপ্ত হয়েছেন ৯টি দেশের ১৪ জন।
অর্থনীতি মূল নোবেল পুরস্কারের অন্তর্ভুক্ত নয়। ১৯৬৯ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নোবেল পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে এই পুরস্কার চালু করে। তখন থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৫৭ জন এই পুরস্কার পেয়েছেন। আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অর্থনীতিতে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুরস্কার—এটাই এই পুরস্কারের কেতাবি নাম। তবে এটি নোবেল পুরস্কার হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
আর্থিক সম্মাননা
নোবেল বিজয়ীরা আর্থিক সম্মাননা হিসেবে পান ১১ মিলিয়ন বা ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১ দশমিক ২ মিলিয়ন বা ১২ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৪ কোটি টাকা)। কোনো শাখায় একাধিক ব্যক্তি মনোনীত হলে আর্থিক পুরস্কার তাঁদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
পদার্থবিজ্ঞান
অবদান: ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং এবং ইলেকট্রিক সার্কিটে এনার্জি কোয়ান্টাইজেশন তাঁদের গবেষণার বিষয়। কোয়ান্টাম মেকানিকসের ক্ষুদ্রাতীত কণার আচরণ কীভাবে আমাদের পরিচিত বড় আকারের মানবসৃষ্ট বস্তু বা অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে সফলভাবে প্রয়োগ করেছেন তাঁরা। এটিকে বিভিন্ন কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা যাবে। এর মাধ্যমে কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করা সম্ভব।
১. জন ক্লার্ক (ব্রিটেন)
পিএইচডি: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৮
বর্তমান কর্মস্থল: যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
২. মিশেল এইচ দ্যভোরে (ফ্রান্স)
পিএইচডি: প্যারিস-সুড বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮২
বর্তমান কর্মস্থল: যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
৩. জন এম মার্টিনিস (যুক্তরাষ্ট্র)
পিএইচডি: ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮৭ (জন ক্লার্ক এর অধীনে)
বর্তমান কর্মস্থল: ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এ ছাড়া তিনি কিউল্যাব এর চিফ টেকনোলজি অফিসার।
রসায়ন
অবদান: ‘ধাতব-জৈব কাঠামো’ বা ‘মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক’ নামে নতুন একধরনের আণবিক কাঠামো আবিষ্কারের জন্য তাঁদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মরুভূমির বাতাস থেকে পানি সংগ্রহ, কার্বন ডাই–অক্সাইড শোষণ, বিষাক্ত গ্যাস সংরক্ষণ বা রাসায়নিক বিক্রিয়া ত্বরান্বিত করা যায়।
১. সুসুমু কিতাগাওয়া (জাপান)
পিএইচডি: জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৯
বর্তমান কর্মস্থল: কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
২. রিচার্ড রবসন (যুক্তরাজ্য)
পিএইচডি: যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬২
বর্তমান কর্মস্থল: অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
৩. ওমর এম ইয়াঘি (জর্ডান)
ফিলিস্তিনি শরণার্থী পরিবারের সন্তান। জর্ডান ছাড়াও তিনি সৌদি আরব ও মার্কিন নাগরিক। তাঁকে রেটিকুলার কেমিস্ট্রির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পিএইচডি: ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯০
বর্তমান কর্মস্থল: ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
চিকিৎসা
অবদান: পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স তথা শরীরের রোগপ্রতিরোধক কোষ জীবাণুদের আক্রমণ করতে গিয়ে যেন নিজের টিস্যু বা অঙ্গকে আক্রমণ না করে, সেই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁরা এমন কোষ খুঁজে বের করেছেন, যাকে ‘রেগুলেটরি টি সেল’ বলা হয়, যা দেহের নিজস্ব কোষে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার আক্রমণ রোধ করে।
১. ম্যারি ই. ব্রুনকো (যুক্তরাষ্ট্র)
বর্তমান কর্মস্থল: যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের ইনস্টিটিউট ফর সিস্টেমস বায়োলজির সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার।
২. ফ্রেড রামসডেল (যুক্তরাষ্ট্র):
বর্তমান কর্মস্থল: সান ফ্রান্সিসকোর সোনোমা বায়োথেরাপিউটিকসের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা।
৩. শিমন সাকাগুচি (জাপান)
বর্তমান কর্মস্থল: জাপানের ওসাকা ইউনিভার্সিটির ইমিউনোলজি ফ্রন্টিয়ার রিসার্চ সেন্টারের অধ্যাপক।
সাহিত্য
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই (হাঙ্গেরি)
সংক্ষিপ্ত জীবনী: জন্ম ৫ জানুয়ারি ১৯৫৪। বর্তমান বয়স ৭১ বছর। তিনি হাঙ্গেরির নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত দ্বিতীয় সাহিত্যিক। পাঁচটি উপন্যাস লিখেছেন। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস স্যাটানট্যাঙ্গো (পটভূমি অনুরূপ এক প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা)। তাঁর ফিকশনের বিষয়ে বলা হয়, মানুষের জীবনে কঠোরভাবে রক্ষিত থাকে যেসব গোপনীয়তা, সেসব তিনি তুলে ধরেন তাঁর লেখায়।
অবদান: ভয় ও ধ্বংসের সময়েও শিল্পের শক্তিকে মনে করিয়ে দেওয়া তাঁর অনুপ্রেরণামূলক ও দূরদর্শী কাজের জন্য।
শান্তি
মারিয়া কোরিনা মাচাদো (ভেনেজুয়েলা)
সংক্ষিপ্ত জীবনী: জন্ম ৭ অক্টোবর ১৯৬৭। তিনি একজন রাজনীতিবিদ ও শিল্প প্রকৌশলী। তাঁর রাজনৈতিক দলের নাম ভেনতে ভেনেজুয়েলা। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ২০১২ সালে।
অবদান: ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ার জন্য।
অর্থনীতি
অবদান: উদ্ভাবননির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাখ্যা। ঐতিহাসিক উপাত্ত ও দলিল ব্যবহার করে মোকির দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উদ্ভাবন একসময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নিয়মিত বিষয়ে পরিণত করেছে। আগিয়োঁ ও হাউইট সেই প্রবৃদ্ধির অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন।
আর্থিক সম্মাননার অর্ধেক পেয়েছেন জোয়েল মোকির। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্তগুলো শনাক্ত করার জন্য তিনি পুরস্কার পেয়েছেন। ‘সৃজনশীল বিনাশ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধির তত্ত্ব দেওয়ার জন্য বাকি অর্ধেক সম্মাননা যৌথভাবে পেয়েছেন ফিলিপ আগিয়োঁ ও পিটার হাউইট।
১. জোয়েল মোকির (নেদারল্যান্ডস)
পিএইচডি: যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটি, ১৯৭৪
বর্তমান কর্মস্থল: যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক।
২. ফিলিপ আগিয়োঁ (ফ্রান্স)
পিএইচডি: হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, ১৯৮৭
বর্তমান কর্মস্থল: যুক্তরাজ্যের স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক।
৩. পিটার হাউইট (কানাডা)
পিএইচডি: যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ১৯৭৩
বর্তমান কর্মস্থল: যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক।
সৃজনশীল বিনাশ কী?
১৯৯২ সালের এক প্রবন্ধে তাঁরা গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন, যখন নতুন ও উন্নত কোনো পণ্য বাজারে আসে, তখন পুরোনো পণ্য বিক্রি করা প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে টিকে থাকতে পারে না। এই প্রক্রিয়াই অর্থনীতিতে ‘সৃজনশীল বিনাশ’ নামে পরিচিত। অর্থাৎ পুরোনো ব্যবস্থার ভেতর থেকেই নতুন উদ্ভাবন হয়।