নিউক্লিয়ার ফিউশনে বৈশ্বিক জ্বালানি
নিশাত সুলতানা আখি [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

জীবাশ্ম জ্বালানি ক্রমেই নিঃশেষ হয়ে আসছে। এটি অতিমাত্রায় ব্যবহারের ফলে পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা ও খরা, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখন দূরবর্তী কোনো আশঙ্কা নয়, এগুলো বাস্তবতা। এই বৈশ্বিক সংকট একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও টেকসই জ্বালানির উৎস খুঁজে বের করতে বিজ্ঞানীদের বাধ্য করেছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, সেই সমাধানটি হয়তো পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে সূর্যের মধ্যেই রয়েছে। সূর্য যে বিপুল শক্তি উৎপন্ন করে, তার উৎস নিউক্লিয়ার ফিউশন।
সহজভাবে বলতে গেলে, দুটি হালকা পরমাণু একত্র হয়ে একটি ভারী পরমাণু গঠন করলে যে বিপুল শক্তি নির্গত হয়, তাকেই ফিউশন বলা হয়। মূলত হাইড্রোজেনের প্রাকৃতিক আইসোটোপের মধ্যে ডিউটেরিয়াম এবং ট্রিটিয়াম দুটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ, এই দুটি রূপকে একীভূত করার প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা গবেষণা পরিচালনা করছেন। ফিউশনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে এতে কোনো কার্বন নিঃসরণ হয় না, দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয় বর্জ্য প্রায় সৃষ্টি হয় না এবং প্রাপ্ত শক্তির পরিমাণ প্রায় সীমাহীন। ডিউটেরিয়াম সমুদ্রের পানি থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব। তাত্ত্বিকভাবে মাত্র এক লিটার পানি, একজন মানুষের সারাজীবনের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সক্ষম। এসব কারণেই ফিউশন প্রযুক্তিকে প্রায়ই পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ‘হলি গ্রেইল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ফিউশন যদি এতটাই সম্ভাবনাময় হয়, তাহলে এটি এখনো বাস্তব ব্যবহারে আসেনি কেন? এর প্রধান কারণ তাপমাত্রা। ফিউশনের জন্য প্রয়োজন প্রায় ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, যা সূর্যের কেন্দ্রের তুলনায়ও অনেক বেশি। এই তাপে পদার্থ প্লাজমায় রূপান্তরিত হয়, যেখানে ইলেকট্রন পরমাণু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই প্লাজমাকে কোনো পাত্রে ধারণ করা সম্ভব নয়।
এ সমস্যার সমাধান আসে ১৯৫০-এর দশকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে, টোকামাক নামের একটি ডিভাইসের মাধ্যমে। টোকামাক শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে ডোনাট-আকৃতির একটি চেম্বারের ভেতরে প্লাজমাকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখে, যাতে তা দেয়ালের সংস্পর্শে আসতে না পারে। টোরয়েডাল ও পোলয়েডাল এই দুধরনের চৌম্বক ক্ষেত্র একসঙ্গে কাজ করে প্লাজমাকে স্থিতিশীল রাখে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক প্রবাহ, রেডিও তরঙ্গ এবং উচ্চশক্তির কণার বিমের মাধ্যমে প্লাজমাকে ফিউশনের প্রয়োজনীয় তাপে উত্তপ্ত করা হয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য ফিউশন ঘটানো যথেষ্ট নয়। কার্যকর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য রিয়্যাক্টরকে দিন-রাত অবিরাম চালু রাখতে হবে। এ কারণেই বিশ্ব জুড়ে এখন দীর্ঘ-পালস টোকামাকের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। চীনের EAST টোকামাক এক হাজার সেকেন্ডের বেশি সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রার প্লাজমা ধরে রাখতে সক্ষম। ফ্রান্সের WEST টোকামাক সম্প্রতি ১,৩৩৭ সেকেন্ডের নতুন রেকর্ড গড়েছে, যেখানে চরম তাপ সহনশীল উপকরণ পরীক্ষা করা হয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপ ও জাপানের যৌথ প্রকল্প JT-60SA থেকে ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ডেটা পাওয়া গেছে। এই সাফল্যগুলোই প্রমাণ করে, দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল ফিউশন কোনো কল্পনার বিষয় নয়।
ফিউশন গবেষণা শুধু সরকারি গবেষণাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ছোট ও কম খরচে ফিউশন রিয়্যাক্ট নকশায় বড় বিনিয়োগ করছে। যুক্তরাজ্যের Tokamak Energy উন্নত সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক ব্যবহার করে অপেক্ষাকৃত ছোট রিয়্যাক্টের তৈরি করছে। SMART-এর মতো প্রকল্পগুলো উদ্ভাবনের গতি বাড়াতে এবং ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। সরকারি গবেষণা ও বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয়ে বিশ্বব্যাপী ফিউশন প্রযুক্তির ব্যবহারের সম্ভাবনায় গতির সঞ্চার করেছে। টোকামাকের জন্মভূমি হিসেবে রাশিয়া এখনো ফিউশন গবেষণায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছে।
T-15MD টোকামাক ২০২৩ সালে প্রথম প্লাজমা তৈরি করতে সক্ষম হয় এবং ২০২৫ সালের মধ্যে উচ্চ কর্মক্ষমতা অর্জন করে। রুশ বিজ্ঞানীরা লিথিয়াম-আবৃত দেয়াল নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেন, যা প্লাজমার স্থিতিশীলতা বাড়াতে সহায়ক। পাশাপাশি রিয়্যাক্টরের উপাদানে চরম তাপ সহ্য করতে সক্ষম এমন টাংস্টেন তামা সংকর পদার্থ উন্নয়নে কাজ করছে রাশিয়া। মস্কো ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে গবেষকরা তৈরি করেছেন MEPhIST বিশ্বের প্রথম দূরনিয়ন্ত্রিত শিক্ষামূলক টোকামাক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকরা অনলাইনে এটি ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও পরীক্ষা কার্যক্রম চালাতে পারে। গঊচযও-র প্লাজমা ফিজিক্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ইউরি মিখাইলোভিচ গাসপারিয়ান এই বৈশ্বিক প্রয়াসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। শিক্ষাগত ও গবেষণাভিত্তিক সহযোগিতায় আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও বিজ্ঞানীদের জন্য টোকামাক সুবিধার রিমোট ব্যবহারের সুযোগ বিস্তার এবং যৌথ গবেষণা কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে গুরুতর জ্বালানি চ্যালেঞ্জের মুখে। অভ্যন্তরীণ গ্যাসের মজুদ কমছে, জ্বালানি আমদানির চাপ অর্থনীতিকে দুর্বল করছে এবং বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফিউশন হয়তো আগামীকালই বাস্তবে পাওয়া যাবে না, তবে আগাম বিনিয়োগ ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনতে পারে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, যা ফিউশন প্রযুক্তির জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। ফিউশন প্রযুক্তি এখনো কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছুতে পারেনি। একই সঙ্গে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। প্লাজমার স্থিতিশীলতা বাড়ানো, রিয়্যাক্টরের দেয়াল আরও তাপসহিষ্ণু এবং সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকের উন্নয়ন ইত্যাদি চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বিজ্ঞানীরা বর্তমানে কাজ করছেন। তবে গত এক দশকে অর্জিত অগ্রগতি আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই প্রথম বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তব রূপ নিতে পারে।
লেখক : ট্রেইনার, ইউসেপ বাংলাদেশ