কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

নির্বাচন ২০২৬ : কিছু পরামর্শ

ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী [সূত্র : যুগান্তর, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

নির্বাচন ২০২৬ : কিছু পরামর্শ

ইলেকশন কমিশন (ইসি) ২৮ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। ২৪টি কাজকে গুরুত্ব দিয়ে বহুলপ্রত্যাশিত এ রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনি তফশিল ঘোষণা করা হবে। হাতে যেটুকু সময় আছে, তার মধ্যে নির্বাচনসংক্রান্ত প্রাথমিক সংস্কারগুলো সম্পন্ন করা হবে। এর মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনি ট্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল। এখন রাজনৈতিক দল এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব হবে নির্বাচনি ট্রেন যাতে লাইনচ্যুত না হয়ে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছতে পারে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছোটখাটো যেসব ইস্যু নিয়ে এখনো মতান্তর রয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমে দূরীভূত করার উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি আন্তরিক হয়, তাহলে কোনো সমস্যাই অমীমাংসিত থাকবে না। এ মুহূর্তে জাতির চাওয়া হচ্ছে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। অন্তর্বর্তী বা অনির্বাচিত সরকার দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে দৃঢ়তার সঙ্গে যেভাবে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব, অনির্বাচিত সরকারের পক্ষে তা হয় না। বিগত সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। নতুন প্রজন্মসহ পুরো জাতি এখন নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। যে কোনো মূল্যে তাদের এ চাওয়া পূরণ করতেই হবে। এ ব্যাপারে কোনো গাফিলতি কাম্য নয়। কোনো অজুহাতেই নির্বাচন বিলম্বিত হতে দেওয়া যাবে না।

 

পতিত ও পলাতক স্বৈরাচারের দোসররা যে কোনো মূল্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা চালাতে পারে। তাদের ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজনের জন্য বেশকিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এসব সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। কোনো ব্যাপারেই এমন কিছু করা উচিত হবে না, যাতে নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আগামী দিনে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।

প্রথমেই প্রশ্ন দেখা দেবে, নির্বাচন কোন পদ্ধতির সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে? বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করাই যৌক্তিক হবে। কারণ এ পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার কোনোটিই সম্পূর্ণ বিতর্কমুক্ত ছিল না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোনো মহলেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন জঘন্য নির্বাচন আর কখনোই হয়নি। আসলে এ তিনটি নির্বাচন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। এসব নির্বাচনে ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। বিগত ৫৪ বছরে দেশে যেসব জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির অধীনে আয়োজিত ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালের নির্বাচনই ছিল মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। এসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনেই একটি রাজনৈতিক দল পরপর দুবার ক্ষমতায় আসতে পারেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি থাকে। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে আওয়ামী লীগ ২০১১ সালে আদালতকে ব্যবহার করে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিধান বাতিল করে দেয়। বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে এখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো বিকল্প পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়নি। দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলই চাচ্ছে, আগামী সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হোক। নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারবে কি না, তা নির্ভর করছে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ওপর। আশা করা যাচ্ছে, আগামী কিছুদিনের মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত ইস্যুতে আদালতের চূড়ান্ত রায় পাওয়া যাবে। যদি আদালতের রায় পেতে বিলম্ব হয়, তাহলে বিকল্প কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে আসতে হবে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নানা কারণেই বিশেষ চ্যালেঞ্জিং হবে। পতিত স্বৈরাচারের দোসর, যারা এখনো দেশে আত্মগোপনে অথবা নিশ্চুপ হয়ে আছে, তারা নির্বাচনের আগে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাতে পারে। কোনো কোনো মহল থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে, নির্বাচনের সময় পতিত স্বৈরাচারের দোসররা পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে। ছাত্র-জনতার সফল গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু এখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। মাঝেমধ্যেই মব সৃষ্টি করে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। এসব মব সৃষ্টির পেছনে কারা জড়িত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। বিগত সরকারের আমলে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য অতিমাত্রায় দলীয়প্রীতি প্রদর্শন করেছেন, তারা এখনো স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করছেন না। অনেকে আবার পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর এক বছর গত হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেন স্বাভাবিক হচ্ছে না, তা অনুসন্ধান করে দেখা প্রয়োজন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে স্বাভাবিক হয়ে আসে, তা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক থাকলে কোনোভাবেই সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে না। তাই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

 

 

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের ওপর জঘন্য ও বর্বরোচিত হামলার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হামলার কারণে নুরের মাথার হাড়, নাক ও ডান পাশের চোয়ালের হার ভেঙে গেছে। নুর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাকে এমন এক রাজনৈতিক দলের কার্যালয় থেকে আক্রমণ করা হয়েছে, যারা বিগত সরকারের সব স্বৈরাচারী কাজের দোসর ছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় পার্টি শেখ হাসিনার সব বৈধ ও অবৈধ কাজে প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতা করেছে। এমন একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে নুরের মতো একজন উদীয়মান নেতার ওপর আক্রমণকে অনেকেই গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করছেন। অনেকে এমনও বলছেন, পতিত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জাতীয় পার্টিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমি একজন শিক্ষক হিসাবে নুরুল হক নুরের ওপর এ জঘন্য আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানাই এবং প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দাবি করছি। আগামীতে এ ধরনের বর্বরোচিত ঘটনা ঘটতে থাকলে নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

 

 

বিগত সরকার আমলে প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যাপকভাবে দলীয়করণের মাধ্যমে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। বিগত সরকারের অনুগত দলবাজ কর্মকর্তারা এখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বহাল তবিয়তে আছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর যেসব কর্মকর্তা প্রিসাইডিং অফিসার অথবা পোলিং অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন, তারা যাতে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের অনুগত না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। এদের দায়িত্ব দেওয়া হলে নির্বাচনকে বিতর্কিত করে তুলতে পারেন। কারণ এসব কর্মকর্তা এখনো পতিত এবং দেশত্যাগী স্বৈরাচারী সরকারের প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখে থাকেন। কাজেই আগামী দিনে এদের নির্বাচনি কার্যক্রম থেকে দূরে রাখতে হবে।

 

 

আমাদের দেশে নির্বাচন হচ্ছে টাকার খেলা। বিগত সরকারের আমলে নমিনেশন বাণিজ্য চলেছে পুরোদমে। অর্থের বিনিময়ে অনেক অযোগ্য ব্যক্তিও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দলীয় মনোনয়ন পেয়ে যেতেন। এভাবে যারা উৎকোচের বিনিময়ে নির্বাচনের নমিনেশনপত্র ক্রয় করেন, তারা নির্বাচিত হলে ব্যয়িত অর্থ সুদে-আসলে তুলে নেবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। জাতীয় সংসদ অত্যন্ত পবিত্র স্থান, সেখানে সবার যাওয়ার সুযোগ হয় না, সবাইকে যেতে দেওয়া উচিত নয়। আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এমন কাউকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া উচিত হবে না, যার অতীত কার্যক্রম মোটেও সন্তোষজনক নয়। যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিকেই দলীয় মনোনয়ন দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক দল কোনো ব্যক্তি বা প্রার্থীকে কলুষিত অথবা মহিমান্বিত করে না। বরং ব্যক্তি কার্যকলাপেই একটি রাজনৈতিক দল কলুষিত অথবা মহিমান্বিত হয়। কাজেই প্রার্থী মনোনয়নদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই যোগ্য ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিতে হবে। জাতীয় নির্বাচনে একজন প্রার্থী কত টাকা ব্যয় করতে পারবেন, তার সীমা নির্দিষ্ট করা আছে। কিন্তু অধিকাংশ প্রার্থীই সেই সীমা লঙ্ঘন করে থাকেন। এদের কাছে নির্বাচনে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে এক ধরনের বিনিয়োগ। নির্বাচিত হতে পারলে তারা সুদে-আসলে তাদের বিনিয়োজিত অর্থ তুলে নেন। বিগত সরকার আমলে নির্বাচনব্যবস্থা টাকার খেলায় পরিণত হয়েছিল। ফলে দেখা গেছে, যারাই নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের প্রায় সবাই অনৈতিকভাবে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটে নিয়েছেন। বিগত সরকারের উন্নয়ন মডেল ছিল-‘অতি উন্নয়ন, অতি দুর্নীতি।’ দলীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতেন। অনেক ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে, ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু সেই ব্রিজে ওঠার জন্য অ্যাপ্রোচ রোড নেই। ফলে নির্মিত ব্রিজ কোনো কাজে আসেনি।

 

 

বিগত সরকার অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে উন্নয়নের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে পারছিল না। তাই তারা বিদেশ থেকে ঋণ এনে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতেন। এক্ষেত্রে সুবিধা হচ্ছে, এতে জবাবদিহিতা থাকে তুলনামূলকভাবে কম। কমিশন ভোগের সুযোগ থাকে বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার সমতুল্য ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এটা অর্থ পাচারের একটি দিক। কিন্তু বিদেশ থেকে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ঋণ গ্রহণের সময় যে কমিশন গ্রহণ করা হতো, তা দেশে না এনে বিদেশেই রাখা হতো। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গোয়েন্দা শাখা অনুসন্ধান চালিয়ে কয়েকটি দেশে বাংলাদেশিদের ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পেয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা দৃশ্যমান নয়। যারা অর্থ পাচার অথবা বিদেশে সম্পদ ক্রয় করেছেন, তাদের নামের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। যারা দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করেছেন, তাদের চেহারা জাতির সামনে উন্মোচন করা একান্ত প্রয়োজন। এছাড়া পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। প্রয়োজনে লবিস্ট নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

 

 

যে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে সঠিক ও নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং তার মাধ্যমে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা। বিগত সরকার আমলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অনেক ক্ষেত্রেই ভোটার তালিকা থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক ভুয়া ব্যক্তিকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাই আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও বিতর্কহীনভাবে সম্পন্ন করার জন্য নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা একান্ত জরুরি। নির্বাচন কমিশন থেকে এর আগে ভোটার তালিকা যাচাই করার জন্য বাড়ি বাড়ি টিম পাঠানো হয়েছিল; কিন্তু এসব টিম কতটা সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব টিম সরেজমিন বাড়ি বাড়ি না গিয়েই ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধন করেছে। ফলে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তিকরণ ও মৃত ব্যক্তিকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। ভোটার তালিকা যাচাইকারী দল কেন এটা করেছে, তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। তারা কি নির্বাচনকে বিতর্কিত করার জন্য এটি করেছেন, নাকি শ্রম বাঁচানোর জন্য করেছেন? এখনো সময় আছে, নির্বাচন কমিশন অল্প কয়েকদিনের নোটিশে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিতে পারে।

 

 

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা বা অন্য কেউ যাতে নির্বাচনে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। উপদেষ্টাদের মধ্যে কারও কারও কার্যকলাপ বিতর্কের সৃষ্টি করছে। এটি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসবে, একটি মহল নির্বাচনকে বানচাল করার জন্য তৎপরতা চালাবে। এটা যে কোনোভাবেই হোক, প্রতিরোধ করতে হবে। কারণ এ মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করা। এর কোনো বিকল্প নেই।

 

 

 

অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত