কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

নিরাপদ অভিবাসনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

রায়হান আহমেদ তপাদার  লন্ডন থেকে [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ১১ এপ্রিল ২০২৬]

নিরাপদ অভিবাসনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

দেশের অর্থনীতিকে যদি একটি বিশাল বৃক্ষ ধরা হয়, তবে তার অন্যতম শক্তিশালী  শেকড় হলো রেমিট্যান্স। লাখো প্রবাসী শ্রমিক বিদেশের মাটিতে রোদে-ঘামে কাজ করে যে অর্থ দেশে পাঠান, তা শুধু পরিবারের জীবনমান বদলায় না, পুরো অর্থনীতিকে সচল রাখে। অনেক সময় বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে যখন দেশের অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তখন প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স হয়ে ওঠে ভরসার আলো। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যান। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, ২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ১৬ হাজার ৩৯৯ জন অভিবাসীর মধ্যে প্রায় ৮২ দশমিক ৪ শতাংশ গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মোট ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশ এসেছে জিসিসি দেশগুলো থেকে। এতে বোঝা যায়, কাজ ও আয়ের জন্য বাংলাদেশ কতটা এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল।

 

 


অভিবাসন শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, এটি রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গেও জড়িত। মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরি, চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তাই অভিবাসনকে শুধু চাহিদা ও জোগানের বিষয় হিসেবে না দেখে, বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বোঝা জরুরি। অভিবাসী শ্রমিকদের ভূ-রাজনৈতিক প্রকৃতি ও পরিস্থিতিকে ভালোভাবে বোঝার জন্য আমাদের দেখতে হবে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেশগুলো কীভাবে আচরণ করে।

 

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রখ্যাত রাজনীতিবিজ্ঞানী হ্যান্স মরগেনথাউ তার ‘পলিটিকস অ্যামং নেশনস’ এবং কেনেথ ওয়াল্টজ তার ‘থিওরি অব ইন্টারন্যাশনাল পলিটিকস’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কোনো সংকটের সময় রাষ্ট্রগুলো আগে নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তার কথাই ভাবে; তাই তখন অভিবাসী শ্রমিকদের গুরুত্ব কমে যায়। স্বাভাবিক সময়ে তাদের প্রয়োজনীয় মনে করা হলেও, সমস্যা বাড়লে সহজেই তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। এই বাস্তবতায় অভিবাসন ব্যবস্থাপনাও দুর্বল হয়ে পড়ে। দেশগুলোর মধ্যে করা সমঝোতা বা চুক্তিগুলো সংকটের সময় ঠিকমতো কাজ করে না। কারণ, তখন প্রতিটি দেশ নিজের স্বার্থে আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। অভিবাসন বিষয়ে গবেষক স্টিফেন ক্যাসলস, হাইন ডে হাস ও মার্ক জে মিলার তাদের দ্য এজ অব মাইগ্রেশন বইয়ে দেখিয়েছেন, অনেক সময় স্বাগতিক দেশ হঠাৎ নিয়ম বদলে দেয় বা নতুন সিদ্ধান্ত নেয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) তাদের ওয়ার্ল্ড মাইগ্রেশন রিপোর্ট ২০২২-এ বলেছে, অভিবাসীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী। এ কারণে যে কোনো সংকট শুরু হলেই,  তার প্রভাব সরাসরি অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর পড়ে।

 

 


ইরান যুদ্ধে অনেক অভিবাসী শ্রমিককে যুদ্ধের ভিডিও বা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করার অভিযোগে আটক বা দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে সংকটের সময় অভিবাসী শ্রমিকদের সহজেই সন্দেহের চোখে দেখা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে অভিবাসী শ্রমিকরা শুধু শ্রমশক্তি নয়, তারা ভূ-রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ একটি জনগোষ্ঠী। ভবিষ্যৎ অভিবাসনপ্রবণতা ও কাঠামোগত ঝুঁকি, ইরান ঘিরে চলমান উত্তেজনা শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি ভবিষ্যতে বৈশ্বিক শ্রমবাজারকেও প্রভাবিত করবে। এই যুদ্ধে ইতিমধ্যে তেল ও গ্যাস খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির মূল ভিত্তি।

 

 

 এর ফলে সরকারের আয় কমবে, বড় বড় বিনিয়োগ পিছিয়ে যাবে এবং পুরো অঞ্চলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়বে। সৌদি আরবে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাবে ভিশন ২০৩০ প্রকল্পগুলোতে। যত দিন যাবে, উপসাগরীয় দেশগুলো আরও বেশি অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করবে। এর ফলে কম দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমবে; মধ্যপ্রাচ্য সরকারগুলো স্থানীয় নাগরিকদের চাকরিতে অগ্রাধিকার দিতে জাতীয়করণ নীতি আরও জোরদার করবে। এতে ধীরে ধীরে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের কম দক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা কমে যাবে। বাংলাদেশের জন্য এসবের প্রভাব হবে গুরুতর। উপসাগরীয় দেশে কাজের সুযোগ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, নতুন কর্মসংস্থান কমবে এবং ভিসা পাওয়া কঠিন হবে। কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কারণে রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে। অনেক শ্রমিক সঞ্চয় ছাড়াই দেশে ফিরতে বাধ্য হবেন, যা দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াবে। এ সবের জন্য শুধু নীতিগত পরিবর্তন নয়, অভিবাসনের ধরনেও পরিবর্তন আনতে হবে এবং দক্ষতা ও ভাষাভিত্তিক কৌশলের দিকে যেতে হবে।

 

 


প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো ডিজিটাল করলে, শিক্ষার্থীরা সরাসরি তাদের কাছ থেকে ভাষা ও কাজের দক্ষতা শিখতে পারবেন। এ জন্য বিদেশি সরকার বা কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্ব করে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে তারা নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী কর্মী তৈরি করে সরাসরি নিয়োগ দিতে পারবে। ফলে দক্ষতা বাড়বে, দালালের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং অভিবাসন আরও নিরাপদ ও স্বচ্ছ হবে। পাশাপাশি একটি নতুন কৌশলগত দিক হতে পারে ভার্চুয়াল অভিবাসন, যা প্রচলিত আউটসোর্সিং থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা; যেখানে আউটসোর্সিং সাধারণত মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ভার্চুয়াল অভিবাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীরা দেশেই অবস্থান করে সরাসরি বিদেশি নিয়োগকর্তাদের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে পারবেন।

 

 

 এর মধ্যে আইটি সেবা, ফ্রিল্যান্সিং ও বিভিন্ন পেশাগত দূরবর্তী কাজ অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু এ প্রক্রিয়ায় ভিসা, সীমান্ত বা ভৌগোলিক স্থানান্তরের ওপর নির্ভর করতে হয় না, তাই এটি ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স এক অমূল্য শক্তি, যা কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত করছে এবং রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এখনই প্রয়োজন দক্ষতা উন্নয়ন, প্রবাসীদের অধিকার সুরক্ষা, বৈধ চ্যানেলের ব্যবহার বাড়ানো এবং রেমিট্যান্সকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা।

 

 

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক