কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

নেতানিয়াহুর গণহত্যা ও ইহুদিদের ভূমিকা কি একই

[সূত্র : কালবেলা, ১৬ নভেম্বর ২০২৫]

নেতানিয়াহুর গণহত্যা ও ইহুদিদের ভূমিকা কি একই

ফিলিস্তিনির গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত নৃশংস অভিযানের দুই বছর পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘ এ সময়জুড়ে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এমন অবস্থায় বিশ্বব্যাপী ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের সামনে প্রয়োজন দেখা দিয়েছে এক গভীর আত্মসমালোচনার। ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে নীরব সমর্থনের দায় এড়ানোর আর অবকাশ নেই তাদের। ফিলিস্তিনিদের ওপর পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও প্রযুক্তি-নিয়ন্ত্রিত হত্যাযজ্ঞের মতো কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে ইসরায়েলি রাষ্ট্রযন্ত্র। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ইসরায়েলের সাধারণ নাগরিক এবং প্রবাসী ইহুদিদের একাংশ এ নৃশংসতার নৈতিক সমর্থক হয়ে উঠতে দেখা গেছে। এটি নিছক রাজনৈতিক ত্রুটি নয়, বরং গভীরতম মানবিক ব্যর্থতা।

 

 

আমি নিজে একজন ইহুদি হিসেবে দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েলের শাসকগোষ্ঠীর শ্বাসরুদ্ধকর প্রভাব থেকে প্রবাসী ইহুদিদের মুক্তির পক্ষে আওয়াজ তুলেছি। জার্মানিতে নাৎসিদের হলোকস্টে প্রাণ হারিয়েছে অমার পরিবারের সদস্যরা। গণহত্যায় আপনজনদের হারানোর যন্ত্রণাটা কেমন, তা আমার জানা। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমি এ কথাগুলো লিখছি।

 

 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে আমাদের চোখের সামনে ফিলিস্তিনিদের গণহত্যা প্রত্যক্ষ করে আসছি। ইহুদি ধর্মাবলম্বী হিসেবে অথবা গণহত্যা পরিচালনাকারী দেশের নাগরিক হিসেবে, কোনো পরিচয় থেকেই এ দায় অস্বীকার করার উপায় নেই। এখন সময় এসেছে জবাবদিহির; সময় এসেছে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতের মুখোমুখি অপরাধীদের দাঁড় করানোর। যারা সরাসরি অবৈধ হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে, পাশাপাশি যারা লন্ডন, নিউইয়র্ক, সিডনি বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে বর্ণবাদ, ভয়, প্রতিশোধের তাড়না কিংবা রক্তপিপাসার বশে এই নৃশংসতাকে সমর্থন জানিয়েছে, তাদেরও এই দায় স্বীকার করতে হবে।

 

 

 

আমরা যেন ভুলে না যাই, ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যায় কেবল হাতিয়ারধারী হত্যাকারীরাই দায়ী ছিল না; বরং যারা গণমাধ্যমে ঘৃণা ছড়িয়েছিল তারাও একই অপরাধের অংশীদার ছিল। আজ ইসরায়েলের বিপুলসংখ্যক ইহুদি নাগরিক গাজার প্রতিটি ফিলিস্তিনিকে সন্দেহভাজন দৃষ্টিতে দেখে। কেউ কেউ ফিলিস্তিনি মানেই সন্ত্রাসবাদী কিংবা শত্রু বলে মনে করে। এ বাস্তবতা আমাদের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করেছে।

 

 

 
 

৭ অক্টোবর-পরবর্তী সময়ে বহু ইহুদি সম্প্রদায়ের ভেতরে যে বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। রাজনৈতিক মতভেদ তৈরি হলে, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে সামান্য সন্দেহ কিংবা নৈতিক প্রশ্ন তুললে যে ধরনের প্রকাশ্য বিদ্বেষের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা নজিরবিহীন। নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা তো দূরের কথা, ইসরায়েলি রাষ্ট্রের ঘোষিত নীতি যেখানে তারা প্রকাশ্যে বারবার বলেছে যে, তারা সব ফিলিস্তিনিকে নিশ্চিহ্ন করতে চায় সেটির বিরুদ্ধে কথা বলা বা প্রতিবাদ করাটাও অনেক জায়গায় রীতিমতো অপরাধ হয়ে গেছে।

 

 

 

আধুনিক যুগের মানুষ হিসেবে একজন ইহুদির কী রকম অনুভব করা উচিত যখন ইসরায়েলি সেনাদের কেউ প্রকাশ্যে গর্ব করে জানায় যে, তারা গাজায়, পশ্চিমতীরে এবং আরও বহু জায়গায় হত্যাকাণ্ড, ধ্বংসযজ্ঞ আর ধর্ষণে অংশ নিয়েছে? তাদের নৈতিক দ্বিধার জায়গাটা কোথায় থাকে? অন্যায়ের প্রতিবাদ করাটা কি এতটাই কঠিন? গণহত্যাকে নিন্দা জানানো ও প্রতিহত করাটা তো এত দুঃসাধ্য হওয়ার কথা ছিল না।

 

 

তবুও দুঃখজনকভাবে বিপুলসংখ্যক ইহুদি এ নৃশংসতার ঘটনাগুলোকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন যেন ইসরায়েলি সামরিক বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকজন কুলাঙ্গার ছাড়া আর কেউ এর জন্য দায়ী নয়। এ ব্যাখ্যা সুবিধাজনক হলেও বাস্তবতা থেকে বহু দূরের। রাষ্ট্রীয় জায়নবাদের সূচনালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের একটি হুমকি বলে মনে করা হয়েছে। তারা এমন একটি জনসমষ্টি, যাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ বা জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা বহু ইসরায়েলি এবং তাদের পশ্চিমা সমর্থকদের মনে দীর্ঘকাল ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে।

 

 

‘হয় আমরা হারব এবং ওরা জিতবে, নয় ওরা হারবে এবং আমরা জিতব’— এ বিশ্বাসই ১৮৯০-এর দশক থেকে জায়নবাদী চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। এ প্রবণতা আজও অপরিবর্তিত। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু জায়নবাদী তত্ত্ব থেকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের বাস্তবিক আচরণকে আলাদা করা এখন আর সম্ভব নয়। এই বিশ্বাস আর তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা নীতি আমাদের ইতিহাসের এমন এক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ইসরায়েল আত্মরক্ষার নামে গাজায় গণহত্যা চালালেও পশ্চিমা রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর এক বড় অংশ সেই হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করছে।

 

 

গাজার দেইর আল-বালাহ নগরের অধিবাসী ছিলেন জেহাদ আবু সালিম। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর প্যালেস্টাইন স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক। সম্প্রতি তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরেছেন। সেই সত্য বলছে, একবিংশ শতকের জীবনকে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার যে নির্মম ও স্বৈরাচারী পরিকল্পনা চলমান রয়েছে, তার বিরুদ্ধে গাজার বিদ্রোহ যেন একটি জ্বলন্ত বিপ্লব। বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র, বিচ্ছিন্ন ও অবরুদ্ধ মানুষগুলো যুদ্ধবিধ্বস্ত জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম করে দেখিয়েছে যে, মানুষ এখনো আদর্শের জন্য বাঁচতে পারে, আদর্শের জন্য মরতে পারে। তারা দেখিয়েছে দাসত্ব প্রত্যাখ্যান করা যায়। আর সেটা করতে গিয়ে তারা মানবজাতির প্রকৃত শত্রুদের উন্মোচিত করেছে। হাজির করেছে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, অক্ষম সামরিক ও রাজনৈতিক সংগঠন, ত্রুটিপূর্ণ শাসনব্যবস্থা এবং তথাকথিত আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার ভঙ্গুরতাকে।

 

 

সৌভাগ্যক্রমে আজ আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের অনেক ইহুদি ইসরায়েলের এই গণহত্যাকে প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেছে। তারা নেতানিয়াহুর ধ্বংসাত্মক নীতি, অবরোধ, বেসামরিক হত্যাযজ্ঞ সবকিছুকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের প্রবাসী ইহুদিরা, যারা ইহুদি ধর্মকে ইসরায়েলি বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের সাথে একীভূত হতে দিতে চায় না।

 

 

তবু ইহুদি প্রতিষ্ঠানগুলোর বৃহৎ অংশ ইসরায়েলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে অনড়। ইহুদি বুদ্ধিজীবী শাউল মাগিদ এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘পশ্চিমা জায়নবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর চিন্তায় আতঙ্কজনকভাবে এখনো বাস করে উগ্র ডানপন্থি রাবাই মেইর কাহানের চেতনা যার কেন্দ্রে আছে মূলত আরব, ইসলাম ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি গভীর ঘৃণা।’ এ কারণেই দেখা গেছে, ৭ অক্টোবরের পর গাজাবাসীদের ওপর পরিচালিত গণহত্যার ব্যাপারে বহু ইহুদি হয় সম্পূর্ণ নীরব থেকেছে, নয়তো ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞে পূর্ণ সমর্থন প্রদর্শন করেছে।

 

 

নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানির নির্বাচনী প্রচারণার দরুন নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়েছে এ মানসিকতা। গণতান্ত্রিকভাবে তার নীতিতে আপত্তি তোলা স্বাভাবিক, কিন্তু মূলধারার বহু ইহুদি প্রতিষ্ঠান এবং ধর্ম যাজকরা তাকে আক্রমণ করেছে শুধু ইসরায়েলের সমালোচনা করার জন্য। তিনি প্রকাশ্য জায়নবাদবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন বিধায় তাকে ইহুদিবিদ্বেষী বলা হয়েছে; এমনকি নিউইয়র্কে ইহুদিদের অস্তিত্বের জন্য তাকে একটি হুমকি বলেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।

 

 

অভিযোগগুলো ছিল একই সঙ্গে হাস্যকর ও ভীতিকর। সাংবাদিক পিটার বেইনার্ট যথার্থই বলেছেন, এই ধর্মীয় নেতারা ইসরায়েলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কোনো সীমা মানছেন না। এমনকি যখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ বিশ্বজুড়ে বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে, তখনো তারা ইসরায়েলের পক্ষেই সমর্থন বজায় রেখেছেন। বেইনার্ট আরও প্রশ্ন তুলেছেন ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি এ অন্ধ সমর্থনের জন্য তারা আর কী ত্যাগ করতে প্রস্তুত?

 

 

নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে মামদানির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ড্রু কুয়োমো এবং গণমাধ্যমে তার ডানপন্থি সহযোগীদের উন্মাদ মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারাভিযানে ইহুদি নেতৃত্বের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। এগুলোই কি ইহুদি মূল্যবোধ? যারা গণহত্যাকারীদের পাশে দাঁড়ায়, তাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ধরে রাখাটা কি কখনো নৈতিক হতে পারে?

 

 

ইসরায়েলের প্রবাসবিষয়ক ও ইহুদিবিদ্বেষবিরোধী মন্ত্রী হলেন আমিখাই চিকলি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে উগ্র ডানপন্থিদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে খ্যাত। মামদানির বিজয়ের কয়েক ঘণ্টা পরই তিনি ঘোষণা দেন যে, ‘নিউইয়র্ক নগর হামাসের এক সমর্থকের হাতে তার চাবি তুলে দিয়েছে।’ মামদানিকে ‘জিহাদি’ এবং ‘মৌলবাদী’ বলে আখ্যায়িত করে চিকলি বলেন, তার হাত থেকে রেহাই পেতে হলে নিউইয়র্কবাসীরা ইসরায়েল চলে যেতে পারেন।

 

 

এগুলোই কাহানে-উৎসারিত সেই মূল্যবোধ, যার কেন্দ্রে রয়েছে ধর্মীয় ও জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ববোধ এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ঘৃণা। তবে এ কথাও ঠিক যে, বহু ইহুদি এসব মতাদর্শকে ঘৃণা করেন। কারণ তারা প্রত্যক্ষ দেখতে পেয়েছেন কীভাবে জায়নবাদ আমাদের ধর্মকে বিকৃত করেছে। তবুও এই উগ্র চিন্তাধারা বহু প্রভাবশালী ইহুদি নেতার ভাবনায় প্রবলভাবে রয়ে গেছে। এই নেতারা দাবি করেন যে, তারাই নাকি আমাদের সবার পক্ষ হয়ে কথা বলবেন। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা অনেক ভিন্ন।

 

 

এ কারণেই আজ ইহুদি সমাজের ভেতরে এক নৈতিক আত্মসমালোচনা অপরিহার্য। ইহুদি ধর্মকে জায়নবাদ এবং ইসরায়েলি সরকার থেকে পৃথক করা প্রয়োজন। এমনকি অধিকাংশ ইসরায়েলি নাগরিক, যারা জাতিগতভাবে ‘বিশুদ্ধ ইহুদি রাষ্ট্র’ গঠনে বিশ্বাসী, তাদের থেকেও এ ধর্মকে সরিয়ে আনা দরকার। গাজার গণহত্যা বস্তুত একটি অধ্যায় মাত্র। এই সমস্যার শিকড় বহু গভীরে; এর অস্তিত্ব বহু দশক পুরোনো। আর দেরি সহ্য করা সম্ভব নয়। ইহুদি ধর্ম, জায়নবাদ, ইসরায়েল রাষ্ট্র—এই সবকিছুর মাঝে ভেদাভেদ নিয়ে আলোচনা এবং এসবের মাঝে যা কিছু ত্রুটিপূর্ণ, সেসব নিয়ে আত্মসমালোচনার সময় এসেছে।

 

 

লেখক: অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা, জেরুজালেম শান্তি পুরস্কার জয়ী এবং বেসরকারি সংস্থা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্টে অস্ট্রেলিয়ান জিউয়িশ ভয়েসেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা। নিবন্ধটি মিডল ইস্ট আইয়ের মতামত বিভাগ থেকে অনুবাদ করেছেন অ্যালেক্স শেখ