নেপালে কেন বারবার সরকার পতন হচ্ছে
ড. সুজিত কুমার দত্ত [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

নেপাল হিমালয়ের কোলে অবস্থিত এক নয়নাভিরাম দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলছে। ২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তির পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে ১৪টি সরকার গঠিত হয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে কোনো সরকারই তাদের পাঁচ বছরের সাংবিধানিক মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। এই ধারাবাহিক সরকার পতন শুধু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাই সৃষ্টি করছে না, বরং দেশটির গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথেও এক বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? কেন নেপালের রাজনৈতিক দলগুলো একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনে ও তা টিকিয়ে রাখতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরে।
নেপালের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের শুরু ১৯৫১ সালে। এর আগে দেশটি বিভিন্ন রাজবংশের অধীনে শাসিত হতো, যেখানে রানা শাসকরা বংশানুক্রমিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদ দখল করে রেখেছিলেন। ১৯৫১ সালের গণতন্ত্রী আন্দোলনের জোয়ারে এই রানা শাসনের অবসান ঘটে এবং নেপালে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
কিন্তু এই গণতান্ত্রিক যাত্রা ছিল ক্ষণস্থায়ী। মাত্র এক দশক পরেই, ১৯৬১ সালে রাজা মহেন্দ্র রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে নিজের ক্ষমতা পুঞ্জীভূত করেন এবং ‘পঞ্চায়েত’ নামে একটি শাসনব্যবস্থা চালু করেন। এই ব্যবস্থা ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল, যখন ‘পিপলস মুভমেন্ট’ নামে এক ব্যাপক আন্দোলনের ফলে রাজা বীরেন্দ্র রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হন এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে। এরপর নেপাল এক নতুন রাজনৈতিক ধারায় প্রবেশ করে, কিন্তু শান্তি স্থায়ী হয়নি।
১৯৯৬ সালে মাওবাদীরা রাজতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। এই সংঘাত টানা এক দশক ধরে চলে এবং এতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৬ সালে সাধারণ মানুষের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এই আন্দোলনের ফলে ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র পুরোপুরি বিলুপ্ত হয় এবং নেপাল একটি ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।
নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতার আরেকটি কারণ হলো ২০১৫ সালে প্রণীত নতুন সংবিধান।
এই সংবিধান রাজতন্ত্রের অবসানের পর দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যেক সুসংহত করার জন্য তৈরি হলেও এর বিভিন্ন ধারা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক মতানৈক্য ও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। সংবিধানের কিছু বিধান এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা জোট সরকার গঠনে উৎসাহিত করে, কিন্তু এই জোটগুলোর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে না। ফলে সরকার গঠনের পর থেকেই শুরু হয় ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে অন্তঃকোন্দল, যা অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার পতনের কারণ হয়। বারবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন, আস্থা ভোট এবং সাংবিধানিক ব্যাখ্যার জন্য সৃষ্ট সংকট নেপালের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এক নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে দলীয় স্বার্থ এবং ক্ষমতার লড়াই। নেপালের রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে প্রধান দলগুলো জাতীয় স্বার্থের চেয়ে নিজেদের দলীয় এবং ব্যক্তিগত স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেয়। জোট সরকারগুলো সাধারণত ক্ষমতা ভাগাভাগির দুর্বল ভিত্তির ওপর গঠিত হয়, যেখানে এক বা একাধিক দল তাদের দাবি পূরণ না হলে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। উদাহরণস্বরূপ, কে পি শর্মা অলিকে বারবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হতে দেখা গেছে। ২০১৫ সালে প্রথমবার, এরপর ২০১৮, ২০২১ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে। কিন্তু প্রতিবারই তাঁর সরকার সংকটে পড়েছে।
নেপালের সংবিধানের কিছু ধারা এমন, যা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে। এর ফলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয় এবং বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংকট আরো তীব্র হয়েছে। সরকার পতনের পর সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। নেপালের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ঘোষণা করেছে যে আগামী বছরের মার্চে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এ ছাড়া নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে আঞ্চলিক প্রভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নেপালের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীন। উভয় দেশই নিজেদের প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী। নেপালের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর এই দুই দেশের প্রভাব স্পষ্ট, যা সরকার গঠন ও ভাঙার পেছনে কাজ করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিভাজন ও ক্ষমতার লড়াইকে এই আঞ্চলিক প্রভাব আরো তীব্র করে তোলে। এটি নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক খেলায় পরিণত করেছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ বিরোধের পাশাপাশি বহিরাগত স্বার্থও কাজ করে।
নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সাম্প্রতিক কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের আন্দোলন। ২০২৫ সালে নেপালের সরকার পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে এই আন্দোলনকে চিহ্নিত করা হয়। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সরকারি পদে নিয়োগে অস্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক নেতাদের ব্যর্থতায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে ক্ষোভ জমেছিল, তা এই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই তরুণরা এক নতুন ধরনের প্রতিবাদের জন্ম দেয়, যা রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আন্দোলন প্রমাণ করে, নেপালের রাজনৈতিক সংকট এখন শুধু দলগুলোর মধ্যকার ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং তা সমাজের গভীরে থাকা হতাশারও প্রতিফলন। তরুণ প্রজন্মের এই নতুন চাপ রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্য করছে নিজেদের পুরনো ধারা থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের প্রকৃত প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিতে।
নেপালের এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে হলে দেশটির রাজনৈতিক দলগুলোকে দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী সরকার গঠনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া অপরিহার্য। পাশাপাশি ২০১৫ সালের সংবিধানের যে ধারাগুলো রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করছে, সেগুলোর সমাধান করতে হবে। এটি সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে করা যেতে পারে, যা রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি সাধারণ নীতিতে কাজ করতে বাধ্য করবে। জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রোধ করা অত্যন্ত জরুরি।
নেপালের জনগণ দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে গণতন্ত্র অর্জন করেছে। এই গণতন্ত্রকে টেকসই ও কার্যকর করতে হলে রাজনৈতিক নেতাদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। ইতিহাস প্রমাণ করে যে বিভাজন ও ক্ষমতার লড়াই শেষ পর্যন্ত কোনো জাতির জন্যই মঙ্গলজনক নয়। নেপালের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ও ঐক্যের ওপর। যদি এই নেতৃত্ব তাদের ঐতিহাসিক ভুল থেকে শিক্ষা না নেয়, তবে দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হবে এবং উন্নয়নের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়