নদী সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকার কত নম্বর পেতে পারে
শেখ রোকন [সূত্র : সমকাল, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারে অন্তত চারজন উপদেষ্টা রয়েছেন, যারা গত তিন দশক ধরে নদী ও পরিবেশ আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে রয়েছেন। খোদ প্রধান উপদেষ্টাসহ আরও কয়েকজন উপদেষ্টা নাগরিক সমাজের অংশ হিসেবে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সুরক্ষার অংশ হিসেবে পরিবেশগত সুশাসনের প্রশ্নটিও সামনে রেখে এসেছেন। এখন যদি স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে দেশের নদনদী সুরক্ষার কার্যক্রমে গুণগত পরিবর্তন না হয়, তাহলে আর কখন?
বিশ্ব নদী দিবস সামনে রেখে মনে পড়ছে, গত বছর আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের নদ-নদী সুরক্ষায় নতুন সরকারের করণীয় বিষয়ে সমকালেই অন্তত দুটো নিবন্ধ লিখেছিলাম। প্রথমটি ‘নদী সুরক্ষায় নতুন সরকারের পাঁচ করণীয়’ (১৯ আগস্ট ২০২৪) এবং দ্বিতীয়টি ‘২০২৫ সালে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে ৫ চ্যালেঞ্জ’ (৩১ ডিসেম্বর ২০২৪)। স্বভাবতই নদী সুরক্ষার প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল অন্য যে কোনো আমলের চেয়ে বেশি। বাস্তবে তারা কতটা সফল হয়েছেন? ব্যবহারিক পরীক্ষার খাতা যদি দেখি, তাহলে কত নম্বর পেতে পারেন?
১. নদী কমিশন সংস্কার
গত বছর গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সেই যে শূন্য হয়েছিল, চেয়ারম্যান বা সদস্য আর নিয়োগ দেওয়া হয়নি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বটে, তিনি গত এক বছরে বেতন-ভাতাজনিত স্বাক্ষর ছাড়া আক্ষরিক অর্থে কোনো কাজ করেননি। হতাশাজনকভাবে, নদী কমিশনের আইনেই সীমাবদ্ধতা ছিল। গত বছরে সেই সীমিত কাজটুকুও শূন্যে নেমে এসেছে।
২. নদ-নদীর তথ্যভান্ডার তৈরি
গত এক বছরে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে যে কাজটি অপেক্ষাকৃত আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে, সেটি হচ্ছে নদ-নদীর তালিকা। অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের যুক্ত করে শেষ পর্যন্ত ১৪১৫টি নদ-নদীর তালিকাভুক্তি সম্ভব হয়েছে। কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, বিশেষত সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা এবং নদী ও খালের পার্থক্য নির্ধারণ না হওয়ায়, তালিকাটি গ্রহণযোগ্য। তবে সামাজিক গবেষণার নিয়ম মেনে ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে তালিকাটি করা উচিত ছিল অববাহিকাভিত্তিক। তাহলে অনেক বিভ্রান্তি ও পুনরাবৃত্তি এড়ানো সহজ হতো। তারপরও দীর্ঘ ও অভিন্ন তালিকার কাজটি সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দেশে নদ-নদীর তথ্যভান্ডার তৈরির ক্ষেত্রে তালিকাটি প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র।
৩. প্রকল্প পর্যালোচনা ও ব্যয় সাশ্রয়
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপর আমরা বলেছিলাম যে, নদী সুরক্ষায় চলমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা দরকার। কারণ গত কয়েক দশকে এমন অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়ছে, যেগুলোতে কাজের চেয়ে অকাজ হয়েছে বেশি। এতে যেমন রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে, তেমনই খোদ নদীরও ক্ষতি হয়েছে। যেমন, আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু বুড়িগঙ্গা সুরক্ষায়ই গত দুই দশকে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দের প্রকল্প ‘বাস্তবায়ন’ হয়েছে। বিদ্যমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো শুধু নয়; ভবিষ্যতেও এমন প্রকল্প নিতে হবে, যেগুলোতে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিত হবে। কিন্তু প্রকল্প ফেঁদে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পকেট ভারী করার পুরোনো ধারা এখনও চলমান।
৪. দখল-দূষণ রোধে শূন্য সহিষ্ণুতা
দেশে এখন এমন কোনো নদী পাওয়া যাবে না, যা দখল-দূষণের শিকার হয়নি। দখল ও দূষণ নিয়ে যে শূন্য সহিষ্ণুতা প্রয়োজন, সেটি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা করেছিলাম। স্বীকার করতে হবে, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সেই সদিচ্ছার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে দেশের সব জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে একটি করে নদী দখল ও দূষণমুক্ত করার কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিক ১৩টি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। বগুড়ার করতোয়া ও নাটোরের বড়াল নদের স্লুইসগেট অপসারণ করা হয়েছে। সমস্যার তুলনায় এগুলো সিন্ধুর মধ্যে বিন্দু। এটিও স্বীকার করতে হবে, দখল-দূষণমুক্ত করার কাজটি এক বছরে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। বড় কথা, নীতিগত সদিচ্ছা মাঠ পর্যায়ে প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়টি এখনও দৃশ্যমান নয়।
৫. নির্বিচার বালু উত্তোলন বন্ধ
দলীয় সরকারগুলোর আমলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা বালুমহাল ইজারা পেতো। বালুমহাল আইন ও বিধিমালায় নদীর ঢাল বা তলদেশ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য প্রজননক্ষেত্র ও আবাস, সড়ক বা সেতু নষ্ট না করার কথা বলা থাকলেও সেটি থোরাই কেয়ার করা হতো। ইজারা এলাকার বাইরে গিয়ে বালু তোলার বিষয়টিও ওপেন সিক্রেট। এমনকি ইজারা ছাড়াও কেবল গায়ের জোরে বালু তোলা হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এভাবে নদী হত্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। যেখানে সেখানে ড্রেজার বসিয়ে যেভাবে খুশি বালু তোলা হচ্ছে। বালুমহাল হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্বৃত্তপনার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
৬. মৎস্যসম্পদ সুরক্ষা
বালুমহালের মতো জলমহালও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে; যখন যে দল ক্ষমতায়, তখন তারাই এসব জলমহাল নিয়ন্ত্রণ করেছে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির পর বেশির ভাগ জলমহাল বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীর দখলে চলে গেছে। এর ফলে কিছু ‘রাজনৈতিক মৎস্যজীবী’ সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেছে; আর প্রকৃত মৎস্যজীবীরা জীবিকা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, হঠাৎ মৎস্যজীবীরাই নিষিদ্ধ জাল, বিষ, কারেন্টশক ব্যবহার করে মাছ ধরেন। ফলে মৎস্যসম্পদের প্রজনন, আবাসন ও উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, গত এক বছরেও পুরোনো ধারার ব্যত্যয় ঘটেনি।
৭. নদীভাঙন রোধ
নদীভাঙন বাংলাদেশের মতো ব-দ্বীপে দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা। তারচেয়েও দুর্ভাগ্য হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে নদীভাঙন রোধে সরকার যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাতে অন্তত তিন ধরনের অনিয়ম থাকে। প্রথমত, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এলাকার বদলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এলাকায় বেশি বরাদ্দ হয়। দ্বিতীয়ত, বরাদ্দের বড় একটি অংশ যায় বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের কমিশন বাবদ। আবার ঠিকাদারের অনিয়ম ও ফাঁকির পর যা থাকে, সেটি নিয় নদীভাঙন রোধ করা কঠিন। আবার দেশীয় প্রযুক্তি ও লোকায়ত প্রজ্ঞার মাধ্যমে নদীভাঙন রোধের যে ঐতিহ্য রয়েছে, সেটিকে অগ্রাহ্য করে বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয় আসলে বড় কমিশন ও বড় অনিয়মের লোভে। অন্তর্বর্তী সরকার নদীভাঙন রোধে আগের তুলনায় আন্তরিক বটে, মাঠ পর্যায়ে আগের ব্যবস্থা বহাল।
৮. খাল উদ্ধার
অতীতে দেখা গেছে, যতবারই সরকার বা স্থানীয় সরকারে পরিবর্তন হয়েছে, অনিবার্য এজেন্ডা হিসেবে এসেছে খাল উদ্ধারের উদ্যোগ। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতাগ্রহণের পর ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরী ও সংলগ্ন এলাকার খালগুলো উদ্ধার কার্যক্রমও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শুরু হয়েছে। কাজের কাজ কতখানি হচ্ছে, এর একটা উদাহরণ হতে পারে বুড়িগঙ্গার শুভাঢ্যা খাল। ওই এক শুভাঢ্যা খাল ২০০০, ২০০৭, ২০১৫, ২০১৬, ২০২৩, ২০২৫ সালে একবার করে ‘উদ্ধার’ হয়েছিল। প্রতিবারই রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ হয়েছে; কিন্তু খালটির পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হয়েছে।
৯. প্লাস্টিকদূষণ নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশের নদ-নদীর প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য যে দুটি ‘মডার্ন মনস্টার’ সবচেয়ে ভয়ংকর, তার একটি বালু উত্তোলন, অপরটি প্লাস্টিকদূষণ। বিশেষত প্লাস্টিকদূষণের কারণে নদ-নদীর কিছু প্রধান উপযোগিতা যেমন সুপেয় পানি হিসেবে ব্যবহার, মৎস্যসম্পদের আবাস হিসেবে ব্যবহার, সেচের উৎস হিসেবে ব্যবহার কমে যায়। আবার গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, নদী ও জলাভূমি বেয়ে মাছে ও ফসলে ঢুকছে মাইক্রোপ্লাস্টিক; সেখান থেকে মানবদেহে। এর একটিই সমাধান, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বন্ধ এবং বাকিগুলো পুনর্চক্রায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্লাস্টিক বন্ধে চেষ্টা করেছে, স্বীকার করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যর্থ হয়েছে।
১০. কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ
দেশের রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কেমন বেড়েছে? ১৯৭২ সালে যেখানে ব্যবহার ছিল মাত্র চার হাজার টন, ২০২২ সালে তা দাঁড়ায় ৪০ হাজার টন। ফসলে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি নয়; এটা বৃষ্টি ও বন্যায় নদী ও জলাশয়ে গিয়ে মৎস্যসম্পদের প্রজনন ও উৎপাদন ব্যাহত এবং নদীর পানি গুণগত মান নষ্ট করছে। অন্তর্বর্তী সরকার রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার রোধে কী করেছে, স্পষ্ট নয়।
১১. গঙ্গার চুক্তি নবায়ন
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রবাহিত দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃত ৫৪ বা রিভারাইন পিপলের গবেষণামতে ১২৩ আন্তঃসীমান্ত নদীর মধ্যে এখন পর্যন্ত কার্যকর সমঝোতা বলতে সবেধন নীলমণি ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি। গঙ্গা চুক্তিতে ভাটির দেশের অধিকার ও ন্যায্যতা কতটা সুরক্ষিত, সেই প্রশ্ন যদিও প্রথম থেকেই ছিল; আসন্ন শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে এর নবায়ন। ২০২৬ সালের ১১ ডিসেম্বর ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তিটির কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে। এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার গঙ্গা চুক্তির নবায়ন নিয়ে কার্যত এক কদমও অগ্রসর হতে পারেনি।
১২. তিস্তার পানিবণ্টন বা ব্যবস্থাপনা
তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা চলছে ‘সেই ১৯৫৩ সাল থেকে’। সর্বশেষ, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকায় এলেও শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষরিত হয়নি। এরপর থেকে ১৩ বছর ধরে ভারতের দিক থেকে একের পর এক প্রতিশ্রুতি এসেছে, চুক্তি সম্ভব হয়নি। বারংবার প্রতিশ্রুতিভঙ্গে হতাশ বাংলাদেশ তিস্তা অববাহিকায় চীনের সহায়তায় যে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছিল, সেটি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার অগ্রসর হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। চীনের দিক থেকেও আগ্রহ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে, এখনও স্পষ্ট নয়।
১৩. ব্রহ্মপুত্রে চীন-ভারতের মেগা ড্যাম
আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো দিয়ে আমরা যে প্রবাহ উজান থেকে পাই, এর ৬৫ শতাংশই আসে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে। স্বভাবতই বাংলাদেশের প্রতিবেশ, কৃষি ও নৌযোগাযোগ ব্যবস্থায় এই নদের অবদান সবচেয়ে বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই নদে চীন ও ভারত পাল্টাপাল্টি ড্যাম নির্মাণ করলেও বাংলাদেশের দিক থেকে স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থানের ঘাটতি দেখা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে, অন্তত প্রকাশ্যে। ওদিকে, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং যেমন জুলাইয়ে সাংপো তথা ব্রহ্মপুত্রে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন, তেমনই সেপ্টেম্বরে এসে অরুণাচল প্রদেশে ব্রহ্মপুত্রে দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশ এখনও ‘দেখি না কী হয়’ মেজাজে রয়েছে।
১৪. আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচ স্বাক্ষর
নদ-নদীর ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা পথ হারালে ভাটির দেশের জন্য রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ানোর মতো দুটি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। প্রথমটি সংক্ষেপে ‘জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ, ১৯৯৭’ এবং দ্বিতীয়টি সংক্ষেপে ‘জাতিসংঘ পানি সনদ, ১৯৯২’। আক্ষেপের বিষয়– বাংলাদেশ এর কোনোটিকেই কাজে লাগাতে পারেনি বা চায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে ১৯৯২ সালের সনদটি স্বাক্ষরের পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু ১৯৯৭ সালেরটি অনুস্বাক্ষরের ব্যাপারে এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। অবিলম্বে স্বাক্ষর করা উচিত।
১৫. ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প
ভারতের আন্তঃনদীসংযোগ প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের বেশ সোচ্চার ভূমিকা দেখা গিয়েছিল একুশ শতকের শুরুতে। ভারতের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন আদিবাসী সমাজের প্রবল প্রতিবাদ হয়। এসব কারণে বাংলাদেশের সোচ্চার ভূমিকা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে থিতিয়ে এলেও ভারত থেমে নেই। বরং কিছু ‘ক্যামোফ্লাজ প্রজেক্ট’ বা ছদ্ম প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এসব নিয়ে এখনই সোচ্চার হওয়া উচিত। আগের সরকারগুলোর মতো অন্তর্বর্তী সরকারকেও এ ব্যাপারে নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে।
১৬. বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রটোকল
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত এবং নিয়মিত নবায়িত নৌ চলাচল প্রটোকল চুক্তিটি অভিন্ন নৌপথ ব্যবহার করে উভয় দেশকে পরিবহন ও ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার কথা। বাস্তবে ভারতই এটি ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে নিজেদের পণ্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ শুধু কলকাতা থেকে সুন্দরবন হয়ে পণ্য আনছে। এই চুক্তিটি সংস্কার হওয়া উচিত, যাতে করে বাংলাদেশ অশুল্ক বাধাগুলো অতিক্রম করে উত্তর-পূর্ব ভারত ছাড়াও নেপাল ও ভুটানে পণ্য নিয়ে যেতে পারে। দেশভাগ-পূর্ববর্তী ঐতিহাসিক নৌপথগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। এ নিয়ে আলোচনা নেই।
১৭. যৌথ নদী কমিশন সংস্কার
নামে বাংলাদেশ-ভারত ‘যৌথ’ নদী কমিশন হলেও, নেই দুই দেশের যৌথ জনবল কাঠামো। অথচ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মেকঙ রিভার কমিশনে যৌথ জনবল কাঠামো রয়েছে। যৌথ নদী কমিশনের কার্যবিধি অনুযায়ী বছরে অন্তত চারটি বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে গত ৫৪ বছরে ৮৮টি বৈঠক হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশে যৌথ নদী কমিশনের কার্যক্রম ও তথ্যাবলি ‘ক্লাসিফায়েড’ আখ্যা দিয়ে যেভাবে নাগরিক সমাজের প্রবেশাধিকার বারণ করা হয়, তাতে খোদ সংস্থাটিই দুর্বল হতে থাকে। এসব সংস্কার হওয়া দরকার; যদিও এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আলোচনা চোখে পড়েনি।
১৮. বন্যা পূর্বাভাসের সঙ্গে বাঁধ ব্যবস্থাপনার তথ্য
বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে দিনে দু’বার যে তথ্য ভারত থেকে দেওয়া হয়, সেটি মূলত ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার আশঙ্কা সংক্রান্ত। সেখানে যৌথ নদীগুলোর উজানে স্থাপিত ভারতীয় ড্যাম বা ব্যারাজগুলোর পরিচালন-সংক্রান্ত তথ্য নেই। অথচ ভারত থেকে বন্যা পূর্বাভাস-সংক্রান্ত তথ্য যেমন যথাসময়ে পেতে হবে; তেমনই অভিন্ন নদীগুলো এবং সেগুলোর উপনদীতে স্থাপিত দেশটির ব্যারাজ, ড্যাম ও অন্যান্য স্থাপনার পরিচালন-সংক্রান্ত তথ্য পেতেই হবে, যদি আমরা কার্যকরভাবে বন্যা মোকাবিলা করতে চাই। এ ব্যাপারেও গতবছর কুমিল্লা-ফেনী বন্যার সময় লিখেছি; অন্তর্বর্তী সরকার কতখানি আমলে নিয়েছে জানা নেই।
১৯. নদীর বদলে অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রবাহিত দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃত ৫৪ বা রিভারাইন পিপলের গবেষণামতে ১২৩টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে। এর মধ্যে গত ৫৪ বছরে ৩টি নদী নিয়ে চুক্তি বা সমঝোতা সম্ভব হয়েছে; ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি; ২০১৯ সালের অক্টোবরে ফেনী এবং ২০২২ সালে সেপ্টেম্বরে কুশিয়ারা নিয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক। প্রশ্ন জাগে, ১২৩টি নদী বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হতে তাহলে কতদিন লাগবে? এর বদলে আসলে সর্বোচ্চ তিনটি চুক্তি হতে পারে; গঙ্গা অববাহিকা চুক্তি, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা চুক্তি এবং মেঘনা অববাহিকা চুক্তি। তাহলে যেমন চুক্তি স্বাক্ষর সহজ হবে, অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনাও সম্ভব হবে।
২০. দ্বিপক্ষের বদলে বদলে বহুপক্ষীয় কমিশন
গঙ্গা বা ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীগুলোর অববাহিকায় বাংলাদেশ-ভারত ছাড়াও পক্ষ হিসেবে রয়েছে চীন, নেপাল ও ভুটান। কিন্তু ভারত সবসময়ই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে জোর দেয়। আমরা অনেকদিন ধরে মেকঙ বা দানিয়ুব মডেলে গঙ্গা বা ব্রহ্মপুত্র নিয়ে বহুপক্ষীয় নদী ব্যবস্থাপনার কথা বলছি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের অনেকও অতীতে এ নিয়ে কথা বলেছেন; কিন্তু এখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা দেখা যাচ্ছে না।
শেষ কথা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারে অন্তত চারজন উপদেষ্টা রয়েছেন, যারা গত তিন দশক ধরে নদী ও পরিবেশ আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে রয়েছেন। খোদ প্রধান উপদেষ্টাসহ আরও কয়েকজন উপদেষ্টা নাগরিক সমাজের অংশ হিসেবে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সুরক্ষার অংশ হিসেবে পরিবেশগত সুশাসনের প্রশ্নটিও সামনে রেখে এসেছেন। এখন যদি স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে দেশের নদনদী সুরক্ষার কার্যক্রমে গুণগত পরিবর্তন না হয়, তাহলে আর কখন?
শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
skrokon@gmail.com