নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন সিডও সনদ বাস্তবায়ন
সীমা মোসলেম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

আজ ৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সিডও দিবস। ১৯৭৯ সালের এই দিনে জাতিসংঘ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ সিডও গ্রহণ করে। আমরা জানি, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা গৃহীত হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে যুগ যুগ ধরে নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্যের ফলে সমাজে, রাষ্ট্রে, পরিবারে নারীর জীবনের বাস্তবতা পুরুষের চেয়ে ভিন্ন।
নারীর এই ভিন্নতর বৈষম্যপূর্ণ অবস্থা ও অবস্থান জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার সনদে প্রতিফলিত হয়নি। এই বৈষম্যপূর্ণ অবস্থান চিহ্নিত করে তা মোকাবেলার লক্ষ্যে পদক্ষেপ না নিলে প্রকৃতপক্ষে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এই বিবেচনায় জাতিসংঘের নারীর মর্যাদাবিষয়ক কমিশন নারীর অবস্থান বিশ্লেষণের লক্ষ্যে দেশে দেশে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে। ১৯৬৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপের’ বিশেষ ঘোষণা গৃহীত হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘ ‘নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ’ গ্রহণ ও অনুমোদন করে, যাকে সংক্ষেপে ‘সিডও সনদ’ বলা হয়। ১৯৮৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সনদের কার্যকারিতা শুরু হয়, জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন দেশ সনদে স্বাক্ষর শুরু করে।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালে কিছু ধারা সংরক্ষণ রেখে সনদে স্বাক্ষর করে। নারী আন্দোলনের অব্যাহত প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পর্যায়ক্রমে কতক সংরক্ষণ প্রত্যাহারের পরও গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারা আজও সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে নারীর সম-অধিকার বাস্তবায়নের মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এ দুটি ধারায়—ধারা নং ২ এবং ধারা নং ১৬(১)(গ)। সিডও সনদের ২ নং ধারাকে বলা হয় সনদের প্রাণ। এই ধারাটি সংরক্ষণ রেখে সিডও সনদ বাস্তবায়ন ও নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে বলা যায় শুভংকরের ফাঁকি। ২ নং ধারার মূল বক্তব্য হচ্ছে, প্রতিটি দেশের জাতীয় সংবিধান আইনকানুন ও নীতিমালায় নারী ও পুরুষের সমতা নীতিমালা সংযুক্তকরণ ও তার প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইনকানুন, রীতিনীতি, আচার, ব্যবহার নিষিদ্ধ করা।
সকল ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ। ১৬(১)(গ) ধারায় বলা হয়েছে, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদকালে নারী ও পুরুষের একই অধিকার ও দায়দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এটি হচ্ছে নারীর ব্যক্তি অধিকারের অন্যতম দিক।
মানবাধিকারের প্রধান শর্ত হচ্ছে, ব্যক্তির অধিকার তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নারী এখনো বৈষম্যের শিকার।
বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে নারীর ব্যক্তিজীবনের অধিকারের ক্ষেত্রে এখনো নানা বৈষম্য বিরাজমান। নারীর ব্যক্তি অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশের নারীর জীবন নিজ নিজ ধর্মের পারিবারিক আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় সব ধর্মের নারীর ব্যক্তি অধিকারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সেখানে নাগরিক হিসেবে নারীর মানবাধিকার নানাভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। আমরা জানি, নারীর ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন যেমন-বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী নারীদের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে, যা সংবিধানে উল্লিখিত নারী-পুরুষের সম-অধিকারের ধারণারও পরিপন্থী। উপর্যুক্ত ক্ষেত্রে নারীর বৈষম্যপূর্ণ অবস্থান সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারে নারীকে অধস্তন করে রেখেছে, যা নারীর প্রতি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। বাংলাদেশের নারী আন্দোলন তথা মহিলা পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে এই বৈষম্য দূর করে সব ধর্মের নারীর জন্য দেশের অন্য সব নাগরিক আইনের মতো ‘অভিন্ন পারিবারিক আইন’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। জাতিসংঘ সিডও কমিটি তার বার্ষিক সমাপনী মন্তব্যে একই সুপারিশ প্রদান করে আসছে।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, যেখানে নারীর অংশগ্রহণ ন্যূনতম সেটা রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন অর্থাৎ নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর যুক্ততা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী কিন্তু সংসদসহ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বের দিকে দৃষ্টি দিলে তার কোনো প্রতিফলন আমরা লক্ষ করি না। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নারীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে চাইলে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব পর্যায়ে নারীর সম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
গণতন্ত্র সুসংহত করে রাষ্ট্রকে অগ্রসর করে নিতে প্রয়োজন রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা। সম্প্রতি সংস্কার বিষয়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বিষয়ে আলোচনা হয়। যদিও সেখানে নারী আন্দোলনসহ এ ক্ষেত্রের নারী প্রতিনিধিরা যুক্ত ছিলেন না। দেখা যায়, সংসদে নারী আসনসহ রাজনৈতিক দলে নারী প্রতিনিধি বিষয়ে দলগুলো ঐকমত্যে আসতে পারেনি।
নারী আন্দোলন মনে করে জাতীয় উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, সংসদে সাধারণ আসনে নারীর সংখ্যা হাতে গোনা। অন্যদিকে নারীর জন্য যে ৫০টি সংরক্ষিত আসন সংসদে রয়েছে সে আসনগুলো মনোনয়নের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ফলে সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা দলের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, নারী সমাজের কাছে নয়। সাংসদ হিসেবে যাঁরা মনোনয়ন পেয়েছেন ব্যক্তিগত পছন্দ ছিল মূল নিয়ামক।
আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি যে স্থানীয় সরকারে নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে সরাসরি নির্বাচনের বিধান নারীসমাজের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল। রাজনীতিতে ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে নারীর প্রাপ্য নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার গুরুত্ব ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় নারী-পুরুষ সমতা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রসমূহ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে। আমাদের নির্বাচন বিধিমালায় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দলের নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অথচ তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এখনো প্রবল হয়ে রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে নারী সমাজের দাবি—
জাতীয় সংসদে ৩০০ সাধারণ আসনে নারী-পুরুষ উভয়েই প্রতিযোগিতা করবে। তবে দলগুলো থেকে নারীকে প্রার্থী করার প্রবণতা এখনো অনেক কম। একই সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে সাধারণ আসনে নারীর বিজয়ী হয়ে আসার সম্ভাবনাও কম। তাই সংগতভাবে একই সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসন বহাল থাকবে।
জাতীয় সংসদে মোট আসনসংখ্যা হবে ৪৫০-এর মধ্যে ৩০০ সাধারণ আসন। ১৫০ হবে সংরক্ষিত নারী আসন।
পাশাপাশি দুটি সাধারণ আসন নিয়ে একটি সংরক্ষিত নারী আসন হবে।
সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন প্রথা বাতিল করে, নির্বাচনী এলাকায় জনগণের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।
সংরক্ষিত নারী আসন বিধানটি আগামী দুই-তিন টার্মের জন্য বলবৎ থাকবে।
পরিশেষে বলা যায়, আজকে আন্তর্জাতিক সিডও দিবসে এটি নতুন করে অনুধাবন করার বিষয় যে সব ক্ষেত্রে নারীর সম অংশগ্রহণ ব্যতীত সমাজ ও রাষ্ট্র অগ্রসর হতে পারে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে দুটি মৌলিক ক্ষেত্রে বৈষম্যপূর্ণ অবস্থান নারীকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে যা বঞ্চিত করছে এবং নারীর বিকাশের পথে প্রবল বাধা হয়ে রয়েছে। নারীর ব্যক্তিজীবনের বৈষম্য দূর করার জন্য প্রয়োজন অভিন্ন পারিবারিক আইন বাস্তবায়ন, সম্পদ-সম্পত্তিতে সম-অধিকার। অন্যদিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে তার রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। এ ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। এই লক্ষ্যে প্রয়োজন সিডও সনদের সংরক্ষিত দুটি ধারা স্বাক্ষর করা এবং সনদের আলোকে সংবিধানের ধারায় নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা।
লেখক : যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ