নারীর মর্যাদা ও ক্ষমতায়ন
শেখ রফিক [সূত্র : দেশ রূপান্তর, ২৫ নভেম্বর ২০২৫]

বিএনপি নারীর মর্যাদা, অধিকার ও ক্ষমতায়নকে জাতীয় উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নারীর ক্ষমতায়নের যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, তাকে শক্তিশালী ও সময়োপযোগী রূপ দিয়ে অগ্রসর করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তার সময় নারী শিক্ষার প্রসার, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, আর্থিক স্বনির্ভরতা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যাপক অগ্রগতি নারীর ক্ষমতায়নকে জাতীয় নীতির কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসে। বিএনপি সেই ধারাকে আরও বিস্তৃত, আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপ দিতে চায়।
নারীর অগ্রগতি মানেই জাতির অগ্রগতি। তাই নারীকে সামাজিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সক্রিয় চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা বিএনপির অন্যতম অঙ্গীকার। বিএনপি তার ৩১ দফা ও ভিশন ২০৩০-এর মাধ্যমে নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিতে দক্ষতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে। নারীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সমতা নিশ্চিত করা বিএনপির নীতি-দর্শনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ৩১ দফার ২৩ নম্বর দফা বলছে, জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নারীর ক্ষমতায়নে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। নারী ও শিশুদের জীবনমান বিকাশের নিমিত্তে যুগোপযোগী উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে। জাতীয় সংসদে মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীদের প্রাধান্য দেওয়া হবে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত। এ লক্ষ্যে নারীর ক্ষমতায়নে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ এবং নারী-শিশুর জীবনমান উন্নয়নে যুগোপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়ন জাতির দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করবে। জাতীয় সংসদে নারীদের প্রাধান্য এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গঠনে সহায়ক হবে। নারীর প্রতি সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি। এতে নারী সমাজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা সুদৃঢ় হয়। নারীর দক্ষতা, প্রতিভা ও সম্ভাবনাকে জাতীয় উন্নয়ন ধারায় যুক্ত করার ফলে শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষভাবে প্রণীত উন্নয়ন পরিকল্পনা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটায়, যা জনসম্পদের গুণগত মান বাড়ায়। জাতীয় সংসদে নারীদের প্রাধান্য দেওয়ার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়, যা নীতি প্রণয়নকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি তাদের নেতৃত্বের বিকাশ ও সামাজিক অবস্থানকে দৃঢ় করে, যা তৃণমূল পর্যায়ে জাতীয় উন্নয়নকে গতিশীল করে।
৩ অক্টোবর ২০২৫, তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপির লক্ষ্য সহজ এমন একটি আধুনিক, গণমুখী বাংলাদেশ গড়া যেখানে কোনো নারীকে তার পরিবার ও ভবিষ্যতের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে না হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম : মোট পুরুষদের ৮০ শতাংশের বিপরীতে মোট নারীদের মাত্র ৪৩ শতাংশ কর্মজীবী। এই ব্যবধান আমাদের সতর্ক করছে যে, আমরা আমাদের জাতির অর্ধেকেরও বেশি মেধা ও দক্ষতাকে পেছনে ফেলে যাচ্ছি। এই কারণেই বিএনপি সারাদেশে এমন একটি উদ্যোগ গ্রহণের কথা বিবেচনা করছে, যাতে শিশু পরিচর্যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কৌশলের অংশ হয়।
যেহেতু তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নারী, তাই কর্মজীবী মায়েদের অবদানকে অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে যেসব কারখানায় শিশু পরিচর্যার সুবিধা রয়েছে, সেখানে কর্মী ধরে রাখার হার বেশি, অনুপস্থিতি কম এবং প্রতিষ্ঠানগুলো এক বছরের মধ্যেই খরচ তুলে আনতে পারে। শিশু পরিচর্যা কোনো দয়া-দাক্ষিণ্য নয়, এটি সামাজিক-অর্থনৈতিক অবকাঠামোর একটি অপরিহার্য অংশ। সড়ক যেমন বাজারকে সংযুক্ত করে, তেমনি ডে-কেয়ার সেন্টার নারীদের কর্মজীবনে সাফল্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট : ২০৩৪ সালের মধ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ট্রিলিয়ন-ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে যেখানে প্রতিটি নাগরিক, বিশেষ করে নারী, গর্বের সঙ্গে দেশের প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে। আমরা এমন যেকোনো পশ্চাৎমুখী ধারণা প্রত্যাখ্যান করি, যা নারীর সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে। শিশু পরিচর্যা, সমান মজুরি ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন শুধু ন্যায়সংগত নয়; এটিই বুদ্ধিবৃত্তিক অর্থনীতি।’
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দ্বিতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে তিনি ঘোষণা করেন, ‘জনসংখ্যার অর্ধেক নারীকে পেছনে রেখে কোনো জাতির অগ্রগতি সম্ভব নয়’। এর আগে তিনি ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে নারীবিষয়ক দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৮ সালে মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন, সরকারি-বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে ১০% নারী কোটা, ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ আইন, নারী পুলিশ বাহিনী গঠন, গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে নারীর অন্তর্ভুক্তি এবং মাধ্যমিকে মেয়েদের জন্য ৫০% আসন সংরক্ষণসহ সার্বিক কাঠামোগত উদ্যোগ নেন।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে এক রূপান্তরমূলক নেতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি নারীর সামাজিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেন এবং শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক ক্ষমতায়নে ব্যাপক সংস্কার বাস্তবায়ন করেন। তার সময়ে বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন প্রণয়ন, মেয়েদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়াশোনা, শিক্ষা উপবৃত্তি ও ‘ফুড ফর এডুকেশন’ কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে দেশে নারীশিক্ষা অভূতপূর্ব অগ্রগতি লাভ করে। তিনি জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় অনুমোদনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন এবং চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে ৩০ বছরে উন্নীত করেন। ১১ মে ২০২৪, তারেক রহমান মা দিবস উপলক্ষে তার টাইমলাইনে লিখেছেন, ‘মা একটি ছোট্ট শব্দ, কিন্তু তার ব্যাপকতা অসীম।
‘মা’ সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান। তাই মায়ের জন্য প্রতিদিনই সন্তানের ভালোবাসা থাকে, তবু স্বতন্ত্রভাবে ভালোবাসা জানাতেই আজকের এই দিন। পরিবারে মা হচ্ছেন এক বিস্ময়কর প্রতিষ্ঠান। মহীয়সী মায়ের শিক্ষাতেই শিশুর ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়। মা দিনের সব অবসাদ, ক্লান্তি ঘুচিয়ে সব সংগ্রামের মাঝেও সন্তানকে আগলে রাখে। সুমাতার সাহচর্যে সন্তানের উৎকর্ষ ও প্রকৃত মানবসত্তার জাগরণ ঘটে, সন্তানের আত্মাকে করে নির্মল, স্বচ্ছ ও পবিত্র। নিষ্ঠা সহকারে দায়িত্ব পালন ও গ্রহণ করতে মায়েরা থাকেন সন্তানদের নিকট অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। মা-ই হচ্ছেন শিশুর সর্বোৎকৃষ্ট বিদ্যানিকেতন। সন্তানদের সুশৃঙ্খল, শিষ্ট ও সর্বক্ষেত্রে যোগ্য হয়ে গড়ে ওঠার পেছনে থাকে একমাত্র মায়েদের অক্লান্ত অবদান। সুমাতার সাহচর্যে গড়ে ওঠা সন্তানই সমাজ ও রাষ্ট্রের সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।’
বিরাজমান সংকট সমাধানে প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা। যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা এই পাঁচটি খাত পরস্পর সংযুক্তভাবে এগিয়ে যাবে।
প্রথমত, মেয়েদের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে; প্রযুক্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষ শিক্ষা-বিস্তারের উদ্যোগ নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মা ও শিশুর জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন পুষ্টি, নিরাপত্তা ও বিশেষ যতœ নিশ্চিত করতে হবে; শিশুদের সার্বিক টিকাদান, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা আরও জোরদার করতে হবে।
তৃতীয়ত, নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে সহজ ঋণসুবিধা, শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, ক্ষুদ্রঋণ, স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও হোম-বেইসড কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ জরুরি।
চতুর্থত, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্য রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, দরিদ্র নারী, একক অভিভাবক ও শিশুদের জন্য সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করা, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, স্বাস্থ্যবীমা ও জরুরি সহায়তা সম্প্রসারণ করতে হবে এভাবেই একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন করা সম্ভব হবে। ২০ নভেম্বর ২০২৫, তারেক রহমান তার জন্মদিনে লেখেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে হলে আমাদের মেয়ে, মা, বোন, সহকর্মীরা ভয় নিয়ে বাঁচতে পারবে না। প্রতিদিন, অনেক নারী শুধু কথা বলা, কাজ করা, অধ্যয়ন করা বা স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার চেষ্টা করার জন্য হয়রানি, ভয় দেখানো, গু-ামি এবং সহিংসতার সম্মুখীন হন। এই বাংলাদেশ আমাদের স্বপ্ন নয় এবং এটা আমাদের তরুণ মেয়েদের ভবিষ্যৎ প্রাপ্য নয়। নারীদের অবশ্যই নিরাপদ বোধ করতে হবে। বিএনপি বিশ^াস করে নারীর মর্যাদা রক্ষা, বৈষম্য দূরীকরণ এবং সমান সুযোগ সৃষ্টি ছাড়া কোনো টেকসই গণতন্ত্র ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেই কারণেই দলটি নারী উন্নয়নকে শুধু একটি খাতভিত্তিক কর্মসূচি নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার সামগ্রিক দর্শন ও নীতি হিসেবে দেখে। যেখানে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীনতা, মর্যাদা, নিরাপত্তা, অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব সমানভাবে মূল্যায়িত হয়।