নারীর ক্ষমতায়ন : জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশের নারী শান্তিরক্ষীদের নতুন দৃষ্টান্ত
মেছবাহুল আলম সেলিম [প্রকাশ : সমকাল, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬]

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহুমাত্রিক শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে নারীর অংশগ্রহণ ও লিঙ্গভিত্তিক অন্তর্ভুক্তি ঘিরে আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি সুদৃঢ় ও বিস্তৃত ঐকমত্য গড়ে উঠেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা এখন আর অস্ত্র ও কূটনীতির সীমায় আবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক ন্যায়ের স্পর্শ। এসব গুণ ধারণ ও চর্চায় নারীদের অনন্যতা অনস্বীকার্য।
বিশেষ করে যৌন ও লৈঙ্গিক সহিংসতার শিকার নারীদের সহায়তায় যুদ্ধপীড়িত নারী ও শিশুদের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং স্থানীয় সমাজে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারে নারী শান্তিরক্ষীরা যে সংবেদনশীলতা, সহানুভূতি ও সহনশীলতা প্রদর্শন করতে পারেন, তা অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষ শান্তিরক্ষীদের তুলনায় বেশি কার্যকর প্রমাণিত। এই বাস্তবতা সামনে রেখে বিশ্ব সম্প্রদায় এখন নারীদের শান্তি রক্ষায় অন্তর্ভুক্তিকে কেবল প্রতীকী অংশগ্রহণ নয়, বরং এক অপরিহার্য কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করছে।
জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা কার্যক্রম বিভাগ এরই মধ্যে একাধিক প্রগতিশীল নীতিমালা গ্রহণ করেছে, যার মূল উপজীব্য নারী শান্তিরক্ষীদের কার্যকর ভূমিকার স্বীকৃতি ও সম্প্রসারণ। এ ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ শুধু আন্তর্জাতিক শান্তি প্রক্রিয়াকে গতিশীলই করছে না, বরং তারা যেসব সংঘাতপীড়িত বা অস্থিতিশীল দেশে দায়িত্ব পালন করছেন, সেই সমাজেও ইতিবাচক ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের বীজ বপন করছে। এই পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক নিরাপত্তা বা মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় নারীদের আত্মবিশ্বাস, অধিকার সচেতনতা ও নেতৃত্ব বিকাশের ওপর। এক সময় যেসব সমাজে নারীরা শুধু নীরব দর্শক কিংবা নির্যাতিত ছিলেন, সেখানে এখন তারা নিজেদের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখছেন। নীল হেলমেটধারী নারী শান্তিরক্ষীর দৃশ্য তাদের চোখে নারীকে শুধু সহানুভূতির প্রতীক নয়; বরং কর্তৃত্ব, সক্ষমতা ও সমতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করে। ফলে ওইসব সমাজে একটি নিঃশব্দ বিপ্লব সূচিত হয়েছে, যেখানে নারীরা ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় উঠে আসছেন; ভাঙছেন দীর্ঘদিনের প্রথাগত বঞ্চনার দেয়াল এবং তৈরি করছেন নারীবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি নতুন সামাজিক চেতনা।
‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানকারী ২০০০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত রেজুলেশন ১৩২৫ ছিল এক অনন্য ও ঐতিহাসিক মাইলফলক। এই রেজুলেশন স্বীকার করে, সংঘাত ও যুদ্ধ নারীদের ওপর ভিন্নধর্মী ও অনেক সময় আরও গভীর প্রভাব ফেলে, যা কেবল নারীদের সহিংসতার শিকার করে না, বরং সামাজিক বঞ্চনা, দুঃসহ বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তারও জন্ম দেয়। রেজুলেশন ১৩২৫ তাই শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরে সংঘাত প্রতিরোধ, শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণ, পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন, নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য বলে বিবেচনা করে। এ নীতির বাস্তবায়নে বাংলাদেশ একটি সাহসী ও অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্বের শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কেবল জাতিসংঘের এই রেজুলেশন বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; মাঠ পর্যায়ে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করছে। এর জ্বলন্ত প্রমাণ দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ মিশনে (ইউএনএমআইএসএস) বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের নিয়োগ। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন- বানব্যাট-এর ফিমেইল এনগেজমেন্ট টিম (এফইটি)। এ দল শান্তি রক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে নারীর অন্তর্ভুক্তির কার্যকর দৃষ্টান্ত। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপন, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সমাজে আস্থার পরিবেশ তৈরিতে তারা রেখেছেন অনন্য ভূমিকা। তারা দেখিয়ে দিয়েছেন, নারীরা শুধু সহনশীলতার প্রতীক নয়; বরং শান্তি প্রতিষ্ঠার কৌশলী স্থপতি হিসেবেও সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
বানব্যাটের নারী শান্তিরক্ষী দলটি ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে দক্ষিণ সুদানের পশ্চিম বাহার এল গাজাল অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। এ অঞ্চল বহু বছর ধরে গৃহযুদ্ধ, জাতিগত সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ চক্রে আবদ্ধ। পশ্চাৎপদ এই এলাকার এ সংঘাতের ইতিহাস নারীদের জীবনকে করেছে সবচেয়ে বেশি দুর্বিষহ; যেখানে নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ছিল প্রায় বিলাসিতা। এই পটভূমিতে বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের আগমন যেন আশার আলো হয়ে এসেছে। কেবল শান্তিরক্ষী নন; তারা হয়ে উঠেছেন একেকজন মানবিক দূত, যারা অস্ত্রের বদলে ব্যবহার করেছেন সহানুভূতি; প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ছড়িয়ে দিয়েছেন আস্থা ও অনুপ্রেরণা। স্থানীয় নারীদের সঙ্গে নিত্যদিনের যোগাযোগ, স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা কার্যক্রম, যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ, শিশুদের শিক্ষা সহায়তা ইত্যাদি উদ্যোগ নতুন করে গড়ে তুলছে সেই সমাজের ভিত। নারী শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতি স্থানীয় নারীদের চোখে নারীর শক্তি, নেতৃত্ব ও সম্ভাবনার এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছে।
স্থানীয় নারীরা যুগের পর যুগ নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সম্মানের প্রশ্নে প্রান্তিক অবস্থানে থেকেছেন। তারা প্রথমবারের মতো দেখেছেন কিছু নারীকে, যারা শুধু সশস্ত্র নন; সচেতন, সহানুভূতিশীল ও তাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আন্তরিকভাবে সম্পৃক্ত। শুধু পেশাগত নয়, এ সম্পর্কে মিশে আছে নারীত্বের অভিন্ন অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও সহানুভূতির গভীর বন্ধন। অনেক নারী যারা এতদিন নিরাপত্তা বাহিনীকে দূরের ও শঙ্কাজনক শক্তি হিসেবে দেখে এসেছেন, তারা এবার প্রথমবারের মতো নিজেদের কথা বলতে পেরেছেন একটি নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য পরিসরে।
বানব্যাটের এফইটি সদস্যরা স্থানীয় নারীদের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠ সংযোগ গড়ে তুলেছেন, তা যুদ্ধবিধ্বস্ত দক্ষিণ সুদানে এক নিঃশব্দ সামাজিক বিপ্লবের সূচনা করেছে। তৈরি করেছে এক মুক্ত, নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য পরিসর, যেখানে বহু নারী প্রথমবারের মতো সাহস করে নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে পেরেছেন। যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার নির্মম বাস্তবতা, যা এতদিন তাদের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছিল, তা এবার উচ্চারিত হয়েছে এমন কিছু মুখের সামনে, যারা নিজেরাও নারী, সহানুভূতির ভাষা বোঝেন ও আতঙ্ককে অবহেলার চোখে দেখেন না। পুরুষ শান্তিরক্ষীদের কাছে যে ভয় ও সংকোচ থেকে নারীরা মুখ খুলতে পারেন না, এফইটি সদস্যদের কাছে সেই বাধা দূর হয়েছে সহজেই। ফলে এই দল শুধু তথ্য সংগ্রহ বা সহানুভূতি জানানোতেই থেমে থাকেনি, বরং তারা স্থানীয় নারীদের আস্থাভাজন ও সাহস জোগানো অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, যা একটি যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজে নারীদের পুনর্বাসন ও অধিকার পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।
দক্ষিণ সুদানে যাওয়ার আগে এফইটি সদস্যরা কঠোর ও বিস্তৃত প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে গেছেন, যেখানে তাদের শেখানো হয়েছে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকার কৌশল নয়; বরং সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা, মনস্তাত্ত্বিক সহনশীলতা ও একেবারে ভিন্ন বাস্তবতায় মানিয়ে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি। এ প্রশিক্ষণ তাদের শুধু দক্ষতা দেয়নি, দিয়েছে সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে কাজ করার এক নতুন উপলব্ধি। ফলে যখন তারা মিশনে যান তখন তারা শুধু ইউনিফর্ম পরা সৈনিক ছিলেন না; ছিলেন পরিপূর্ণভাবে প্রস্তুত, সচেতন ও মানবিক এক দল নারী, যারা যুদ্ধের ক্ষত সারাতে চেয়েছেন অস্ত্র নয়, হৃদয়ের ওষুধ দিয়ে। তারা শিখেছেন কীভাবে সংঘাতপীড়িত জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করতে হয়। কীভাবে কথা বললে ওই নারীরা নিজেদের নিরাপদ ও সম্মানিত বোধ করেন। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে মানসিক চাপ মোকাবিলা, দলগত সমন্বয় ও সংকটকালে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ওপর। ফলে যখন তারা বাস্তবে যুদ্ধক্ষত বয়ে বেড়ানো দক্ষিণ সুদানের মাটিতে অবতরণ করেন, তখন তারা শুধু সুসজ্জিত নন; ছিলেন প্রস্তুত, দৃঢ়চেতা ও দায়িত্ববান। এ প্রশিক্ষণই তাদের এমন কঠিন বাস্তবতায় দায়িত্ব পালনের জন্য মানসিকভাবে শক্ত ও পেশাগতভাবে দক্ষ করে তুলেছে, যা প্রতিকূল পরিবেশেও শান্তি স্থাপনের পথ সুগম করেছে।
দক্ষিণ সুদানে পৌঁছে বানব্যাটের নারী শান্তিরক্ষীরা তাদের অসামান্য পেশাদারিত্ব, মনোবল ও মানবিকতা দিয়ে সবার নজর কাড়েন। একটি অচেনা ভূখণ্ড, অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংঘাতের অনিশ্চয়তা সবকিছু পেছনে ফেলে তারা অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার সঙ্গে শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে নিজেদের নিযুক্ত করেন। শুরুটা সহজ ছিল না; অজানা পরিবেশ, সাংস্কৃতিক ব্যবধান, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা ও যুদ্ধ-পরবর্তী ট্রমায় বিপর্যস্ত জনপদে কাজ করা মানেই ছিল প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া। তবুও তারা পিছপা হননি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা হয়ে ওঠেন মিশনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, একটি নির্ভরযোগ্য শক্তি, যাদের ওপর সহকর্মী ও স্থানীয় জনগণ উভয়েই নির্ভর করতে শুরু করে।
তারা রেজিমেন্টের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে অংশ নিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ সব কার্যক্রমে– নিরাপত্তা টহল, অস্থায়ী অপারেটিং বেসে পাহারা, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি টহল অভিযান, এমনকি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মিশনেও। প্রতিটি পদক্ষেপে তারা প্রমাণ করেছেন– নারী শান্তিরক্ষীরা কেবল ‘সহযোগী শক্তি’ নয়, বরং সম্মুখসারির মূল চালিকাশক্তি হিসেবেও সমান দক্ষ। পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করেছেন তারা; দায়িত্ব পালনে কখনও পিছু হটেননি। আত্মবিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও দৃঢ় মানসিকতা তাদের প্রতি মুহূর্তে অনুপ্রাণিত করেছে।
এই অবিচল মনোভাব ও কর্মনিষ্ঠা শুধু একটি সফল অপারেশন নয়, বরং জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে নারীর সম্ভাবনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বানব্যাটের এফইটি সদস্যদের উজ্জ্বল ও মানবিক কার্যক্রম ছিল সিভিল-মিলিটারি কো-অপারেশন, যা দক্ষিণ সুদানের সাধারণ জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ককে এক অভাবনীয় মানবিক বন্ধনে দৃঢ় করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে যেখানে চিকিৎসাসেবা বিলুপ্তপ্রায়, সেখানে এফইটি সদস্যরা চিকিৎসা ও পশু চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনার মাধ্যমে হাজারো নারী ও শিশুর জীবনে আলো এনে দিয়েছেন। এই ক্যাম্পগুলো শুধু সেবা প্রদানের জায়গা ছিল না, বরং হয়ে উঠেছিল নির্ভরতার একটি কেন্দ্র, যেখানে স্বাস্থ্যগত সংকট, লজ্জা ও ভয় পেছনে ফেলে নারীরা খুঁজে পেয়েছিলেন সম্মানজনক পরামর্শ ও সহানুভূতিশীল সমাধান। সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে পুরুষ শান্তিরক্ষীরা যেসব ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিলেন, বিশেষত প্রজনন স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্যবিধি বা মানসিক চাপের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে; এফইটি সদস্যরা তা অত্যন্ত দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন।
দক্ষিণ সুদানে নারীদের জীবিকা যেখানে মূলত পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে পশু চিকিৎসা ক্যাম্প আয়োজনের মাধ্যমে এফইটি শুধু সেবাই দেয়নি; নারীর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়ও সরাসরি অবদান রেখেছে। গবাদি পশুর স্বাস্থ্যরক্ষা মানেই পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা, আয় বর্ধন ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা। এমন সংকটকালে এ ধরনের সেবা তাদের চোখে নারী শান্তিরক্ষীদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আরও সুস্পষ্ট করে তুলেছে। মানবিক সহায়তা, সংবেদনশীল নেতৃত্ব ও বাস্তবভিত্তিক সমাধানের সমন্বয়ে এফইটির এ কাজগুলো একদিকে যেমন শান্তি রক্ষা কার্যক্রমকে করেছে আরও গ্রহণযোগ্য, তেমনি অন্যদিকে স্থানীয় নারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও স্বনির্ভরতার বীজ বপন করেছে।
বানব্যাটের এফইটির এসব মানবিক উদ্যোগ শুধু সাময়িক শান্তি প্রতিষ্ঠায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; যুদ্ধবিধ্বস্ত দক্ষিণ সুদানের সমাজে এক গভীর পরিবর্তনের বীজ বুনেছে। স্থানীয় নারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে নেওয়া– এ সবই তাদের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে। নারীদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে একটি ক্ষত সারানো শুরু হয়েছে, যা শান্তি প্রক্রিয়ার টেকসই ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও এফইটির এই উদ্ভাবনী ও মানবিক কাজগুলো প্রশংসিত হয়েছে এবং নারী শান্তিরক্ষীদের ভূমিকার ইতিবাচক পুনর্মূল্যায়নের নতুন ক্ষেত্র স্থাপন করেছে। তাদের সফলতা বিশ্ববাসীকে প্রমাণ করেছে যে শান্তি রক্ষা শুধু অস্ত্র ও কৌশলবলে নয়, মানবিক সংবেদনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের মাধ্যমেও অর্জন করা সম্ভব। এই স্বীকৃতি বাংলাদেশকে এক সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে, যেখানে নারী শান্তিরক্ষীদের সক্ষমতা ও অবদানের কথা বিশ্বব্যাপী উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই সফল মডেল শান্তি রক্ষা মিশনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে এবং যুদ্ধপীড়িত সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন ও শান্তি নির্মাণের পথ আরও সুগম করবে।
সংক্ষেপে বলা যায়, বাংলাদেশের নারী শান্তিরক্ষীরা জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। দক্ষিণ সুদানে নারীদের ক্ষমতায়নে তাদের ভূমিকা ও শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণের গুরুত্ব বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণিত। বাংলাদেশ এ উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নারীর ক্ষমতায়ন ও শান্তি নির্মাণে যে অনন্য অবদান রাখছে, তা ভবিষ্যতের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমের জন্য এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
কর্নেল মেছবাহুল আলম সেলিম, পিএসসি, জি: সেনা কর্মকর্তা