কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

খালিদ ইবনে আমিন [সূত্র : জনকণ্ঠ, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

পৃথিবীতে মানুষের সমাজ জীবনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক অধিকারের ধারণা ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে। প্রাচীনকালে রাজারা ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, জনগণ ছিলেন ভৃত্য কিংবা দাস। কিন্তু সভ্যতা বিকাশের পথে পথে সামাজিক আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক চেতনার বিস্তার ঘটে। জনগণ বুঝতে পারে যে, রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা। নাগরিক হিসেবে মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো রাষ্ট্রকেই গণতান্ত্রিক বলা যায় না। কিন্তু এই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব কে নেবে? সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারে, নির্বাহী বিভাগ আইন বাস্তবায়ন করে। কিন্তু নাগরিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে শেষ ভরসা আদালত। এজন্য বলা হয় ‘বিচার বিভাগই মানুষের অধিকারের শেষ আশ্রয়স্থল’।

 


এই আশ্রয় কার্যকর হয় তখনই, যখন বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে নির্মোহ মননে কাজ করতে পারে। স্বাধীন বিচার বিভাগ ছাড়া কোনো রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার টিকে থাকতে পারে না। দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসা-যাওয়ার খেলায় মেতে থাকে। কিন্তু নাগরিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করার একমাত্র নিশ্চয়তা দিতে পারে নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে চায়, তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে কেবল নীতি-আদর্শ হিসেবে নয়, বাস্তবিক অর্থে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হলো নাগরিক অধিকারের অভিভাবক, ন্যায়বিচারের প্রতীক এবং গণতন্ত্রের প্রাণ ভোমরা, জনগণের আশা-ভরসার শেষ সীমা। সভ্য সমাজে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব নাগরিকের অধিকার রক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর এবং একমাত্র ভরসাস্থল স্বাধীন বিচার বিভাগ। 

 

 


দেশের জনগণ যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা অন্যায়, অবিচার বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হন, তখন বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগই তাকে নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে। বিচার বিভাগ যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তবে মানুষের অধিকারও কাগুজে অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। আইন ও সংবিধান শুধু কাগজে-কলমে মানুষের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু সেই অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করে বিচার বিভাগ। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আদালতের স্বাধীনতা অপরিসীম তাৎপর্যপূর্ণ।  

 

 

রাষ্ট্রের আইনসভা বা সংসদ, নির্বাহী ও বিচার বিভাগÑ এই তিন অঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত হয় কেবল স্বাধীন বিচার বিভাগের মাধ্যমে। এতে একজন নাগরিক নিশ্চিত হতে পারেন যে কোনো একটি বিভাগ ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার জবাবদিহি করতে হবে। নাগরিকের অধিকার রক্ষায় স্বাধীন বিচার বিভাগ সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। রাজনৈতিক প্রভাব বা দলীয় নিয়ন্ত্রণে বিচার বিভাগ প্রভাবিত হলে নাগরিক অধিকার বিপন্ন হয়। সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারায়। মানুষের অধিকার ক্ষুণœ হলে ভিন্নমত দমন ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সহজ হয়। ফলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। আদালত জনগণের আস্থা ও গণতন্ত্রের ভিত্তি। মানুষ যখন বিশ্বাস করে, আদালত কারও পরোয়া না করে ন্যায়বিচার দেবে, তখনই গণতন্ত্র টেকসই হয়।

 


গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা। রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে, যখন নাগরিকের মৌলিক অধিকার কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয় এবং জনগণ তাদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠে। সেই অধিকার বাস্তবে রূপ দেওয়া ও সুরক্ষিত রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম বিচার বিভাগ। কারণ আমরা বিগত সময়ে দেখে আসছি, আইন প্রণয়নকারী সংসদ কিংবা আইন বাস্তবায়নকারী নির্বাহী বিভাগ সবসময়ই রাজনৈতিক প্রভাববলয় ও ক্ষমতার আকাক্সক্ষায় পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগ যদি স্বাধীনভাবে কাজ করে, তবে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ হয়। নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগের ভূমিকা অত্যাবশ্যক। 

 

 


মানুষের মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হয়। সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তির চলাফেরার স্বাধীনতা, সমঅধিকার, কিংবা ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয় আদালতের রায় ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে। সমাজে কিংবা রাষ্ট্রে বৈষম্য, দমন-পীড়ন বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বিচার বিভাগই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করতে পারে। দেশের প্রান্তজন যে নাগরিক, জনপ্রশাসন, রাজনীতিবিদ বা প্রভাবশালী মহলের কাছে ন্যায্যতা পান না, তার জন্য আদালতই হয়ে ওঠে শেষ ভরসাস্থল। এভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিভাজন কার্যকর হয় এবং নাগরিক নিশ্চিত হন যে, কোনো অঙ্গ তার সীমা অতিক্রম করতে পারবে না।

 


বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। প্রাচীন গ্রিসে আইন ও ন্যায়বিচারকে গণতন্ত্রের শিকড় হিসেবে ধরা হতো। ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের ম্যাগনাকার্টা ছিল রাজকীয় স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকারের মাইলফলক, যেখানে প্রথমবারের মতো রাজার ক্ষমতা সীমিত করে আদালতের স্বাধীনতার স্বীকৃতি স্পষ্ট হয়। ১৭৮৭ সালে আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে ক্ষমতার বিভাজন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। প্রতিবেশী দেশ ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট বারবার সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নাগরিক অধিকার রক্ষা করেছে।

 

 

১৯৭৩ সালে কেশবানন্দ ভারতী বনাম কেরালা রাজ্য মামলার রায় ভারতীয় সংবিধানের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক ও মাইলফলক ঘটনা। এ মামলা সুপ্রিম কোর্টে সর্বাধিক দীর্ঘ ৬৮ দিনব্যাপী শুনানি চলে। ১৩ জন বিচারপতির সবচেয়ে বড় বেঞ্চে ৭-৬ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রায় দেওয়া হয়। কেশবানন্দ ভারতী কেরালার এক হিন্দু মঠের প্রধান ছিলেন। কেরালা সরকার ভূমি সংস্কার আইন-১৯৬৯ প্রণয়ন করলে সেই আইনে মঠের জমি অধিগ্রহণের সম্ভাবনা দেখা দেয়। তিনি তার ধর্মীয় ও সম্পত্তির অধিকার ক্ষুণœ হয়েছে, এই মর্মে ভারতী সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন, যা ইতিহাসে এমন এক মোড় ঘোরানো মামলা, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা দেয় যে, সংসদ সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে, তবে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো কখনো পরিবর্তন করতে পারবে না। এছাড়া ভারতের উচ্চ আদালতে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা বিরোধী রায়ও উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে পাকিস্তানে দীর্ঘদিন সামরিক শাসনে আদালতের স্বাধীনতা দুর্বল হয়েছে ঠিক, তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিচার বিভাগের শক্তিমত্তা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।

 


সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে, ১৯৭২ সালের সংবিধানে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত ছিল। কিন্তু চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হয়, যা অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা বিষয়ক ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করে। এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণœ হয় এবং কার্যত আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে এবং নির্বাহী বিভাগের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এটি ছিল এক ধরনের দ্বৈত শাসন। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী জাতীয় সংসদে গৃহীত হয় ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। পরে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে তাতে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের বিষয়টি যুক্ত করা হয়, যার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগে দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে বিরাজ করছিল দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা।

 


এই সংশোধনীর মাধ্যমেই রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান একনায়ক হয়ে ওঠেন এবং সংসদীয় পদ্ধতি বাতিল করে একদলীয় রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) চালু করেন। এর ফলে নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের ওপর রাষ্ট্রপতির একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। একাধিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। কার্যত একদলীয় ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করে চারটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পত্রিকা চালু রেখে বাকিগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তিনি হয়ে ওঠেন স্বাধীন বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার খলনায়ক। অথচ মুক্তিযুদ্ধের আগে যিনি ছিলেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় সিক্ত।

 


রাষ্ট্রপতির হাতে বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ন্যস্ত করা হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অনেকটা নির্বাহী বিভাগের ছায়া ক্ষমতায় চলে যায়। পরবর্তীতে পঞ্চম সংশোধনী ও পরামর্শের শর্ত যুক্ত করলেও বাস্তবে নির্বাহী কর্তৃত্বই বহাল থাকে । সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের শৃঙ্খলাবিধি সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতাকে খর্ব করে অধস্তন বিচারকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। হাইকোর্ট সঠিকভাবেই সেই বিধিমালাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৬-৪৭ পর্যন্ত মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশের কোনো নাগরিক যদি এগুলো ভোগ করতে গিয়ে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার হন, তবে হাইকোর্টে রিট করতে পারেন। এই প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়ার অর্থ হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা।

 

 


বিচার বিভাগ স্বাধীন না হলে আইনের শাসন কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে সীমিত থাকে। বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকলে দুর্নীতিবাজরা সহজে পার পায় না। ভিন্নমত দমন বা প্রতিহিংসার রাজনীতি হ্রাস পায়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা প্রতিরোধ করা যায়। আদালত নিরপেক্ষ হলে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আইনগত নিরাপত্তা পায় এবং বিনিয়োগে উৎসাহ বোধ করে। স্বাধীন বিচার বিভাগ একটি দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার রক্ষায় বিশেষ মর্যাদার আসনে বসাতে পারে। ইতোপূর্বে বাংলাদেশে আদালতে বিচারক নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীর যোগ্যতা ও দক্ষতার কম মূল্যায়ন করা হতো। সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকায়, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। দীর্ঘদিন ধরে নি¤œ আদালতের বিচারকদের বদলি ও শৃঙ্খলা নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যা বিচারিক স্বাধীনতার পথে প্রধান অন্তরায়।

 


মামলার দীর্ঘসূত্রতা, ঘুষ ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। দেশের আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ সমস্যার পেছনে যে বিষয়গুলো কাজ করেছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতায় দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি, বিচার বিভাগের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বিচারকদের নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার অভাব, সর্বোপরি টেকসই গণতন্ত্র না থাকা।
দেশের বিচার বিভাগ প্রযুক্তির নির্ভর, ই-জুডিশিয়ারি বাস্তবায়ন করলে মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমবে এবং বিচারপ্রার্থীরা কম ভোগান্তির শিকার হবেন। রক্তে মাংসে গড়া মানুষের অস্তিত্ব, বিচারক ও আদালত সংশ্লিষ্টরা মানুষ, তাদেরও ভুল হতে পারে কিংবা তারাও অসদুপায় অবলম্বন করতে পারেন। বিচার বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ কঠোর পর্যবেক্ষণ থাকতে হবে। নাগরিকদের মধ্যে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা রাখা একান্ত প্রয়োজন।  

 


বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মানে বিচারকরা যেন তাদের বিবেক, আইন ও সংবিধানের আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ, নির্বাহী প্রভাব বা বাহ্যিক কিংবা অভ্যন্তরীণ প্রলোভনে নতি স্বীকার না করেন। মামলার শুনানি, রায় প্রদান ও আইনের ব্যাখ্যায় পূর্ণ স্বাধীন মতপ্রকাশ করতে পারেন। সব স্তরের বিচারকরা যেন নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা। স্বাধীনতা বলতে বোঝায় প্রাতিষ্ঠানিক বিচারিক স্বাধীনতা। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা ও বাজেট পরিচালনায় নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা।

 

 


বিচার বিভাগের নিজস্ব বাজেট ও আর্থিক স্বশাসন থাকা। নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন বিচার বিভাগ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক পূর্বশর্ত। বিচারকরা যদি নিরপেক্ষতা, সততা ও আইনের শাসন মেনে কাজ করেন এবং রাষ্ট্র যদি তাদের ওপর হস্তক্ষেপ না করে, তবে নাগরিক অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রথম শর্ত হলো একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক বিচার বিভাগ, যা প্রতিটি নাগরিককে সমানভাবে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেবে। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবোত্তর নতুন বাংলাদেশে এটাই কামনা করছে দেশের জনগণ।